বিপ্লব বিশ্বাস

সামান্য কদিনের ব্যবধানে প্রয়াত হলেন দুই সারস্বতসমাজ-স্বীকৃত কবি, গদ্যকার- সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত। অভিনেতা হিসাবে সৌমিত্রর যে বৈশ্বিক পরিচিতি তা আমি আর উল্লেখ নাই বা করলাম!

যাই হোক, পরিপক্ক প্রাজ্ঞতাকে সঙ্গী করে কারও পার্থিব শরীরের স্বাভাবিক বিলয় নিয়ে আমার ব্যক্তিক কোনও বিলপমান আধিক্যেতা নেই। তাই এই বয়সে সৃজনশীল কেউ চলে গেলে ‘সাহিত্য-সংস্কৃতি’ জগতের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল, আমি তা মনে করি না। বরং সেই ভূয়োদর্শী মানবসন্তান যা কিছু আমাদের দিয়ে গেলেন, নিরন্তর চর্চায় সে সব বাঁচিয়ে রাখাই উত্তর-প্রজন্মের দায় ও দায়িত্ব। কেননা, ‘মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব / থেকে যায় ;/ অতীতের থেকে উঠে আজকের মানুষের কাছে / আরো ভালো… আরো স্থির দিকনির্ণয়ের মতো চেতনার / পরিমাপে নিয়ন্ত্রিত কাজ / কতদূর অগ্রসর হয়ে গেল জেনে নিতে আসে। ‘ তাই পলাতকা ঢেউয়ের পিছনে না ছুটে সেই সব মানবের বিস্তৃত কর্মপরিধি খানিক খুঁড়ে দেখাটাই আমাদের আশু চর্চার বিষয় হয়ে উঠুক।

এই ইতিভাবনা থেকেই আমি ঢুকে পড়ি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর একটি জাদুগল্পের শরীরে যার পরতে পরতে চারিয়ে আছে পিছলে যাওয়া কাব্য-ভাষ তথা তাঁর ভালোবাসার শেকড়ের মাটি যাকে তিনি বলছেন ‘শিল্পীর হৃদয়, যার অন্য নাম ভারতবর্ষ।’

আত্মগতভাবেই আমার নির্বাচন খানিক বেয়াড়া গোছের, একটু বিপথু হতেই ভালোবাসি; তাই কবিকে না বেছে আমি বেছেছি তাঁর একটি গল্প যার শিরোনাম ‘শেখভ এবং সেই ভারতীয় মেয়েটি’। হঠাৎই খুঁজতে খুঁজতে গল্পটি পেয়ে গেলাম সুব্রত রুদ্র সম্পাদিত ‘কবির গল্প’ বইটিতে যা আহৃত হয়েছে অলোকরঞ্জনের ‘ছয় ঋতু ছয়লাপ’ থেকে।

ছোট্ট গল্পটির অন্দরে প্রবেশের আগে অলোকরঞ্জন সম্পর্কে সামান্য ‘মুখবন্ধ’ রাখি যা সুরসিক তপন রায়চৌধুরীর মতে শুরুতে নয়, শেষে থাকা উচিত। যাই হোক, প্রথমেই বলে রাখি, আমার ‘অলোক-পাঠ’ সেভাবে নেই বললেই চলে; তার মূল কারণ অবশ্যই কাব্যলোকে বিচরণের আমার সহজাত অনীহা তথা অক্ষমতা। তবুও এই মানুষটিকে বিশেষভাবে পছন্দ করি দীর্ঘ বিদেশ-বাস সত্ত্বেও তাঁর বাঙালিয়ানা বা বাঙালিপনায় জারিত থাকার কারণে। আর একটি আকর্ষণজনিত কারণ হল, তাঁর মুখভাষের মুন্সিয়ানা। এমন সুন্দর কথন-ভঙ্গিমা খুব বেশি বক্তার থাকে না- এমন সুভদ্র, সুললিত, সুশান্ততা।

