আবু তাহের

ঝিরঝির করে বৃষ্টি হচ্ছে আজ সারাদিন। সন্ধের মুখে ওদের ফিরে আসার কথা। কিন্তু সন্ধে নামার অনেক আগে থেকেই তো আকাশ অন্ধকার। ওরা কি তবে আজ ফিরবে না? এই বৃষ্টির দিনে অন্ধকারে কোথায় যে ছানা তিনটে লুকিয়ে আছে! ভাবতে গিয়ে মনটা বিষণ্ণ হয়ে ওঠে বর্ষার। পেয়ারা গাছটার কাছে বারবার গিয়ে হতাশ হয়ে ফিরে আসে।

আজ মাসখানেক হল ওদের সাথে এক রকমের সখ্য গড়ে উঠেছে বর্ষার। ওদের বলতে তিনটে ছোট ছোট পাখি। পাখিগুলোর নাম অবশ্য সে জানে না। তবে পেটের দিকটা বেশ ঘন পশমে ঢাকা। হাতের তালুর মধ্যে এঁটে যাবে এইরকম সাইজ। মাঝেমাঝে ওরা তিন জন আসে। আবার কখনও চার জন। পেয়ারা গাছের চারটে পাতলা পাতলা ডালে এসে বসে ওরা। সারারাত এইভাবেই কাটিয়ে দেয়! তবে কি এরকম ভাবে বসে বসেই ঘুমোয় ওরা? এরা বাসা বানিয়ে ফেলে না কেন? এখন তো মাঝেমাঝেই বৃষ্টি লেগে থাকবে। জোর বৃষ্টির সময় তবে কী ভাবে থাকবে এই একটা সরু পেয়ারা গাছের ডালে বসে! এরকম নানা প্রশ্ন ওর মনে জাগে।

অন্ধকারে গাছের দিকে টর্চ জ্বেলে দেখে ঠিকঠাক বসে আছে কিনা। সঙ্গে মামাকে নিয়ে আসে। মামা বারণ করেছে সরাসরি ওদের দিকে টর্চ তাক না করতে। তাই এখন থেকে একটু সাইডে লাইট মেরে দেখে নেয় ঠিকঠাক আছে কিনা। বর্ষার সাথে ওদের একটা নিবিড় বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে যেন! ও রোজ রাতে দুবার করে দেখে এসে পড়াশোনা করে তবে ঘুমোতে যায়।

কিন্তু আজ যে তারা ফিরছে না। ফিরবে না নাকি আর! কোথাও শেয়ালটেয়াল ওদের খেয়ে ফেলল না তো? নাকি অন্ধকারের মধ্যে ওরা পথ চিনতে ভুল করল? মামা বলল, ‘মানুষ পথ চিনতে ভুল করলেও ওরা কখনও নিজেদের রাস্তা ভোলে না। দেখ, মনে হয় অন্য কোথাও বাসা তৈরি করে ফেলেছে। তার আগে এখানে অস্থায়ী ভাবে থাকছিল কিছুদিনের জন্য!’

ঠিক মানুষের মত যেন! বর্ষা ভাবে। এরকমও হয়! তাহলে মনে হয় সত্যি সত্যি ওরা অন্য কোথাও বাসা বানিয়ে বাস করতে শুরু করল। সেইজন্যই মাঝেমাঝে একজন থাকত না ওদের মধ্যে। বাড়ির অভিভাবক হয়তো। সে  হয়তো তৈরি হতে থাকা বাসা পাহারা দিত রাতের বেলা। মনে মনে ওদের জন্য দুঃখ হলেও একটা শান্তিতে মনটা প্রসন্ন হয়ে উঠল বর্ষার।

পরের দিন মামা খুঁজে খুঁজে দেখল পাশের সুপ্তিদের কাঁঠাল গাছের উপর নতুন একটা বাসা। সন্ধের দিকে ওই চারজনকে ফিরে আসতে দেখল মামা ভাগ্নি। চোখদুটোতে যেন আনন্দধারা বয়ে যাচ্ছে ছোট্ট বর্ষার।

-‘ঘরে ফেরার মজাই আলাদা। এ বার নিশ্চিন্ত বাবা! চলো আমরা বাড়ি যাই,ওরা ঘুমোক!’

অঙ্কন- উত্তম কর্মকার