সোহম চক্রবর্তী

‘সবটাই লিখে ফেলা ঠিক হবে না

তাহলেই তো শুধু উপসংহার বাকি রইল

কুটকুটে ভোটকম্বলের আসন হাতে

কাছা গলায় দিয়ে মৃত্যু এসে দাঁড়াবে

অত চুপচাপ হয়ে যাওয়াটা

এখনই লিখতে চাই না…’

(যা বাকি রইল/ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়)

টুকরো আনন্দে মুখর এহেন জীবনকে পরিপূর্ণ পান করে যাওয়ার বীক্ষায় সমুন্নত আলোকস্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। আমরা তাঁর মুগ্ধ দর্শক, একাগ্র শ্রোতা, একনিষ্ঠ পাঠক তথা একান্ত অনুরাগীরা কখনই ভাবতে পারিনি তাঁর ‘অত চুপচাপ’ হয়ে যাওয়া, স্তব্ধ হিম উপসংহারে পৌঁছে যাওয়ার রিক্ত এই দিন। আমরা চেয়েছি তাঁকে যেন কখনই এ কবিতার ‘সবটাই’ লিখে ফেলতে না হয়, চিরতারুণ্যের জ্বলজ্বল হাস্যময় মুখে তিনি যেন চিরকাল বলে চলেন জীবনবিমুখ না হওয়ার সেই পরিচিত প্রিয় ডায়লগ, রবীন্দ্রনাথের প্রজ্ঞাবান আলো আর জীবনানন্দের স্নিগ্ধ আঁধার কণ্ঠে নিয়ে তিনি যেন চিরকাল গেয়ে যান জীবনের উদ্ভাসিত আনন্দময় বন্দন, উইংসের আড়াল থেকে তিনি যেন মৃত হীন সমকালের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলতে পারেন –

‘…সবটা লিখে ফেলার আগে

কচিকাঁচারা রথ টানছে কাগজের নিশান নাড়ছে

আমি তাদের মধ্যে

সন্ত্রাসকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে

একটু হৈচৈ ক’রে নিই…’

(যা বাকি রইল/ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়)

অথচ আমরা যাকে আবহমান বলি, কখনও কখনও সেও বুঝি অপারগ ক্লান্তির বশে মুখ থুবড়ে পড়ে। হয়তো চলে যাওয়া ঘিরে তারও কিছু করার ছিল না। আমি নিশ্চিত, এই সমনে সই করতে বসে তোমারও হাত কেঁপেছে, মহাকাল! কিন্তু হে মৃত্যু– চিরায়ত, ‘শ্যামসমান’, আমাদের এ শোক ‘দু-দিন বই তো নয়’। অমরত্ব শুরু হল সবে। ‘কবচকুণ্ডল ঝর্না কলম থেকে একটা আরকাইভের জন্ম’ হওয়ার (আরকাইভে/ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) বোধদীপ্ত প্রাজ্ঞ মানুষটা রয়ে গেলেন ভিতর ভিতর – অজর, অক্ষয় – চিরহরিৎ। ‘হে পূর্ণ তব চরণের কাছে যাহা কিছু সব আছে আছে আছে’। ‘নাহি ক্ষয়, নাহি শেষ, নাহি নাহি দৈন্যলেশ’। হাউজফুল প্রেক্ষাগৃহের দিকে হাত নাড়তে নাড়তে হাসিমুখ চলে যাওয়াটুকু সিন চেঞ্জের যবনিকামাত্র। নিত্যধারা প্রাণের নাটক এখনও অনেকদূর বাকি। এখনও বাকি বুঝিয়ে দেওয়া শরীরী জীবনের ঊর্ধ্বে উঠে শিল্পীজন্মের চিরন্তনী জয় – ইটার্নিটি অফ্ আর্ট – হে মহাকাল, দেখতে থাকো তুমি…