আবার এই মানুষটিই ছাত্রাবস্থায় তারুণ্যের প্রাখর্যে জীবনানন্দের কবিতাকে ‘নির্বস্তুক’ বলে আক্ষরিক অর্থে ফেঁসে গিয়েছিলেন; তাই অগ্রজের নির্দেশে তাঁকে লিখতে হয়েছিল সেই প্রমাথী দীপ্তিমান কবিকে নিয়েই যার প্রভবিষ্ণু ফলস্বরূপ আমরা পেয়েছিলাম এক সুবেদী কথা-সমাহার ‘জীবনানন্দ’। অলোকরঞ্জনের প্রাগলভ্য শাব্দিক রূপাঞ্জনে লাভ করেছিল এক সুসন্নদ্ধ প্রাতিস্বিকতা। এমন সৌমনস্য সম্পর্কের আজ বড্ড অভাব। যাই হোক, তিনি যে এক শাশ্বত গ্রন্থ লিখে ফেললেন, পরবর্তী সময়ে লিখলেন আরও আরও অনেক-বিপুল সে সম্ভার! এই ক্ষমতাকেই সম্ভবত কমলকুমার মজুমদার বলেছিলেন, ‘জন্মান্ধ শক্তি’ অর্থাৎ জন্মাবধি সৃজন-ক্ষমতা। তাঁর প্রয়াণ-খবর চাউর হওয়ার পর থেকে ‘যৌবন বাউল ‘ ছেয়ে গেছে ফেসবুকে, সঙ্গে আরও কত শরীরী সাহচর্যের ছবিটবি। ইদানীং এই উৎকট সংস্কৃতি (!) আমাদের অর্জন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার তো সে সব নেই তাই এই সামান্য ছেঁড়াখোঁড়া করে তাঁকেই নিবেদন করি এভাবে।

এবারে গল্পকথা। শিল্পী শেখভ ( ধরে নিই তিনি ‘ দ্য চেরি অর্চার্ড ‘ খ্যাত রুশ লেখক আন্তন শেখভ) বেরিয়েছেন সিঙ্গাপুরের টানে। না, ঠিক সিঙ্গাপুরের বিলাসবহুল আকর্ষণে নয়। তিনি জানতেন, তাঁর প্রাচ্য সফরের শেষ মুহূর্তে প্রেমে পড়বেন এক ‘কৃষ্ণচক্ষু ভারতীয় তরুণীর’। সেই ‘হঠাৎ-ঘটনা’ নিয়েই এই কাব্যময় গল্পের বুনন। তিনি এটাও জানতেন সেই ভালোবাসার গল্প তিনি তাঁর নাতি-নাতনিদের শোনাতে পারবেন। তিনি যে শব্দসুষমায় ব্যক্ত করবেন গল্পকারের বয়ানে তা: ‘ আমি জানতাম এক জ্যোৎস্না রাত্রে সমুদ্রসৈকতে নারকেল বীথিকায় আমি একটি ভারতীয় নারীর ভালোবাসা পাব। এমন ভালোবাসা যা আমাকে কোনোদিন কোনো ওলগা দিতে পারেনি আর তার  টান এত তীব্র যে সে আর আমি দুই দিকে নিশ্চিহ্ন ভেসে গিয়েছি।’

রুশ শেখভের সঙ্গে আছে এক দোভাষী, নাম পেরেরা। সে পর্তুগিজ হতে পারে আবার গোয়ানিজও। মজার ব্যাপার হল, এই দোভাষী নিয়ত গোপন-ভাষ্যে অস্থির করে তুলেছে শেখভকে। সে কথা পরে। একদিন এই পেরেরাকে নিয়ে শেখভ পৌঁছে গেল ‘ভারতবর্ষ থেকে ঈষৎ দূরে, অথচ ভারতবর্ষের স্পন্দমান হৃদয়ের কাছে।’ অতলান্ত সমুদ্র যার নামহীন গভীরতা সেই ভারতবর্ষের সৈকতে তিনি এসে দাঁড়ালেন। তিনি অস্থির হচ্ছেন কেননা ঠিক পঁয়তাল্লিশ মিনিট বাদে তার ভালোবাসার সমস্ত শক্তি ফুরিয়ে যাবে। তিনি আকুল প্রার্থনায় মগ্ন হয়ে ভারতবর্ষ-রূপিণী আশ্চর্য রমণীর সঙ্গে মিলতে চাইছেন যার ভালোবাসায় তাঁর সমস্ত অসম্পূর্ণতা ঝরে যাবে, যে তাঁর শূন্য জীবন-মরুভূমির মধ্যে এসে দাঁড়াবে ‘কর্পূর মঞ্জরীর মতো, যার স্তন চন্দনে নির্মিত, যার স্পর্শে আমি (শেখভ), আমার মানুষ আর আমার শিল্পী চিরদিনের মতো এক হয়ে যাবে।’

