মুর্শিদাবাদের হরিহরপাড়ার প্রতাপপুর থেকে সটান জাপান। ভারতীয় সংস্কৃতিকে প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে সেখানকার মানুষের কাছে তিনি এ দেশের ‘আনঅফিসিয়াল অ্যাম্বাসাডার’। জাপানের বেতারে, টিভিতে বারেবারেই তিনি আলোচিত, নিজের কাজ সকলের কাছে তুলে ধরার জন্য আমন্ত্রিত। সংবাদমাধ্যমে চেনা মুখ। তিনি ট্রান্সফর্মেশন কোচ, যোগগুরু, মোটিভেশনাল স্পিকার, হিলটোকিয়ো এবং হিলইন্ড্যা মুভমেন্টের সংগঠক এবং সর্বময় কর্ত্রী। তিনি নূপুর তেওয়ারি। সম্প্রতি সময় দিয়েছিলেন সাদাকালো-কে। তাঁর সঙ্গে কথা বললেন সুদীপ জোয়ারদার।

সাদাকালো- কোথায় থেকে শুরু করি, বলুন তো?
নূপুর তেওয়ারি- বর্তমান দিয়েই শুরু করুন। কারণ, বর্তমান, অতীত আর ভবিষ্যতের মধ্যে আমরা সবচেয়ে অবহেলা করি বর্তমানকে। বর্তমানে থাকলেও হয় অতীতে ডুবে যাই, নইলে ভবিষ্যতের কথা ভাবি।
সাদাকালো- বেশ। আপনি জাপানে কতদিন আছেন?
নূপুর- আমি জাপানে এসেছি ২০০৩ সালে। তার মানে আঠারো বছর চলছে।
সাদাকালো- কেমন লাগে দেশটাকে?
নূপুর- জাপান আমার সেকেন্ড হোম। আমাকে অনেক কিছু দিয়ে দিয়েছে এই দেশ।
সাদাকালো- এখন তো জাপানের টোকিয়োতে থাকেন। বরাবরই কি এখানে?
নূপুর- টোকিয়োতে এসেছি বছর তিনেক হল। এর আগে থাকতাম ফুকুয়োকা শহরে।
সাদাকালো- টোকিয়ো তো খুব জনবহুল শহর।
নূপুর- হ্যাঁ জনবহুল। ফুকুয়োকাতে সে তুলনায় ক্রাউড অনেক কম। বেশ শান্ত। সামনেই সি বিচ ছিল। টোকিয়োতে থাকলেও আমি খুব মিস করি শহরটাকে।
সাদাকালো- এ বার আপনার কাজ সম্পর্কে বলুন।
নূপুর- এখানে আমার বর্তমান পরিচিতি ট্রান্সফর্মেশন কোচ। ট্রান্সফর্মেশন মানে অবশ্যই দৈহিক নয়, ইন্টারনাল।
সাদাকালো- সেটা কি যোগের মাধ্যমে?
নূপুর- অনেকটা যোগের মাধ্যমেই। তবে আপনারা যোগ বলতে যা বোঝেন, মানে ওই কপালভাতি, অনুলোম বিলোম ইত্যাদি ইত্যাদি। এই ব্যাপারটা আসলে তেমন নয়। এর সত্তর শতাংশ ইন্টারনাল মানে আত্মোপলব্ধির ব্যাপার, মাত্র তিরিশ শতাংশ বাইরের, মানে শারীরিক।
সাদাকালো- আপনার হিল টোকিয়ো মুভমেন্ট ব্যাপারটা কী?
নূপুর- এটা ২০১৭ সালে শুরু হয়। এটা বিনা পয়সায় যোগ এবং কাউন্সেলিং। এই মুভমেন্টটার মূল লক্ষ্য জাপানের ক্রমবর্ধমান আত্মহত্যার হার কমানো।
সাদাকালো- এটার ফিডব্যাক কেমন?
নূপুর- খুব ভালো। লক্ষাধিক মানুষকে ইতিমধ্যেই আমরা এই পরিষেবা দিয়েছি। অনেকেই এই পরিষেবা পেয়ে উপকারের কথা জানিয়েছেন।
সাদাকালো- হিলিইন্ড্যা কি এটারই সম্প্রসারণ?
