শুভদীপ ভট্টাচার্য

প্রায় আট মাস ঘরে বসে আছেন রমেন। কাজ নেই। এতদিন রমেনকে দেখা যেত নিয়ম করে স্টেশনের বাইরে। জামাকাপড়ের বিরাট ডাঁই নিয়ে বসতেন রোজ। দরদামে কখনও একটু জিতে গেলে ঠোঁটে ফুটত হাসি। পাতে সেদিন আনাজের বদলে জায়গা করে নিত ছোট মাছ। কিন্তু সরকারের একদিনের ঘোষণায় থমকে গেল সব।

সেই থেকে থেমেছে কালের যাত্রার ধ্বনি। আদিগন্ত মাঠের উপর পাতা আছে লোহার পাত, তার উপর অবিরাম যাতায়াত কালের শকটযানের। নানা উপায়ে এরই মাঝে বেঁধে বেঁধে থাকত ‘দুলুনির জীবন’। ‘ চেনা চেনা চায়ের গেলাসে’ চুমুক দিতে দিতে অনাত্মীয়রা ভিড় বাড়াতেন মনবারান্দার অন্দরমহলে। এক সময়ে হয়ে ওঠেন নিকটাত্মীয়। ফেলে আসা স্কুলস্মৃতি উস্কে দেয় বন্ধুত্বের আঁচ। গাছ জড়িয়ে বেঁচে থাকা অজানা লতাপাতার মতোই প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন চাওয়ালা শামিম, আরোহীদের কোলের উপর গামছা বিছিয়ে দিতেন মনসুর, দেশ বিদেশের হাল হকিকতের খবরের জোগান দিতেন বাপন, জামাকাপড়ের সম্ভার নিয়ে হাজির হয়ে যেতেন রমেন। কিন্তু একদিনের ঘোষণায় হঠাৎ করেই থমকে গেল সব। চিন্তার ভাঁজে কপালের বলিরেখা স্পষ্ট হয় রাজু, বাপি, শামিম, মনসুর, রমেনদের।

দীর্ঘ আট মাস বেকার জীবনের ঝাল-নোনতা দিন পেরিয়ে একদিন টিভি স্ক্রিনে ট্রেন চলাচলের সরকারি ঘোষণা শুনে বুকের রক্ত যেন চলকে ওঠে রমেনের। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দুলুনি কিছুটা থিতু হলে  স্টেশন মাস্টারকে ছুড়ে দেন, ‘ও মাস্টার, সত্যি সত্যিই ট্রেন চলবে নাকি গো?’

রমেন হালদার বহরমপুরের বাসিন্দা। বয়স বছর চল্লিশ। পেশায় ফিরিওয়ালা। কোভিডকালের আগে নিয়ম করে তিনি বসতেন বহরমপুর স্টেশনের সামনে। সারাদিনে কেনাবেচা করে হাতে থাকত মেরেকেটে শ’তিনেক টাকা। রাধারঘাটে এক চিলতে ঘরের নীচে সেই রোজগার সম্বল করে বেঁচে থাকে চারটি পেট। শুধু পেট নয়, নিজে লেখাপড়ার দৌড়ে বারবার হেরে গিয়ে জন্ম নিয়েছে এক অদম্য জেদ। জীবনের দৌড়ে ছেলেমেয়ের জয় দেখার ষোলোআনা সাধ তাঁর। কিন্তু লকডাউনের কারনে বন্ধ রোজগার। ফলে স্বপ্নগুলো রয়ে গিয়েছে অধরাই। বিধাতার করুণার মতো জুটেছে রেশনের চাল, আটা, গম। তাই দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে অন্নপূর্ণার সংসার।

স্টেশন চত্বর সুনসান। শূন্যতা গিলে নিয়েছে সাইকেল গ্যারেজগুলো। সন্ধের পরে পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে ছ্যাঁৎ করে ওঠে বুক। গমগম স্টেশনের গটগট পায়ের আওয়াজ না শুনতে শুনতে যেন বধির হয়ে গিয়েছে স্টেশন। শুধু টিমটিম করে চলছে দু’একটা বেকারি, কতিপয় চা ও ফলের দোকান। অতিথি নারায়ণ প্রবাদটি ওঁদের কাছে খুব সত্যি। গুটিকয়েক চেনা মুখের ভিড় বাড়ছে সন্ধের পর। সকালের ঝিলিমিলি রোদে বাপির চা-দোকানে আনাগোনা করছে কিছু ‘নাছোড়বান্দা পাখি’। তবে সকাল বিকেল ভিড় করে আসে না সেই অচেনা মুখগুলো। যাঁদের চা-আড্ডায় ভরে উঠত লক্ষ্মীর ঝাঁপি। পরোটার চাটুর ধোঁয়া চারদিক ছড়িয়ে পড়ছে নিজস্ব নিয়মে, কিন্তু সেই চেনা ভিড় বিলকুল উধাও। বারবার খোলা ড্রয়ারে চোখ রেখে উৎপল একবার হাত বুলিয়ে দেখে নেন হারানো অতীত।

পাউরুটির গন্ধে ম ম করছে এলাকা। কিন্তু পলাশির স্কুল শিক্ষক, রেজিনগরের ব্যাঙ্ক কর্মচারী, আশা’র দিদিরা আর আসেন না। সম্পর্কের ফল সরাসরি সমানুপাতিক। ব্যবসায় মন্দা। ফাঁকা  টুকটুক চালকের রোজগার কমে একের চার। ওঁদের প্রত্যেকের পালক ট্রেন। যাত্রীরা আরাধ্য, রথের মধ্যে থাকা জগন্নাথ। রথ হয় হররোজ। রোজগারও হয় অনেকের। ট্রেন-রথের চাকা সচল থাকলে গতি পায় সংসারের চাকাও।

গত মার্চের একটি সরকারি ঘোষণা ওলটপালট করে দেয় সব। রাজ্য সরকারের ট্রেন চালানোর সদিচ্ছায় তাই ঠোঁটের কোণে সকালবেলার রোদ্দুরের ঝিলিক বাপি, উৎপল, রমেনদের মুখে।

যাত্রা শুভ হোক। শুভ হোক জীবন-যাত্রাও।

(ফিচার ছবিটি গুগল থেকে নেওয়া)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here