ড. দেবযানী ভৌমিক চক্রবর্তী

দুলুনির সংসারে ছিল আমাদের নিত্যযাপন। সম্পর্কের খাতিরে প্রবল ভিড়েও বসার জায়গা পেতে অসুবিধে হত না। বিশেষ করে  মনে পড়ছে আমার বাসনওয়ালি দিদিটির কথা। অর্থাৎ দীপাদির কথা। দু’দুটো বড় বাসনের ঝুড়ি ঘাড়ে ঝুলিয়ে যিনি পাড়ায় পাড়ায় ফেরি করতেন। ট্রেনে তিনি আমার একজন অন্যতম নিত্যযাত্রী বন্ধু। দীর্ঘদিন রেলযাত্রা বন্ধ। কী করে চলছে আপনাদের সংসার! অনেক চেষ্টা করেছি, আপনাদের খবর নিতে। কিন্তু কেউই কোনও হদিশ দিতে পারেননি। বাড়িতে রোগভোগের সংসার। ছেলেটাকে নিয়েও দুশ্চিন্তা করতেন। আপনার উপরেই পুরো সংসারের ভার। রাত থাকতেই শুরু হয়ে যেত দিন। সংসারের সব কাজ সেরে সকালেই ট্রেন ধরতেন। তারপরে পথেই কোথাও বসে সঙ্গে আনা ভাত-লঙ্কা-নুন খেয়ে নিতেন। এ ভাবেই চলছিল। কিন্তু আজ! এই ক’টা মাস কী ভাবে চলছে আপনার? এই কোভিডকালে বহু বার আফসোস হয়েছে, কেন যে আপনার কিংবা আপনার পাশের বাড়ির কারও ফোন নম্বরটা জেনে নিইনি! আসলে কখনও তো ভাবিইনি এমনটা হয়, এমনটা হতে পারে!

কোভিড পরিস্থিতিকে সামাল দিতে এই ২০২০-র মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকেই তো ট্রেন বন্ধ। আমরা যাঁরা ট্রেনে চেপে কর্মক্ষেত্রে পৌঁছতাম, তাঁদের অনেকেই তো না হয় “ওয়ার্ক ফ্রম হোম” রপ্ত করে নিয়েছি। মাস গেলে বেতনও পাচ্ছি। কিন্তু মাসমাইনের নিরাপত্তা যাঁদের নেই, আক্ষরিক অর্থেই যাঁদের দিন আনা, দিন খাওয়া! আজ কতটা অসহায় বা আর্থিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তাঁরা সেটাই ভাবছি। আমরা কেউ কেউ ব্যক্তিগত উদ্যোগে হয়তো ওঁদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি বা মানবকল্যাণ সংস্থাগুলোও যথেষ্ট দরদের সঙ্গে কাজ করে চলেছে। কিন্তু তাতে কি আর নিত্যকার অভাব ঘুচবে?

আজ খুব জানতে ইচ্ছে করছে, সীমাদির কথা। সীমা সরকার। পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে শাড়ি বেচতেন। বাবা-মা মাত্র তেরো বছর বয়সেই বিয়ে দিয়ে  দায় সেরেছিলেন। শ্বশুরালয় তাঁকে আর্থিক নিরাপত্তাটকুও দিতে পারেনি। বরং তাঁর রোজগারেই সংসার চলে। সীমাদির মুখেই শুনেছিলাম, বাড়িতে প্রায়ই অশান্তি হত। এই লকডাউনে সেই অশান্তি কি আরও বেড়েছে। সীমাদি কি খুঁজে নিয়েছেন অন্য জীবিকা, নাকি এখনও শাড়িই বিক্রি করছেন? নতুন করে তো কেউ কাজের লোকও রাখছেন না। শাকে অন্ন মিলছে কি? মহামারি বিপন্ন করেছে পৃথিবীকে। মানুষ ঘোরতর বিপদগ্রস্ত। এই সময় সংসারের জোয়াল টেনে যাওয়া এই দিদিদের জন্য মনটা বড় অস্থির হয়ে উঠছে।