নূপুর- অনেকটা। তবে এর সঙ্গে কিছু সাহায্যমূলক কাজকেও আমরা যুক্ত করে নিয়েছি।
সাদাকালো- কী রকম?
নূপুর- যেমন আলিগড়ে আমরা একটা স্কুলকে অ্যাডপ্ট করেছি। যেখানে স্কুলটাকে নতুনভাবে সাজানোর পাশাপাশি ছাত্রদের প্রয়োজনীয় বই, পোশাক অন্য জিনিসপত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে ফিনানসিয়াল এমপাওয়ারমেন্ট-এর জন্য অনেকে রয়েছেন। আমার কাজ হল যুবশক্তিকে তাদের মানসিক শক্তি উপলব্ধি করানো।
সাদাকালো- এই যে জাপান, ভারত জুড়ে এত কর্মকাণ্ড, এতে তো খরচের একটা ব্যাপার রয়েছে।
নূপুর- আমাদের ফ্রি সেশনগুলোতে একটা ডোনেশন বক্স রাখা হয় যাতে আমাদের উদ্যোগ বহু মানুষের কাছে ছড়িয়ে দিতে পারি। এখানে কেউ এক টাকাও দিতে পারেন, কেউ কিছু না-ও দিতে পারেন। তবে যা জমা পড়ে তাতে অসুবিধা হয় না। আসলে, মানুষের জন্য কাজে বোধহয় ইচ্ছেটাই বড়  কথা।
সাদাকালো- মুর্শিদাবাদ থেকে জাপান, জার্নিটা একটু বলুন এ বার।
নূপুর- মুর্শিদাবাদের একটা ছোট গ্রামে আমার শৈশব কেটেছে। গ্রামের নাম প্রতাপপুর। ওখানে আমাদের বাড়ি এখনও রয়েছে। আমার ছেলেবেলায় প্রতাপপুর খুব রিমোট গ্রাম ছিল। বিদ্যুৎ ছিল না। স্কুল একটাই, রুকুনপুরে। যেত হত চার কিমি পথ হেঁটে। অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাওয়াই ছিল ওইসব জায়গার রীতি। কিন্তু আমার নিজের সম্পর্কে এ ভাবে চিন্তা করতে ভাল লাগত না। আমি অন্য ভাবে ভাবতাম। মনে হত, চেনা ছকের বাইরে বেরিয়ে আমি অন্য কিছু করতে পারি। কিন্তু খুব লাজুক ছিলাম। মনের কথা থেকে যেত মনেই।
সাদাকালো- রুকুনপুর স্কুল থেকে পাশ করে কোথায় এলেন, বহরমপুর?
নূপুর- হ্যাঁ, বহরমপুরে। ওখানে কলেজে ভর্তি হলাম। গ্রামের মেয়ে, শহুরে কায়দায় অভ্যস্ত নই। ফলে প্রতি পদক্ষেপে তখন আওয়াজ খাই সহপাঠীদের কাছ থেকে। এরমধ্যে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এক বিত্তবান মানুষ এলেন ওখানে। আমার তো সে প্রস্তাবে রাজি হবার প্রশ্নই ছিল না। প্রত্যাখ্যাত হয়ে সেই লোক একদিন এক কাণ্ড করে বসলেন। আমাকে ড্রেনে ফেলে দিলেন। পুলিশ স্টেশনে গেলাম। কিন্তু থানায় সে লোকের প্রভাব থাকায় কেস নিল না, উল্টে হাসি-তামাশার শিকার হলাম। কিন্তু আমি অনড়। থানায় সেই সময় পুলিশ সুপার এসে পড়ায় তিনি কেসটা টেক আপ করে লোকটিকে  অ্যারেস্ট করলেন। ঘটনাটা এত বিস্তারিতভাবে বলার কারণ, সেদিনই গ্রামের ভীতু লাজুক মেয়েটি বুঝতে পেরেছিল তার ভিতরের শক্তিকে।
সাদাকালো- উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পরে আপনি কি ওই কলেজেই ভর্তি হলেন?