এই প্রার্থনা উচ্চারিত হবার সঙ্গে সঙ্গে ‘সম্ভাবনাহীন শূন্য থেকে নিষ্ক্রান্ত হল একটি নারী’ যে জানে না, একজন শিল্পীকে ভালোবাসার মতো চরম দুঃখ স্বীকার করতে হবে তাকে। তবুও সে ভালোবাসবার ধারণা থেকে এগিয়েছে ভালোবাসার দিকে; ভালোবাসা যে চকিত ব্যবহারে ফুরিয়ে যাবার নয় তা প্রমাণ করতে গিয়ে সে দেখল ‘তার চিবুকের কিনারে লেগে আছে কিছু প্রাক্তন প্রবঞ্চনার স্মৃতি।’ সে তক্ষুনি সমস্ত সংস্কার ঝেড়ে ফেলে তার শরীর নিয়ে দাঁড়াল, ‘যেন বিদেশি প্রেমিক এই মারাত্মক ভুল না করে বসেন যে ভারতবর্ষ মানেই শরীরহীনতা।’

এরপর স্বযাচিত প্রেমিকা আর সমর্পিত শেখভের ‘ঠিক মাঝখানে’ এসে দাঁড়াল দোভাষী পেরেরা। প্রৌঢ় শেখভের হাতে লাঠিটা সমুদ্রে ছুড়ে দিয়ে সে জোর হেসে বলল, ‘ওটা থাকলে কিন্তু কোনো মেয়ে আপনাকে পছন্দ করবে না।’

ভীত শেখভ, জীবনের কাছে বারবার হেরে যাওয়া সর্বজয়ী শেখভ, রাজরোগ যক্ষ্মা-আক্রান্ত শেখভ দোভাষীর কথা মেনে নিয়ে তাঁর চশমাটিও ছুড়ে ফেললেন অনিঃশেষ চরাচরে, মুখাবয়ব বিলিয়ে দিলেন সান্ধ্য নক্ষত্রের কাছে। রয়ে গেলেন শুধু শিকড় হিসেবে-অসহায়,  প্রেম-সন্ধানী যেন ‘শিকড় হতে না পারলে সমস্ত ভালোবাসায় ঘুণ ধরে যায়।’

এরপর মেয়েটি শেখভের সামনে তার ‘ শরীর ভরা ভারতবর্ষ’ মেলে দিয়ে জানতে চাইল সে আর কী চায়। দোভাষী ভিন্ন ব্যাখ্যায় শেখভকে বোঝাল যে মেয়েটি বলছে সেই রাত্রে কখন কোথায় তাঁর সঙ্গে দেখা হতে পারে। শেখভ বলল, সময় নেই। তাকে ফিরতে হবে আর ‘ফেরার অন্য নাম মৃত্যু’। এবারেও দোভাষীর ভুল ব্যাখ্যা। কথা ওঠে শারীরিক স্পর্শ-পরবর্তী ভালোবাসার কথা। মেয়েটির আনত চোখের পাতা থেকে যেন শিকড়ের জন্ম হল। সে যেন ইচ্ছে করলেই বেদনা থেকে আত্মার জন্ম দিতে পারে। তেমনই দাপট নিয়ে সে বলল: ‘আমি ওঁর কোনো কথা শুনতে চাইনে, আমি ওঁকে আজ ভালোবাসতে এসেছি।’

