সুদীপ জোয়ারদার

স্কুল কবে খুলবে? প্রশ্নটা সহজ হলেও উত্তরটা মোটেই হাওয়ায় ভাসছে না। ফলে, ধরে নেওয়া যায় আরও কিছুদিন খুদে পড়ুয়াদের বন্দিজীবন বহাল থাকছে। এ অবস্থায় পরিবার তথা জাতির ভবিষ্যতদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বয়সে যারা একটু বড়, তারা হয়তো কিছুটা মানিয়ে নিতে পারে এই অবস্থার সঙ্গে। কিন্তু এই দীর্ঘ বন্দিজীবন প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থী-শিশুদের কাছে বেশ কষ্টের।

এমনিতে অনেক পরিবার এখনও কর্মসহায়িকার সাহায্য থেকে বঞ্চিত। সেখানে, একে তো করোনায় কী হবে তাই নিয়ে দুশ্চিন্তা, তার উপর বাবা-মা দুজনেই জেরবার ঘরের কাজ করতে গিয়ে। তাঁদের বিরক্তির গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী, নিজেদের মধ্যে ঝগড়া, অশান্তি কমবেশি লেগেই রয়েছে। এর উপর বাড়ির শিশুর চাঞ্চল্য, দুষ্টুমি সামলানো সহজ কথা নয়।

বাড়িতে শিশুদের সামলাতে এইসব পরিবারে এখন তাই তিনটিই প্রধান রাস্তা। ১) শাসন (যার মধ্যে প্রহার একটা বড় অংশ), ২) পড়াশোনায় শিশুকে ব্যস্ত রাখা, ৩) একালের শিশুর প্রধান চাহিদার কাছে নতি স্বীকার করে মোবাইলটা বাড়িয়ে দেওয়া অথবা টিভিতে দীর্ঘক্ষণ কার্টুন দেখতে অনুমতি দেওয়া। শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য এগুলো কোনওটাই যে ঠিক নয়, উপরন্তু যথেষ্ট ক্ষতিকারক তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বন্দিজীবনে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে চিকিৎসক বা মনোবিদেরা অনেক দাওয়াই দিচ্ছেন। সেগুলো তো রইলই, সঙ্গে আরও কিছু প্রস্তাব রইল। অভিভাবকেরা ভেবে দেখতে পারেন।

আমাদের ছেলেবেলায় যখন টিভি ছিল না, মোবাইল ছিল না, এমনকি অনেকবাড়িতে পাঁজি ছাড়া পড়ার বইয়ের বাইরে কোনও বইও থাকত না, তখন লাগাতার বর্ষাবাদলে গৃহবন্দি হয়ে আমরা বেশ কিছু মজার খেলায় মেতে থাকতাম। এই খেলাগুলো যেমন আনন্দদায়ক, তেমনই মানসিক স্বাস্থেরও অনুকূল।

এইসব খেলার একটা ছিল ‘দেখাদেখির খেলা।’ এটা শুরু হত এইভাবে, একজন  চারিদিক তাকিয়ে নিয়ে বলে উঠত, ‘আমি যা দেখি, তুই তা দেখিস? আমি দেখছি একটা প্রজাপতি।’ বলেই সে এক, দুই, তিন করে দশ পর্যন্ত গুনতে থাকত। সহ-খেলোয়াড়টি সঙ্গে সঙ্গে তাকাত আশপাশে। প্রজাপতিটি তাকে দেখাতে হবে প্রতিপক্ষের দশ গোনার মধ্যে। পেরে গেলে তার দান। আর না পারলে, এক পয়েন্টে পিছিয়ে আবার প্রতিপক্ষের চ্যালেঞ্জের সামনে।

এরকমই আর একটা খেলা ছিল, ‘আপ, ডাউন।’ এই খেলায় রাস্তার ধারের জানলায় বসত দুজন। রাস্তার একটা দিক আপ, আর একটা দিক ডাউন। দুজনের হাতেই থাকত কলম, আর কাগজ। ঘড়ি মিলিয়ে বসা হত। পনেরো মিনিট সময়। ওই সময়ে আপ থেকে কজন মানুষ এল, ডাউন থেকে কজন মানুষ এল, দুদিকের দুজন কাগজে লিখত এক, দুই করে। পনেরো মিনিট পরে আবার সাইড চেঞ্জ। আবার গোনা। এ বার হিসাবের পালা। যার সংখ্যা বেশি, স্বভাবতই সে বিজয়ী।

