তাপস পাত্র

পুপুর স্কুলব্যাগে যখন বইয়ের সঙ্গে দু’ খানা কুঁতকুঁতে চোখের পুঁচকি ল্যাতপেতে বেড়ালছানা বেরোল, মা মৃদুলা তিন পা পিছিয়ে ‘এ ম্যাগো কী ঘেন্না, কী ঘেন্না’ বলে ওয়াক তোলা শুরু করল।

কাণ্ড না বুঝেই, কী না কী বিপদ হল ভেবে ধড়মড়িয়ে রান্নাঘর থেকে পড়িমরি বেরিয়ে এসে ছোটকাকিমা অন্তরা পুপুর পায়ের কাছে গায়ে গায়ে ল্যাপ্টালেপ্টি ছানাদুটোকে দেখতে পেয়ে বলল, ‘ এ দুটোকে কোথায় পেলি?’

ঘাবড়ে ঘ পুপু কোনক্রমে বলল, ‘স্কুলে।’

-‘স্কুলে মানে?’ অন্তরার চোখ ছানাবড়া, ‘স্কুলে বেড়ালছানা? স্কুলে ব্যাগ দেয়, জামা দেয়, এমনকি জুতোও  দেয়  শুনেছি। তাই বলে বেড়ালছানা!’

পুপু ফ্রকের তলার দিকটা তুলে চিবোতে চিবোতে টেনে টেনে বলল, ‘দিল তো!’

-‘দিল মানে? কে দিল?’ অন্তরার চোখ কপালে।

-‘হেড স্যর। বলল, নিয়ে যা। বাড়ি গিয়ে দুধ খাওয়াস।’

-‘সরকারি সাপ্লাই? তোকে একা দিয়েছে না সবাইকে দুটো করে দিয়েছে?’ অন্তরার মুখ হাঁ। চোখ কপালে ফিক্সড।

-‘হেডস্যার তোকে বেড়ালছানা দিয়ে বাড়ি নিয়ে গিয়ে দুধ খাওয়াতে বলল?’ মৃদুলার এতক্ষণে সম্বিত ফিরেছে। বলল, ‘আচ্ছাসে পেটা তো অন্তরা। হেডস্যর ওকে বেড়ালছানা দিয়ে বাড়ি নিয়ে গিয়ে দুধ খাওয়াতে বলেছে! বদমাস মেয়ে কোথাকার! হেডস্যরের আর খেয়ে দেয়ে কাজ নেই, না?’

-‘কাজ আছে কি নেই সে আমি কী জানি!’ কথা ফুরোল কি ফুরোল না দিব্য একখানা ‘ভ্যাঁ’ শুরু হতেই সমস্যাটা বেশ পাকিয়ে গেল।

ঠাকুরদা অভয়ানন্দ বাগানে কিছু একটা করছিলেন। থানার মেজবাবু ছিলেন। রিটায়ারমেন্টের পরে বাগান নিয়েই পড়ে আছেন।

পুপুর সেও আর এক যন্ত্রণা। সারাক্ষণ এখানে ওখানে খুবলে খাবলে এটা ওটা বীজ পুঁতে যাচ্ছেন। বাগানে পা দিলেই সমানে চিৎকার শুরু হবে ‘এই এই ওদিকে নয়, এদিকে এদিকে।’ এদিকে এলে ঠিক তার উল্টো নির্দেশ।

তুমি খালি নির্দেশ শুনে শুনে ডাইনে বাঁয়ে পুবে পশ্চিমে লাফাতে থাক। এবং ঘাবড়ে গিয়ে আতান্তরে দুচারটে চারার মাথামুণ্ড মাড়িয়ে একপ্রস্থ বকুনি খাও। বাগানে যাওয়া ছেড়েই দিত পুপু। খালি পুজো-পুজো খেলায় ফুল লাগে তাই মাঝেমধ্যে যাওয়া।

তা কথা হচ্ছিল হচ্ছিল, কিন্তু তার সঙ্গে কান্না যুক্ত হতে ঠাকুর্দা খুরপি হাতে ধুলোমাটি নিয়ে বাগান থেকে উঠে এসে যা খানিক বুঝতে সময় নিলেন। তারপর আর এক প্রস্থ হুলুস্থুল।

অভয়ানন্দের অকাট্য যুক্তি- ‘শিশু ভগবান। তারা অকারণে মিথ্যে বলে না। হেডস্যর দিয়ে না থাকলে ওইটুকু মেয়ে অত জোরের সঙ্গে বলতে যাবে কেন? এটা মারাত্মক ক্রাইম। বেড়াল মানে ডিপথেরিয়া। বেড়াল মানে জলাতঙ্ক। একজন হেডমাস্টারের এরকম কাণ্ডজ্ঞানহীনের মতো কাজ! ব্যাটাকে তুলে নিয়ে জেল কাস্টডিতে দেওয়া দরকার। সে ব্যবস্থাই আমি করছি। থানার ওসি আমার কলিগের ভাইপো। তার  আগে বড় বউমা ওর সারা গা খুঁটিয়ে দেখ কোথাও আঁচড়-টাঁচড় লেগেছে কিনা। প্রয়োজনে ইনজেকশন দেওয়াতে হতে পারে।’

