শুভজিৎ ভাস্কর

৭ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯।

ঘড়িতে তখন রাত ১টা বেজে ৩৮ মিনিট ।

মিশন কন্ট্রোল রুমে হাততালির আওয়াজ শুনে এটা বুঝতে বাকি রইল না যে, বিক্রম ল্যান্ডার তার ডিসেন্ডিং প্রক্রিয়ার প্রথম পর্ব অর্থাৎ রাফ্ ব্রেকিং শুরু করে দিয়েছে।

২২ জুলাই, ২০১৯, GSLV MK-III এর কাঁধে চেপে শ্রীহরিকোটার সতীশ ধবন স্পেস সেন্টার থেকে চাঁদের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিল চন্দ্রযান-২।  এই যাত্রার গুরুত্ব কতটা সেটা ইসরোর ২০০৮ এর চন্দ্রযান-১ মিশনের সাফল্য দেখলেই বোঝা যায়।

চন্দ্রযান-১ বিজ্ঞানীদের চন্দ্রপৃষ্ঠের উত্তর মেরুতে বরফের হদিশ পাইয়ে দিয়েছিল। তাই এবারের লক্ষ্য ছিল চন্দ্রপৃষ্ঠের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করা এবং কোথায় কতটা জল ও ধাতু বা অধাতু রয়েছে তার খবর ইসরোকে সরবরাহ করা। মূলত সেই কারণেই এবার অরবিটারের সঙ্গে পাঠানো হয় বিক্রম ল্যান্ডার ও প্রজ্ঞান রোভারকে।

বিক্রম ল্যান্ডারের কাজ হল অরবিটার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রজ্ঞান রোভারকে সফলভাবে চন্দ্রপৃষ্ঠে পৌঁছে দেওয়া। যেহেতু দক্ষিণ মেরুতে ক্রেটারের ছায়াবৃত অংশ উত্তর মেরুর তুলনায় বেশি তাই সেখানে বরফ থাকার সম্ভাবনাও বেশি। সেই লক্ষ্য নিয়েই শুরু হয় চাঁদের দক্ষিণ মেরু অভিযান। যা  বিশ্বে এই প্রথম।

ডিসেন্ডিং বা অবতরণ প্রক্রিয়ার দুটি পর্ব। প্রথম পর্বটিকে বলা হয় রাফ্ ব্রেকিং এবং দ্বিতীয়টি হল ফাইন ব্রেকিং। রাফ্ ব্রেকিং পর্বে বিক্রম ল্যান্ডার চন্দ্রপৃষ্ঠের ৩০ কিমি উচ্চতা থেকে প্রায় সেকেন্ডে ১৬৮০ মিটার অনুভূমিক বেগে বা হরাইজন্টাল স্পিডে অবতরণ শুরু করে এবং পূর্বনির্ধারিত গতিপথ অনুসরণ করেই প্রায় ৭.৪ কিমি উচ্চতায় নেমে আসে।

সময় ১টা বেজে ৪৮ মিনিট। এবার অবতরণের দ্বিতীয় পর্ব অর্থাৎ ফাইন ব্রেকিং শুরু হওয়ার পালা। এই সময় ল্যান্ডারের অনুভূমিক গতিবেগ ছিল প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৪৬ মিটার যা পূর্বনির্ধারিত গতিবেগের সমান। ফলে, বলাই বাহুল্য যে চন্দ্রযান-২ সাফল্যের দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।

কিন্তু ২.১ কিমি উচ্চতায় পৌঁছে বিক্রম ল্যান্ডারটি এই পূর্বনির্ধারিত গতিপথ থেকে সরে আসে এবং সেটি চন্দ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩৩০ মিটার উচ্চতায় পৌঁছলেই ইসরোর কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যা কন্ট্রোল রুমে থাকা প্রতিটি ব্যক্তির মুখের হাসি ম্লান করে দেয়। পরবর্তীতে ইসরোর বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট করেন যে, বিক্রম ল্যান্ডারটি প্রতি সেকেন্ডে ৪২.৯ মিটার উল্লম্ব গতিবেগ বা ভার্টিক্যাল স্পিড (যেখানে অবতরণ মুহূর্তে সর্বোচ্চ গতিবেগ সেকেন্ডে প্রায় ২ মিটার থাকা উচিত) নিয়ে অবতরণের গন্তব্য স্থল থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে আছড়ে পড়ে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে ভুলটা ঠিক কোথায় হয়েছিল?

বিজ্ঞানীদের একাংশ মনে করছেন, ল্যান্ডারের পরিচালন ব্যবস্থার (প্রোপালশন সিস্টেম) গন্ডগোলের জন্য হতে পারে আবার অপর অংশ অনুমান করছেন যে, ল্যান্ডারের স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের (অটোনমাস্ সিস্টেম) অপর্যাপ্ত কর্মক্ষমতাও এর গতিপথ পরিবর্তনের কারণ হতে পারে। তবে ভুল যাই হোক না কেন, সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েই ভবিষ্যতের কর্মসূচির দিকে এগোতে হয়। তবে এখানে বলে রাখা ভাল যে, বিক্রম ল্যান্ডারের সফল অবতরণ সম্ভব না হলেও ইসরো এই চন্দ্রযান-২ মিশনে ৯৫-৯৮% সফল হয়েছে।

২ নভেম্বর, ২০১৯, ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি দিল্লির ৫০তম ডিগ্রি বিতরণী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল এবং  সেখানে চিফ্ গেস্ট হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইসরো চেয়ারম্যান ড. কে. শিভান।  সেখানে তিনি চন্দ্রযান-২ মিশন সম্পর্কে বলেন, ‘হ্যাঁ, আমরা হয়তো এবার পুরোপুরি ‘soft landing’এ সফল হইনি,কিন্তু এটাকে সঠিক করে তোলার জন্য অনেক মূল্যবান তথ্য আমাদের হাতে এসেছে। ইসরো তার এই অভিজ্ঞতা,জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে অবশ্যই ভবিষ্যতে চাঁদের পিঠে ‘soft landing’ এ সক্ষম হবে।’

তিনি সকলের উদ্দেশে উল্লেখ করেন-‘বৈদ্যুতিক বাল্ব তৈরি করতে গিয়ে এডিসন কতবার ব্যর্থ হয়েছিলেন বলা যেমন অর্থহীন, তেমনই নিজস্ব মহাকাশযানের বিকাশে ইসরো কতবার বিফল হয়েছে তাও বলার আজ প্রয়োজন নেই। শুধু বলব, এইসব ব্যর্থতা আমাদের বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। এই সব ব্যর্থতাকে আমরা শেখার সুযোগ হিসাবে ব্যবহার করেছি। আপনারা অবশ্যই মানবেন, যদি আপনি ব্যর্থ না হতে চান তবে কঠিন কিছু করার জন্য জীবনে আপনার কোনওদিন চেষ্টা করাই হয়ে উঠবে না।’

(লেখক দিল্লি আইআইটি-র জেআরএফ)

(ছবি গুগল থেকে নেওয়া)