ছুটির দিনের আর একটি মজার খেলা ছিল, ’তুই কত, মুই কত।’ এখানে তৃতীয় একজন, দুই খেলোয়াড়েরই আড়ালে মার্বেল, পেনসিল, পুতুল, কাঁচি মিলিয়ে খান পনেরো জিনিস ফাঁকা মেঝেয় রাখত। এরপর  দুজনকে ডেকে মিনিটখানেক দেখতে দেওয়া হত জিনিসগুলো। দুজনের হাতেই দেওয়া হত কাগজ আর পেন। আলাদা আলাদা জায়গায় গিয়ে দুজনে লিখত সেগুলোর নাম। এই লেখার জন্যও সময় থাকত। সময় শেষ হতেই নিয়ে নেওয়া হত কাগজ। দেখা হত, কে কটা লিখতে পেরেছে।

তখনকার সাময়িক গৃহবন্দিত্বে অথবা ছুটির দিনে শিশুদের এই খেলাগুলো নিজেদের মতো করে আবার এখন চালু করাই যায়। পরিবারে দুটি শিশু না থাকলে বাবা অথবা মা যে কেউই হয়ে যেতে পারেন সহ খেলোয়াড়। বলা যায় না, এতে বাবা-মায়েরাও নিজেদের জন্য কিছুটা বাড়তি অক্সিজেন পেয়ে যেতে পারেন।

বাড়ির শিশুটিকে নিয়ে সবসময় এইসব খেলায় মেতে থাকা নিশ্চয়ই অসম্ভব। তার দরকারও নেই। অভিভাবকেরা যখন ব্যস্ত, তখন  শিশুদের নিয়োজিত করা যেতে পারে কিছু অন্যরকম কাজে। আজকাল বেশিরভাগ বাড়িতে (সে বাড়ি ফ্ল্যাট হলেও) টবে ফুলগাছ একটা সাধারণ দৃশ্য। ঘরের শিশুটিকে এ সময় একটি বা দুটি ফুলগাছে জল দেওয়ার কাজে নিয়োজিত করা যেতে পারে। এ ছাড়া মোবাইল যদি তাকে দিতেই হয়, দেওয়া যেতে পারে এই সময়টাতেই। তবে গেম খেলার জন্য নয়। ইউটিউব দেখে কাগজের ফুল, পাখা, নৌকো কী ভাবে তৈরি করা হচ্ছে তা শেখা এবং প্রয়োগের জন্য। একটা কাঁচি, কিছু রঙিন কাগজ দিয়ে দিলে সে কিন্তু খুশিমনেই এ কাজ করবে। কেননা, কাঁচি দিয়ে কাগজ কাটতে প্রায় সব শিশুই ভালোবাসে।

আঁকার কাজ শিশুরা করেই থাকে। এই সুযোগে তাকে লাগিয়ে দেওয়া যেতে পারে নতুন কোনও দৃশ্য বা ফলফলারি আঁকার কাজে। নিয়মের বাইরে যে কোনও জিনিসেই শিশুর উৎসাহ রয়েছে। এ রকম আঁকার কাজ দিলে হয়তো সে খুশি মনেই সেটা করবে।

মাঠ নেই, ছাদ তো আছে। বিকেলের দিকে ছাদের উপর শিশুকে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। মাটি না  পাক, আকাশ দেখলেও কিন্তু মন ভাল হয়ে যায়। সরে যায় মনের মেঘ। রাতে ওই ছাদেই বাড়ির খুদেটির জন্য পরিবারের সবাইকে নিয়ে, গুগলকে সঙ্গী করে বসানো যেতে পারে আকাশ চেনার আসর।

পরিবারের বাইরে শিশুর পছন্দের জন কে তা বাবা-মায়ের অজানা নয়। মোবাইলে সেই পছন্দের জনটিকে ধরে মাঝে মাঝে কথা বলার সুযোগ করে দিলে শিশুরা খুশি হবে। এছাড়া কার্টুনের নেশা কাটাতে ছোটদের উপযোগী কোনও সিনেমা ইউটিউব থেকে দেখানো যেতে পারে। শোনানো যেতে পারে ভাল গল্পও।

স্কুলে বন্ধুদের সঙ্গে টিফিনে হুল্লোড়, বিকেলে সবুজ মাঠে খেলার সাথীদের সঙ্গে কলরব, কিংবা মা-বাবার সঙ্গে শপিংয়ে বেরিয়ে পছন্দের আইসক্রিম খাওয়া, কোনওটারই হয়ত বিকল্প হয় না। তবু শিশুকে ভাল রাখতে হবে যে কোনও উপায়ে। চেষ্টা করতেই হবে নানাভাবে, যাতে এই বন্দিজীবন তার কাছে দুর্বিষহ না হয়ে ওঠে।

(ফিচার ছবিটি গুগল থেকে নেওয়া)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here