ঠাকুর্দা বাগান থেকে উঠে আসায় খানিকটা হকচকিয়ে পুপুর কান্নার বেগ প্রায় থেমে এসেছিল। ইনজেকশনের কথায় সে দ্বিগুণ জোরে কাঁদতে শুরু করল।

ঠাকুমা অমলা বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘তুমি হাত-পায়ের কাদামাটি ধোও তো,বেশি জ্ঞান না ফলিয়ে। দুটো বেড়ালের ছানা ছুঁয়েছে কি ছোঁয়নি তাই নিয়ে উনি পাড়া মাথায় করতে এসেছেন। আমাদের ছেলেরা কুকুর বেড়াল ছোঁয়নি নাকি কোনওদিন? কার কটা কী হয়েছে? যত্তোসব!’

অভয়ানন্দর উত্তেজনায় ঘি পড়ল। গলা আরও এক মাত্রা চড়িয়ে বললেন, ‘ তুমি সেই ননসেন্স গ্রাম্য মহিলা যে কোনও কিছুর গুরুত্ব বোঝে না। সবকিছুকে লঘু করে দেখা তোমার অভ্যেস। তোমার কথা মেনে চললে এ সংসার ভেসে এতদিনে বঙ্গোপসাগরে চলে যেত। যায়নি শক্ত হাতে হালটা এই শর্মা ধরে রেখেছিল বলে। ওই মাস্টারকেও শক্ত হাতে দমন করতে হবে। ব্যাটা ছাত্রীর ব্যাগে বেড়াল ঢুকিয়ে হাসতে হাসতে বাড়ি চলে গেছে। কাল এস, তোমার হাসি ঘোচাচ্ছি।’

অভয়ানন্দ কতক্ষণে থামবেন কেউ আন্দাজ করতে পারছে না। এদিকে বেড়ালছানা দুটো কোনওক্রমে টলতে টলতে তাঁর পায়ের কাছে গিয়ে গোড়ালির কাছটা চাটতে যেতেই অলকেশ পেল্লায় একটা লাফ দিয়ে সরে গিয়ে বলে উঠলেন, ‘ওরে আগে এগুলোকে যেখান থেকে এনেছিস এখনই গিয়ে দিয়ে আয়। এরা জ্বালিয়ে মেরে দেবে। এ একেবারে ফেরোসাস মাস্টার। সারা বাড়ি জ্বালাবার চক্রান্ত!’

ব্যাজার মুখে অমলা বললেন, ‘সে না হয় বুঝলাম কিন্তু এ দুটোকে কে দিয়ে আসতে যাবে শুনি? দরকার হলে তুমি যাও। সারা জীবন তো এ সবই করে এসেছ।’

মিনমিনিয়ে পুপু বলল- ‘স্কুলের গেট তো বন্ধ হয়ে গেছে।’

-‘তোরা দুজনে এ দুটোকে নিয়ে গেটের সামনে গিয়ে বসে থাক। কাল স্কুল খুললে ঢোকাবি। কিচ্ছু আনতে পেলি না, ব্যাগে বেড়ালছানা ঢুকিয়ে এনেছে!‘  বিমলা গজগজিয়ে উঠলেন।

মৃদুলা নাক কুঁচকে বলল, ‘তোরা দাদু-নাতনি এদের কোথাও গিয়ে ফেলে দিয়ে আয় না বাপু। চোখের সামনে থেকে সরা।’

অমলা বললেন, ‘যেখানে সেখানে ফেলে দিয়ে এলে হবে?  কুকুরে কামড়ে মেরে ফেলবে। ওইটুকুনি বাচ্চা ঠিকমতো হাঁটতে শেখেনি। দিতে গেলে ওদের মায়ের কাছে দিতে হবে।’

অভয়ানন্দর তাৎক্ষণিক অপ্রস্তুত ভাবটা কেটে যেতে, সিদ্ধান্ত ইউ টার্ন নিল। বললেন, ‘কাল স্কুল খুলুক এই দুটো বেড়ালছানা আমি নিয়ে গিয়ে ওই ব্যাটা হেডমাস্টারের ব্যাগে পুরে দিয়ে আসব। টিট ফর ট্যাট। দিস ইজ ফাইনাল। ছোটবউমা ছানাদুটোকে একটা ঝুড়িতে ভরে রেখে দাও।’

