তানিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় পাল

করোনায় ত্রস্ত তামাম বিশ্ব। ঘরবন্দি থেকেই এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কৌশল নিয়েছে বিভিন্ন দেশ। সেই তালিকায় রয়েছে ভারতও। মার্চের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে কেন্দ্রীয় সরকার দেশ জুড়ে লকডাউনের সিদ্ধান্ত নেয়। মে মাস পর্যন্ত চলে লকডাউন। তারপরে ধীরে ধীরে আনলক প্রক্রিয়া শুরু হয়। বাইরের ভাইরাসকে কাবু করার কৌশল রয়েছে। কিন্তু ঘরের ভিতরের যে ‘ভাইরাস’ জাঁকিয়ে বসেছে, তাকে রুখবে কীভাবে? লকডাউনের প্রথম ৬৮ দিনে ভারতে পারিবারিক হিংসার ঘটনা মারাত্মক ভাবে বেড়েছে। যার ভয়াবহতা কিন্তু করোনা‌ ভাইরাসের থেকে কম নয়।

পরিসংখ‍্যান জানাচ্ছে, মার্চ থেকে মে, এই কয়েক মাসে শুধু মহারাষ্ট্রে ৪০০০ পারিবারিক হিংসার অভিযোগ পুলিশের কাছে দায়ের হয়েছে। যদিও তালিকায় এর উপরে রয়েছে তামিলনাড়ু। লকডাউনের সময় সবচেয়ে বেশি পারিবারিক হিংসার অভিযোগ উঠেছে তামিলনাড়ুতে। বাদ নেই পশ্চিমবঙ্গ। এ রাজ‍্যেও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পারিবারিক হিংসার ঘটনা।

এক বেসরকারি সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, লকডাউনের ৬৮ দিনে ভারতের ৮৮ শতাংশ মহিলা পারিবারিক হিংসার শিকার হয়েছেন। যার মধ‍্যে বেশিরভাগ মহিলাই কোনও অভিযোগ দায়ের করার সুযোগ পাননি। এ দেশে পারিবারিক হিংসা নতুন কোনও সামাজিক সমস্যা নয়। গত কয়েক বছর ধরে এ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধ পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। নাগরিক সমাজ সে নিয়ে বারবার সরব হয়েছে। আইন কঠোর করা হয়েছে। তারপরেও বাস্তবের পরিস্থিতি বেশ কঠিন। হায়দরাবাদ থেকে কলকাতা, ঘরে-বাইরে মহিলাদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কিন্তু করোনা কালে যে হারে পারিবারিক হিংসার ঘটনা বেড়েছে, তা নিয়ে চিন্তিত সব মহল।

পারিবারিক হিংসা রুখতে এ দেশে একাধিক আইন রয়েছে। তারপরেও অনেকক্ষেত্রে মহিলারা আইনি সুবিধা পান না। আইনের দরজা পর্যন্ত পৌঁছতে পারেন না। তার সবচেয়ে বড় কারণ হল, এ দেশের মহিলাদের বড় অংশ আইনি সুবিধা সম্পর্কে সচেতন নন। তাছাড়া এ দেশের আইনি ব‍্যবস্থা যথেষ্ট জটিল। সেই সুবিধা ভোগ করার মতো প্রয়োজনীয় শিক্ষা থেকেও তাঁরা বঞ্চিত হন।

লকডাউনে অফিস, কলকারখানা সব বন্ধ। এমনকি রাস্তা কিংবা পাড়ার মোড়েও যথেচ্ছ ভাবে ঘুরে বেড়ানোয় সরকারি নিয়ন্ত্রণ ছিল। ফলে, বাড়িতে থাকতে এক প্রকার অনেকে বাধ‍্য হয়েছেন। বাড়িতে বেশি সময় কাটানোর ফলে হিংসার সুযোগ বেড়ে গিয়েছে।

মনোরোগ চিকিৎসকদের একাংশ মনে করছেন, একদিকে কর্ম নিরাপত্তার অভাব, অন‍্যদিকে দীর্ঘ সময় বাড়িতে থাকায় বিরক্তি, এই সব কিছুর বিকৃত বহিঃপ্রকাশ হল হিংসা। বাইরের বিরক্তি বাড়িতে প্রকাশ এ তো সাদামাটা ঘটনা হিসাবে দেখা হয়। কিন্তু এরমধ‍্যেই লুকিয়ে থাকে হিংসার বীজ। বাড়ির সদস‍্যেরা বাইরের সমস‍্যা সম্পর্কে জানেন না। তাঁদের সঙ্গে সেই সমস‍্যা ভাগ করে নেওয়া যায়। কিন্তু যখন সেই সমস‍্যা না জানার জন‍্য, তাঁদের সঙ্গে তাচ্ছিল‍্যের ব‍্যবহার করা হয়, সেখান থেকেই শুরু হয় সফট টার্গেট হিসাবে গ্রাহ‍্য করার প্রবণতা। তাছাড়া এদেশে হিংসা বলতে শারীরিক হিংসার কথা বোঝায়। মারধর করাকেই নির্যাতন করা হিসাবে মনে করা হয়। কিন্তু মহিলাদের বিরুদ্ধে পারিবারিক হিংসা সম্পর্কে কথা বললে মানসিক নির্যাতনকে বাদ দেওয়া যায় না। অধিকাংশ সময় কিন্তু কত শতাংশ মহিলা মানসিক নির্যাতনের শিকার হন, তার সঠিক তথ‍্য পাওয়া যায় না। কারণ, অধিকাংশ জায়গায় তাঁরা অভিযোগ দায়ের করেন না।

ইনস্টিটিউট অব সাইক্রিয়াটির চিকিৎসক সুজিত সরখেলের কথায়, “আসলে অন‍্যের উপর হিংসার মাধ‍্যমে নিজের বিরক্তি প্রকাশ এক ধরনের মানসিক সমস‍্যা। অনেকেই বাড়ির মহিলাদের সফট টার্গেট মনে করেন। অন‍্য কোথাও সমস্যা হচ্ছে। সে অধিক ক্ষমতাবান। তাঁকে কিছু বলার সাধ‍্য নেই। তাই টার্গেট হন বাড়ির মহিলারা। তাঁদের উপর যাবতীয় রাগ উগড়ে দেওয়া হয়। নির্যাতনের মাধ‍্যমে নিজের সেই রাগের বহিঃপ্রকাশ করা হয়। লকডাউনের সময় পারিবারিক হিংসা বৃদ্ধির এটা বড় কারণ।”

লকডাউনে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো নিয়ে অনেক রঙ্গ-রসিকতা হয়েছে। এমনকি সোশ‍্যাল মিডিয়া জুরে বৌয়ের সঙ্গে দিনভর সময় কাটানো যে কতখানি দুষ্কর, সে নিয়েও মশকরা অসংখ‍্য। কিন্তু বাস্তবের ছবি বেশ আলাদা। রসিকতার মোড়কে সামাজিক সমস‍্যা এবং লিঙ্গ বৈষম্যকে আড়াল করা পুরনো রোগ। এর থেকেও মুক্তির ভ‍্যাকসিন খুঁজে পাওয়া জরুরি।

(ফিচার ছবিটি গুগল থেকে নেওয়া)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here