নূপুর- হ্যাঁ, ওই কলেজেই। ট্যুরিজ়ম অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট নিয়ে। রেজাল্ট খুব ভাল হল। ইউনিভার্সিটি টপার হয়ে গেলাম।
সাদাকালো- জাপানে কীভাবে এলেন?
নূপুর- ২০০৩ সালে মিৎসুবিশিতে একটা চাকরি পেয়ে যাই। সেই সূত্রে চলে আসি জাপানে।
সাদাকালো- জাপানে শুরুটা কী ভাবে হল?
নূপুর- আমি সবসময়েই চাইতাম, যুবশক্তির মানসিক ও আত্মিক উন্নতি। জাপানে এসে দেখলাম, আমার ট্যুরিজ়ম ম্যানেজমেন্টের যে কনসেপ্ট আমার মধ্যে রয়েছে সেই ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ প্রয়োগের বিশাল ক্ষেত্র রয়েছে এখানে। পাশাপাশি, নাচ, গান, যোগের মাধ্যমে মন ও আত্মাকে শান্ত করে ইয়ুথ এমপাওয়ারমেন্টেরও প্রচুর স্কোপ রয়েছে। ব্যস, শুরু করে দিলাম।
সাদাকালো- এখনও পর্যন্ত স্বীকৃতি?
নূপুর- আমার কাজ ইউনাইটেড নেশনের নজরে এসেছে এবং প্রশংসিত হয়েছে। শ্রীলঙ্কা, আফ্রিকায় বন্যার পরে ওখানকার লোকেদের মেন্টাল রিকভারির জন্য তাঁরা আমাকে নিযুক্তও করে। এছাড়া নার্গিস দত্ত ফাউন্ডেশন, এসবিআই ওমেনিটি ফাউন্ডেশন ইত্যাদি অনেক সংগঠনের কাছ থেকে  আমার কাজ প্রশংসিত হয়েছে।
সাদাকালো- করোনা ভাইরাসের প্রভাব তো জাপানে অনেক কম। এই সময়ে নিজের দেশের জন্য কিছু কি করছেন?
নূপুর- হ্যাঁ, হ্যাঁ অবশ্যই। কোভিড-১৯ হিলিং সেশন শুরু করেছি ভারতে। যাঁরা লকডাউনে বা করোনার কারণে ঘরবন্দি রয়েছেন তাঁদের জন্য। এটা ফ্রি, পেইড দুরকমই আছে। ফ্রি আমার ফেসবুক পেজে। আর জুমে পেইড সার্ভিস। সে টাকা সরাসরি চলে যাবে ‘পিএম কেয়ারস ফান্ডে’।
সাদাকালো- ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা?
নূপুর- আমি গ্রামের মেয়ে। আমি জানি, এখনও আমার দেশে মেয়েদের অবস্থাটা কীরম। আমি চাই, মেয়েরা নিজেদের ভিতরের শক্তিকে বুঝুক, জানুক, এগিয়ে যাক। এজন্য আমি ভারতে আমার কাজকে গ্রামীণ মেয়েদের মধ্যে প্রসারিত করতে চাই। সংশোধনাগারে বন্দিদের নিয়েও কাজ করার পরিকল্পনা আছে।
সাদাকালো- দেশে আসেন?
নূপুর- আসি, প্রতি বছরেই। এ বার ফেব্রুয়ারিতে গিয়েছিলাম। করোনার জন্য আবার কবে যাব জানি না।
সাদাকালো- অনেকক্ষণ কথা বললাম। একটা বাচ্চা মেয়ের গলা শুনছি…
নূপূর- আমার মেয়ে, এগারো বছর। বাংলা কিন্তু বলতে পারে। তবে সাবলীল নয়।
সাদাকালো- ভাল লাগল কথা বলে।
নূপুর- আমি তো আগেই বলেছি, আমি বর্তমানকে খুব গুরুত্ব দিই। তাই মন খুলে কথা বলেছি। এনজয় করেছি আপনার সঙ্গে কথা বলার প্রতিটা মুহূর্ত।
সাদাকালো- ধন্যবাদ, ভালো থাকবেন।
নূপুর- আপনাকেও ধন্যবাদ। ভাল থাকবেন।

 

ছবি সৌজন্য- সুনীল নায়েক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here