সোহম চক্রবর্তী

আঁধারঘন বিষাদছায়ায় দাঁড়িয়ে রয় হেমন্তের মেয়ে। হেমন্তিকা। দাঁড়িয়ে রয় রিক্ত, চুপ ফুলের বাগানে। কাশফুল ঝরে যাওয়া জলাঙ্গীর তীরে সন্ধের হাওয়া ওঠে – শূন্য, ধূসর। ছড় টেনে যায় হাওয়া আকুল বেহাগে। ‘এল আঁধার, দিন ফুরালো’। দীপালিকায় আলো জ্বালার ডাক পৌঁছে গেল ঘরে ঘরে।

আলতো আঁচলে ঘেরা আকাশপ্রদীপ মলয় বাতাসে কাঁপে– তিরতির, তিরতির। আবহমানের চোখে কাঁপে সেই জ্বলজ্বল আলো। পূর্বপুরুষেরা নাকি সে আলো দ্যাখেন। বুঝে নেন, ফেলে আসা ভিটেমাটি, বসতের ঘর– সবটুকু ঠিক ঠিক আছে। এ মায়াপ্রপঞ্চের লতা তোমাকেও বুঝি বেঁধেছে, মহাকাল– পৌঁছে দিয়েছে অনশ্বর আলো, জন্মজন্মান্তরে। সেই আলো দ্বারে দ্বারে জ্বালে পাড়াঘর। মোমশিখা জ্বলে ওঠে ছাদের রেলিংয়ে। বাহারি চাইনিজ় টুনি থেকে থেকে ফ্যালে তার চোখের পলক। যে হাত গিয়েছ ছেড়ে, সে হাতের ডিঙিনৌকো প্রদীপ ভাসায়– একটু একটু ঠেলে দেয় জল, স্রোতের উজানে।

ভাঁড়ারঘরে চোদ্দো শাকের টগবগ টগবগ, মিহি সবুজ ঘ্রাণ। উৎসব– আহা, উৎসব– আলো তার বন্দনা, স্তবমন্ত্র – আলো স্তোত্রগান। প্রাচীন জনপদ যেন সেই গানে জাগে। সেই গান বেঁধে দেয় অগোছালো কুটিরের বেড়া। সুরের সুদূর পারে এসে দাঁড়ান মহাতমস্বিনী। পল্লীর মেয়ে হয়ে দড়িটি ধরেন। সৃষ্টি স্থিতি লয়ের গর্ভে ‘অতল কালো স্নেহে’র আঁধার বাঁধা পড়ে আলোয় আলোয়। বাঁধা পড়ে গানে। পরমা প্রকৃতি যেন চাপারং, শ্যামলা কিশোরী– এই আলো, এই গান তাঁর গলে জবাকুসুম মালা। অশান্ত কমলাকান্ত সে মালা গাঁথেন। তবিলদারির খাতায় মালা গাঁথেন রামপ্রসাদ। কালো মেয়ের গলায় দোলে মহাজীবনের আনন্দিত গান। ‘কালো মেয়ের পায়ের তলায়’ নেচে ওঠে অনন্ত আলোকলহরী।

আঁধার আলোর দ্বৈত আখর মাতৃস্বরূপিণী। আদিম কালো জঠরজলে মায়াবীজ, জন্মসম্ভব। যেন কোন তুলসীতলা– অনির্বাণ দীপ জ্বলে, অনাদি সে পুরুষস্খলিত – ধূপে ওঠে অলৌকিক চন্দনের ঘ্রাণ; গুরুমন্দ্র কণ্ঠের উচ্চারিত ‘ওম্’-এ জেগে থাকে অনিঃশেষ সুরসম্ভাবনা। খেলা করে চরাচর পাগলে পাগলে। হৃদিপদ্মে লাগে ধুম। কেঁপে ওঠে প্রত্নপদাবলী। তামস – ঘন সেই অন্ধতামসে সদানন্দের দোলা। ‘মহানন্দে সদানন্দে আনন্দময়ী পড়েছে ঢ’লে’।

ত্রিতাপহরা অন্ধকারে নৃত্যগীত আকুলিবিকুলি। এ আনন্দ শিল্পিত, নান্দনিক। এই গোলযোগ, উন্মাদনাই সৃজনসম্ভবা। সৃজন – অদ্বৈত, অসীম আঁধার ঠিকরে আসা আলো। ‘তোমার আঁধার, তোমার আলো’-য় এই তো আমার যুগ্ম সম্ভোগ। আনন্দসম্ভোগ। এই রসে দগ্ধ রিপু, ইন্দ্রিয়াদির ছাইভস্ম মাখা প্রজ্ঞা মেধা মহাজ্ঞান আলো করে জ্বালে দেহের দেউটি।