এদিকে খিদের জ্বালায় বাচ্চাদুটো ততক্ষণে চিৎকার জুড়েছে। অমলা তা দেখে বললেন, ‘শুধু ঝুড়িতে রেখে দিলে হবে না। সারারাত চিৎকার করে ওদুটো আমাদেরই বাড়িছাড়া করবে। তার চেয়ে ছোটবউমা ওদের আগে কিছু গেলাও।’

যদিও ঠাকুমা কথাগুলো একটা তিরিক্ষি মেজাজ নিয়েই বললেন, পুপুও সেটা আন্দাজ করতে পারল, তবু ব্যাপারটা একটা সুবিধেজনক দিকে মোড় নেওয়ায় এতক্ষণে সে বেশ স্বস্তিবোধ করল।

ছানাদুটোকে খাওয়ানোর বিষয়টা বেশ আকর্ষক মনে হতে এগিয়ে গিয়ে অন্তরার হাতটা ধরল। অন্তরা পুপুকে ঘরে নিয়ে স্কুলের পোশাক বদলে বলল, ‘লক্ষ্মীমেয়ে হয়ে বাথরুমে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে এস। একগ্লাস দুধ এনে দিচ্ছি ঢকঢকিয়ে খেয়ে নাও। বুঝতেই পারছ হাওয়া ভাল নয়। তারপর গিয়ে তোমার ছানাদের খাওয়াব।’

বাটিভরে খানিকটা দুধ এনে ছানাদুটোকে খাওয়াতে গিয়ে অন্তরা আবিষ্কার করল, ঠিকমত খেতে না শেখা বেড়ালছানাকে মুখের সামনে দুধ এনে ধরে দিলেই তারা খেতে পারে না। সে এক ঝকমারি কাণ্ড। অমলা উপায় বাতলালেন। বললেন, ‘একটা ন্যাকড়া চুবিয়ে চুবিয়ে মুখের সামনে ধর। ওরা ঠিক চুষে খেয়ে নেবে।’

পুপুর ব্যাপারটায় বেশ মজা এল। উবু হয়ে বশে খুব মনোযোগ সহকারে খাওয়ানো দেখতে থাকল। এই প্রথম ভাবল, ভাগ্যিস ছানাদুটোকে এনেছিল তাই এত মজা। মা একবার কটমটিয়ে তাকিয়ে বলল, ‘দেব পিঠে চারটে কিল কষিয়ে। শয়তানি একেবারে বের করে দেব!’

সন্ধ্যায় বাবা সোমদত্ত অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে ব্যাপারটা পুরো কেঁচিয়ে গেল। সব শুনে তিনি বললেন, ‘শুধুমুদু হেডস্যরের দোষ দিয়ে কী হবে? পুপু নিজেই হয়তো ব্যাগে ভরে নিয়ে এসে মায়ের  হাতে ধরা পড়ে যাওয়ায় ভয় পেয়ে গল্পটা বানিয়েছে।’

এ সব শুনে পুপুর ঘাবড়ে যাওয়া মুখ দেখে অন্তরা নতুন করে কী বুঝল কে জানে! পুপুকে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে খাটে বসিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘সত্যি করে বল তো বাপু, ছানাদুটোকে কেন ধরে এনেছিলি?’

পুপুর স্পষ্ট স্বীকারোক্তি- ‘মা আমাকে রোজ অনেক দুধ দেয়, আমার খেতে ইচ্ছে করে না তাই। ভেবেছিলাম লুকিয়ে লুকিয়ে খাইয়ে দেব।’

-‘গাধা কোথাকার! স্কুলব্যাগে বেড়াল রাখবি, মা দেখবে না?’

-‘স্কুলব্যাগে রাখতাম নাকি? রাখতাম তো ছাদের ঘরে অদরকারি জিনিসপত্রের আড়ালে।’

-‘তা রাখলি না কেন?’

-‘মা তো প্রথমেই ধরে ফেলল। রাখবার সময়টা পেলাম কোথায়?’

-‘আর ওই যে তুই হেডস্যরের নামে অত বড় মিথ্যেটা বলে দিলি কাল যখন স্কুলে যেতিস হেডস্যর তোকে আস্ত রাখতেন?ঘাড়টি ভেঙে তোর ওই স্কুলব্যাগে ভরে ভ্যানে চাপিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিতেন।’

পরম নিশ্চিন্তে অন্তরার অ্যানড্রয়েড থেকে একটা গেম বার করতে করতে পুপু বলল, ‘হেডস্যর কত ভাল  জান? উনি আমাদের একেবারেই বকেন না। মারেনও না।’

অঙ্কন- উত্তম কর্মকার