এ কথা শুনে দোভাষী আচমকা তটভূমিতে নাচতে লাগল। তার মুখচোখ থেকে বেরিয়ে এল লোভ-লাভা। যেন সত্যের যাথাযথ্য মালুম হয়েছে তার। অবাক-অস্থির শেখভ আর্তস্বরে জানতে চায় ‘ওই মেয়েটি আমাকে কী বলল?’ দোভাষী জানতে চাইল, ‘ ভয়ে বলব, না, নির্ভয়ে বলব।’ শেখভের মধ্যে অস্থিরতার সঙ্গে যুক্ত হল ভালোবাসা বিষয়ক সংশয়। দোভাষী তার মেদজর্জর শরীর দিয়ে ‘প্রজাপতির মতো জ্যোতির্ময়ী সেই শরীরিণীকে আড়াল করে ‘শেখভের কাছ থেকে স্পষ্টতার দাবি জানালে শেখভ আরক্ত মুখময় ঘৃণা ছড়িয়ে বললেন, ‘আমি এটাই বোঝাতে চাচ্ছি যে ভালোবাসার কোনো প্রতিশব্দ নেই, আর ভালোবাসার আয়তন যতই শীর্ণ হোক সে পার হয়ে যায় সকল পরিসর।’

দোভাষী আবার ‘একগাল আত্মতৃপ্তি কুলকুচো করে’ মেয়েটিকে বুঝিয়ে দিল, সময়ের স্বল্পতায় শেখভ তাড়াতাড়ি হিসেব সেরে নিতে চাইছেন। মেয়েটি দ্বিধান্বিত, সন্দিহান-কেউ কি তাকে ঠকিয়েছে! সে ভাবছে : ‘কে যেন তাকে ভারতবর্ষের নাম করে ডেকে এনে বিক্রি করে দিয়েছে দেহময় দ্বীপে যেখানে শরীর নেই।’ অথচ পেরেরা আর তার বন্ধুর কথায় সে এতদূর এসেছে, প্রতিদানময় ভালোবাসা পাবে বলে। মেয়েটি এবার তার ভারতবর্ষীয় শরীরকে সুসজ্জিত করে এক হতভম্ব পিশাচীর মতো দাঁড়ালে শেখভের দুই চোখ ভরে এল আত্মনিবেদনের কালো মেঘ। সে অনুভব করল মেয়েটির দুটি চোখে মিশে গেছে তাঁর চোখ, এখন তাঁর ব্যাধিই যেন তাঁর আরোগ্য। এই শুভক্ষণে মেয়েটির পায়ে মুখ থুবড়ে পড়ে মৃত্যু হলে তিনি অনন্তকাল ‘সূর্যের বাসিন্দা হতে পাবেন।’

তিনি শেষবারের মতো দোভাষীর কাছে জানতে চাইলেন, মেয়েটি কি তাকে ভালোবাসে? ‘ও আপনাকে দারুণ ভালোবাসে’ – এ কথা বলেই সে মেয়েটির শরীর তার ‘পোর্টেবল বাহুমূলে’ আড়পে নিয়ে যখন উধাও হতে লাগল, শেখভের মনে হল, গোটা বিশ্ব ভালোবাসা আর জ্যোৎস্নায় ভরে গেছে। তৃপ্ত হয়েছে ভারতবর্ষকে ভালোবাসার অতৃপ্ত, অনন্ত ক্ষুধা।

গল্প শেষ হয়। পাঠক নিক্ষিপ্ত হয় এক অনিষ্পাদিত ঘোরের মধ্যে যেখান থেকে মুক্ত হলে তার বোধোদয় ঘটে যে, এ আখ্যান কুসুম্ভরাগক্লিষ্ট নয়, এ যথার্থই মঞ্জিষ্ঠারাগ-রঞ্জিত।

(বিপ্লব বিশ্বাস গল্পকার, অনুবাদক ও প্রাবন্ধিক) 

(ফিচার ছবিটি গুগল থেকে নেওয়া)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here