সীমায়িত জীবনে যেন স্পন্দিত নিহিত অসীম। স্ফুটের মাঝে অস্ফুটের, ব্যক্তের বুকে অব্যক্তের এই বুঝি লীলা গো, সহজ। এই বুঝি সহজিয়া ফসলের গান। ‘মন রে কৃষিকাজ জানো না’। ও মন, ভ্রমে ভ্রমে বেলা যে ফুরায়। শুষ্ক ঊষর জনম থেকে আর উঠবে কি মায়াস্বর্ণধান? এই বোধে, এই বিপন্নতায় হে মহাকাল – আমাকে কাঁদাও। যে মাটি অশ্রুসিঞ্চিত, যে মাটি কর্ষিত ভক্তিপ্রেমধারে – পূর্ণ হ’ল কি তার জপতপ, দীর্ঘ সাধন? অরূপের রূপ হ’য়ে ফুটে ওঠা সে কি তবে শেখেনি এখনও? সৃষ্টি স্রষ্টা আর সৃজনক্রিয়াকে এক ক’রে নেওয়া এখনও কি অলব্ধ তার? হৃৎকমলে ঢেউয়ের ঝাপট কী মূর্তিতে ধরব আমি তবে? কোন্ সুরে আর কোন্ সে কথায় বাঁধব এই আকুল মধুঘ্রাণ – প্রকাশপিয়াসিনী?

সমর্পণের স্থিরবিন্দু এখনও কি উদ্ভাসিত নয়? অগম সেই আলোকরেখা তন্দ্রাঘোরে জ্বলে। আপন আলোর পদচিহ্নে মহাতামস জয়ের বাণী জ্ব’লে থাকে মোহে, স্পর্শাতীত।

ঘরে ঘরে দীপাবলি আজ। আঠেরো শতকের ব্রহ্মগ্রাম জুড়ে পূজার্চনা শুরু। ‘কালী কালী মহাকালী কালিকে পাপহারিণী’। স্নিগ্ধ আলোর স্নানে ধুয়ে যায় পাপতাপ, সমূহ স্খলন। শক্তিমন্ত্রে জাগ্রত ধর্ম অর্থ মোক্ষলাভের অনাদি বন্দনা। নদীয়ারাজের হাতে গড়া ছোট এই ব্রাহ্মণ বসতি। আঁধারে আলোয় মিশে অগণিত জনশ্রুতি, সহজ বিশ্বাস। এ বিশ্বাসে, ভালোবাসায়, প্রেমে থইথই ও সুদূর ভাগীরথীতীর। পরমহংসের ঠাকুরঘরে চুপিচুপি ছুটে আসে আঁধারবালিকা – আলপনা পায়ে। দূরদেশ নবদ্বীপে তারই হোমে আহুতি দেন আগমবাগীশ। ওম্ স্বহাঃ – জেগে ওঠো আলো, জাগো এই অমোঘ আঁধারে। উৎসব – আহা, উৎসব – আলোকের অমল উদযাপন।

নিত্যকালের এ উৎসবে আমিও জ্বলি আপন শিখায়। ‘হিমের রাতে ওই গগনের’ আলোকমালায় আমিও বুঝি একটা একটা পুষ্পপ্রদীপ। আর যে মেয়েটি, হেমন্তিকা নাম – পূরবী রাগের মতো বিষণ্ণ এক আঁচলছায়া বিছিয়ে দেয় বুকে – দু’-হাতের ডিঙিনৌকো ছেড়ে তার স্মৃতি ভেসে যায় বহুদূর পথ। তারপর দীর্ঘ শীত – উদাসী হাওয়ার ঋতু শিরশির ক’রে ওঠে শিরায় শিরায়। পলকের ’পরে দেখা একাকিনী ছায়া – তোমাকেই বলি, হেমন্তে হেমন্তে যেন মৃৎপ্রদীপ জ্বলে; থালায় সাজানো আলো যেন ছুঁয়ে থাকে তার মায়াময়ী মুখ – সহসা যাবার আগে সে যেন একবার আলতো তাকায়, তৃতীয় নয়নে…

(ফিচার ছবিটি গুগল থেকে নেওয়া)

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here