কাবেরী বিশ্বাস

দুয়ারে দীপাবলি। প্রতি বছরের মতো এ বারেও বাজি পোড়ানো নিয়ে পরিবেশপ্রেমী ও আনন্দ উৎসুক মানুষের মধ্যে তর্কবিতর্ক চলছে। আচ্ছা, আমরা যদি দীপাবলির ইতিহাস দেখি তাহলে কী দেখতে পাব? দীপাবলিতে বাজি পোড়ানো কি ভারতীয়দের ঐতিহ্য?

দীপাবলি মানে দীপের সারি। অর্থাৎ, আলোর উৎসব। অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর, অশুভের বিরুদ্ধে শুভের জয় আর অজ্ঞানতা থেকে জ্ঞানের আলোয় উত্তরণের উৎসব দীপাবলি। তমসো মা জ্যোতির্গময়। উপনিষদের এই বাণীই যেন দীপাবলির প্রার্থনায় মূর্ত হয়ে ওঠে। বারুদের বা শব্দের উৎসব নয়। ভারতের বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ দীপাবলি উৎসব পালন করেন। হিন্দু মতে এ দিন শ্রী রামচন্দ্র চোদ্দো বছরের বনবাস শেষে রাবণ বধ করে অযোধ্যায় ফেরেন। আনন্দে উদ্বেলিত অযোধ্যাবাসী ঘিয়ের প্রদীপ জ্বেলে সাজিয়ে তোলেন রাজধানী। জৈনরাও পালন করেন আলোর উৎসব। জৈন মতে, মহাবীর দীপাবলির দিনে মোক্ষলাভ করেন। শিখদের ষষ্ঠ গুরু হরগোবিন্দ এই দীপাবলির দিন কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন বলে শিখরাও এই আলোর উৎসব পালন করেন। গ্রামীণ ভারতের কৃষিজীবী মানুষের কথা ভাবলেও দেখা যায়, এটি আলোর উৎসব। অগ্রহায়ণ মাসে উঠবে ফসল। তাকে বাঁচাতে পোকামাকড়ের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য দীপাবলি। চতুর্দশী থেকে প্রতিপদ প্রদীপ জ্বালিয়ে বর্ষায় বেড়ে ওঠা পোকাদের আত্মাহূতির আয়োজন করা। অতীতকাল থেকে এ উৎসবে শুধুমাত্র প্রদীপ জ্বালানো হত। প্রদীপের আলোতেই দূর হত সব অশুভ।

আজকের দিনের চরম অশুভ করোনা ভাইরাস চিন থেকে এসেছে বলে আমরা অনেকেই বিশ্বাস করি। যে ভাইরাস আমাদের জীবনকে তছনছ করে দিয়েছে। আধুনিক উৎসবের নামে আনন্দের টানে যে অমঙ্গল আমরা ডেকে এনেছি,  সেই বাজিও কিন্তু এসেছে চিন থেকে। বাজি  আবিষ্কার হয়েছে চিনে। বহুদিন আগে চিনে নানা উৎসবে বাজি পোড়ানোর রীতি ছিল। পরে অন্য দেশে রাজা-মহারাজারা নিজেদের উৎসব অনুষ্ঠানে বাজি পোড়ানো শুরু করেন। যেমন জয়পুরের মহারাজা বিদেশ থেকে বাজি আনাতেন। ধীরে ধীরে দেশেও বাজি তৈরি শুরু হয়। প্রথম বাজি কারখানা স্থাপিত হয়েছিল কলকাতায়। গত পনেরো-কুড়ি বছরে আমরা বাজিপোড় হয়ে গিয়েছি। উৎসব হোক বা খেলা সব কিছুতেই আমাদের আনন্দ উপভোগের অপরিহার্য সামগ্রী করে তুলেছি বাজিকে।

আমাদের সমাজে আনন্দ করার পদ্ধতি বদলে যাচ্ছে। আগে উৎসবে ছিল নিজের ও সকলের মঙ্গল কামনা। আজ তা উন্মাদনা। তাতে নিজের ও দশের ক্ষতিও আমরা মেনে নিতে রাজি। মৃত্যু জেনেও কোভিড নিয়মকে যেমন উপেক্ষা করছি, তেমনি বাজির জন্য জীবন বাজি রাখছি। নিজেকে নির্মম উদাসীনতায় ঘিরে ফেলাই যেন নতুন সংস্কৃতি। শব্দবাজিতে যদি আমার অসুস্থ বৃদ্ধ-বৃদ্ধা সহনাগরিকেরা কষ্ট পান, যদি মারাই যান, তাহলে?  কিছু লোকজন যুক্তি দেন, মানুষ তো একদিন মারা যাবেই। যদি আতশবাজির ধোঁয়ায় ধোঁয়াশা তৈরি হয়, আমার, আমাদের বাড়ির শিশুরা যদি ফুসফুসের অসুখে আক্রান্ত হয়, যদি শব্দবাজিতে সে বধির হয়ে যায়। তখনও ছিটকে আসে যুক্তি, গেলে যাবে! এত ভাবলে তো কিছুই করা চলে না।