রেলপথে নিত্যযাত্রায় প্রায়ই দেখা মিলত রুমা খাতুনের। মুর্শিদাবাদ থেকে বিকেলে হাজারদুয়ারি এক্সপ্রেস ধরে কলকাতা যেতেন। সেখানে তিনি একটি যাত্রাদলে অভিনয় করতেন। পার্শ্বচরিত্র হলেও অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা ও বাড়িতে নিদারুণ আর্থিক অনটনের কারণেই তাঁর এ ভাবে যাত্রাদলের সঙ্গে যুক্ত থাকা। “মাইনে যে পান না, মালিককে বলতে পারেন না?”—একদিন জানতে চেয়েছিলাম। তিনি জানিয়েছিলেন, মালিক নাকি বেশি কিছু বললে আর দলেই রাখবেন না। তাও তো দু’বেলা পেটভরে খেতে পান ওখানে। এছাড়া প্রয়োজনে হাতে সামান্য কিছু তুলেও দেন মালিক। করোনা পরিস্থিতিতে তো যাত্রাদলগুলির ম্রিয়মান অবস্থা; কোথাও জনসমাবেশ ঘটানোটাই তো বিপজ্জনক, কাজেই তিন দিক খোলা মঞ্চে যাত্রাটা হবে কী করে? বছর চল্লিশের রুমা কি আজ বিকল্প পথ খুঁজে পেয়েছন? নাকি প্রবল হতাশায় ঘরের কোণে অনাহারে বা অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন!

খুব মনে পড়ে মিনতিমাসির কথা। মুড়ির বস্তা নিয়ে উঠতেন। মাথার সব চুল পাকা। মাঝেমাঝেই ওঁর কাছে মুড়ি নিতাম। “এই বয়সে কেন এত পরিশ্রম করতে হয় মাসি? বাড়িতে কে কে আছেন?” প্রশ্ন করায় জানতে পেরেছিলাম, তাঁর স্বামী যতদিন বেঁচে ছিলেন তাঁদের অবস্থা বেশ ভালোই ছিল। বাড়িতেই মুদির দোকান ছিল। ভালোই চলত। তাঁর স্বামী মারা যেতেই তাঁর এমন হাল! বলেছিলেন, ওঁর একটি ছেলে নাকি স্কুলে চাকরি পেয়েছেন। বলেছিলাম, “তা হলে এ বার তুমি আরাম করো।” মাসি বলেছিলেন,”যতদিন পারব কাজ করব, কারও গলগ্রহ হতে চাই না।” ভোর ৪টেয় লালগোলা থেকে ট্রেন ধরে বেলডাঙায় আসতেন। সেখানে মুড়ি বিক্রি করে ফেরার পথে আমাদের সঙ্গে দেখা হত। ট্রেনে একটু বসতে পেলেই অঘোরে ঘুমোতেন। কেমন আছেন তিনি এই অসময়ে? শিক্ষকপুত্র মাকে দেখছেন কিনা কে জানে!

নিত্যদিনের ট্রেনযাত্রায় মহিলা কামরায় অনেক তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে অশান্তি, দ্বন্দ্ব থাকলেও এই দুলুনির সংসারে আমরা যে কতটা পারস্পরিক আবেগে জড়িয়ে ছিলাম, তা এখন আরও বেশি করে বুঝতে পারছি। এটাও উপলব্ধি করছি যে, সকলের ফোন নম্বর বা ঠিকানা রাখাটা কতটা জরুরি। তাহলে অন্তত একটা ফোন করে তো খোঁজ নিতে পারতাম। শুনছি, খুব শিগ্গির আবার রেলযাত্রা শুরু হবে। এ বার আর ওই ভুল করব না। সকলের নাম, ঠিকানা নিয়ে রাখব।

(লেখক সহকারী অধ্যাপক, শ্রীপৎ সিং কলেজ, জিয়াগঞ্জ, মুর্শিদাবাদ)

(ফিচার ছবিটি গুগল থেকে নেওয়া)