কিছু লোকজন আবার বাজি ব্যবসায়ীদের দুঃখে কাতর হয়ে বাজি পোড়ানোর পক্ষে সওয়াল করেন। তাঁরা বলেন না, প্রতিবছর বায়ুদূষণে ভারতে লক্ষাধিক লোক মারা যান। এ বছর তো কোভিডের কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষের বিপদ, তাই বাজি বন্ধ থাক। সরকার ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দিক। যেমন ভাবে দুর্গাপুজায় ক্লাবগুলোকে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল। কালীপুজো কমিটিগুলো অনাড়ম্বর পুজো করে উদ্বৃত্ত অর্থ দান করতে পারেন। সরকার আগামী বছর থেকে বাজি শ্রমিকদের বিকল্প শিল্পে নিয়োগের ব্যাপারে উদ্যোগী হতে পারে। কালের নিয়মে বহু শিল্প হারিয়ে গিয়েছে, মানুষ নতুন পথ খুঁজে নিয়েছে। একটা পথ বন্ধ হলে তবেই তো নতুন পথ খোঁজা শুরু হবে।

আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে এত বাজি ছিল না। ইলেকট্রিক আলোর সজ্জা ছিল না। তখন কি আমরা আনন্দ পেতাম না। পেতাম। কারণ, সেই আনন্দোৎসবের আয়োজনে আমরা নিজেদের যুক্ত করতে পারতাম। ইলেকট্রিশিয়ান ডেকে আলোর মালা লাগিয়েই আমাদের আয়োজন ফুরিয়ে যেত না। মাটির প্রদীপ কিনে তাকে জলে ভিজিয়ে, শুকিয়ে সলতে পাকাতে হত। মোমবাতি মাটির খুরিতে বসিয়ে রঙিন কাগজ দিয়ে তাকে ঘিরে দেওয়া হত। আলপনা দেওয়া হত। অনেক কাজে ছোটরাও বড়দের সঙ্গে সঙ্গেই থাকত। বাজিও পোড়ানো হত অল্পস্বল্প।  এটুকুতেই আমরা নির্ভেজাল আনন্দ পেতাম। কোনও কিছুই অতিরিক্ত নয়, সংযম দরকার, এ কথা মা-বাবা-বাড়ির গুরুজনেরা আমাদের বুঝিয়ে দিতেন। আজকাল বহু বাবা-মায়েরা বলেন, বাচ্চারা শুনবে না। শুনবে, তাদের বোঝাতে হবে কেন বেশি বাজি পোড়ানো যাবে না। তারা আমাদের চারপাশে যা দেখে, তাই শেখে। বড়রা যদি সংযত হই, ওরাও মেনে নেবে। যেমন করে তারা এ বছর দুর্গাপুজোয় ঘরে থাকা মেনে নিয়েছে। কয়েকটি পরিবার মিলে তাদের নিয়ে নানা প্রতিযোগিতার আয়োজন করে তাদের পুরস্কৃত করা গেলে তাদের সময় আনন্দে কাটবে।

এ বছর আমরা হারিয়েছি বহু সহনাগরিককে। আমার দেশের বহু মানুষ আজ কর্মহীন। বহু মানুষের বাজি কেনা দূরের কথা, চাল-গম-ওষুধ কেনার টাকা নেই। তাঁদের সামনে বাজি পুড়িয়ে উৎসব করা সাজে না। তাই আসুন, আমরা এ বছর সাধারণভাবে দীপাবলি পালন করি। আমাদের সন্তানদেরও শেখাই, অতিমারিতে দেশ যখন বিপর্যস্ত তখন আনন্দ উৎসব বন্ধ রাখাটাই মনুষ্যত্বের পরিচয়। আসুন, বাজি পুড়িয়ে ছাই করার জন্য রাখা টাকা আমরা মানুষের দুর্দশা দূর করার জন্য কাজে লাগাই।  আলোর উৎসবে অন্ধকার দূর হোক।

(ফিচার ছবিটি গুগল থেকে নেওয়া)

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here