আসলে আমাদের কাছে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তো নেহাতই একজন অভিনেতা, নট, নাট্যকার, কবি, প্রাবন্ধিক, বাচিকশিল্পী, চিত্রশিল্পী কিংবা পত্রিকা সম্পাদক নন; আবেগ, মেধা, প্রজ্ঞা ও মননের বহুমুখী, বহুমাত্রিক মিশেলে নির্মিত একজন পুরোধা আইকন; অতীতে জ্বাজল্যমান অথচ বর্তমানে আত্মবিস্মৃত, ক্ষয়িষ্ণু, ভঙ্গুর, চর্চাহীন, লঘুভার, স্মার্টফোন হাতে শপিংমলমুখী উত্তর-আধুনিকতার ক্রীতদাস একটি জাতির শেষতম আন্তর্জাতিক আইকনদের মধ্যে অন্যতম – যিনি বাঙালির ‘মাস’ ও ‘ক্লাস’-কে স্পন্দিত করতে পেরেছিলেন সমান অনুরণনে। শিকড় হারানো বাঙালির কালেক্টিভ নস্টালজিয়ায় আজন্মকাল যে ‘স্বর্ণযুগের’ স্মৃতি ফিরে ফিরে আসে, প্রকৃত অর্থেই সেই সোনার সময়ের আরও একটি দেউটি নিভিয়ে চলে গেলেন সৌমিত্র। চলে গেলেন সেই সময়, যখন তাঁর থেকে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল সম্ভবত সবচেয়ে বেশি। কারণ তিনি আবহমান হয়েও মূলগত নিরিখে যে কালখণ্ডের প্রতিনিধিস্বরূপ, সেই ‘স্বর্ণযুগেই’ বোধহয় স্বাধীনতা-উত্তর পশ্চিমবঙ্গীয় বাঙালিমানস চর্চা, চর্যা, মেধা, তর্ক ও জ্ঞানে একসাথে সর্বক্ষেত্রেই ছুঁয়ে এসেছিল গৌরবের উচ্চতম শিখরবিন্দু – চিন্তনে এলিট আন্তর্জাতিকতা আর যাপন তথা কর্মকাণ্ডে বহমান বাঙালিয়ানার এমন যুগ্ম উদ্ভাস পরবর্তী বাঙালিসমাজের ক্রম-অবক্ষয়ী ইতিহাসে নিঃসন্দেহে বিরল ও উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। আজকের ‘বাংলাটা ঠিক না-আসা’ ‘রুটলেস’ বাঙালির সামনে হৃত ঐতিহ্যের মূর্ত রূপক হয়ে কে-ই বা দাঁড়াতে পারতেন আর তেমনভাবে, সৌমিত্র ছাড়া?

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মধ্যে আমরা আসলে ফিরে ফিরে দেখেছি নিজেকেই। ফেলুদার মগজাস্ত্র শান দিয়েছে কিশোরের কল্পনাতুর ঔৎসুক্যে, তরুণের রুদ্ধবাক বিবেক হয়ে কথা বলেছে উদয়ন পণ্ডিত। ‘কে তুমি নন্দিনী’-র তরুণী তনুজায় ফিরে গেছে বিহ্বল বিগতযৌবনা, ‘তুমি তো বলোনি মন্দ, তবু কেন প্রতিবন্ধ’ – অমোঘ এ জিজ্ঞাসা হু হু ক’রে উঠেছে বিরহী যুবকের বুকে। ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’-র কাছে বন্ধুতার পাঠ নিয়েছে টগবগে কলেজপড়ুয়া – ‘চারুলতা’-য় শিখেছে প্রেম, ‘অপুর সংসার’-এ স্নেহ, ‘ঘরে বাইরে’-তে ক্ষোভ, ‘কোনি’-তে সংগ্রাম। তাঁর কবিতায়, নাটকে, উচ্চারণে আমরা আসলে খুঁজে নিয়েছি আমাদেরই অস্ফুট, অব্যক্ত স্বর – বলতে-না-পারা কথা। আমাদের চোখ হয়ে, কণ্ঠ হয়ে, মন হয়ে, মগজ হয়ে সদাসর্বদা জেগে থেকেছেন ‘আমাদের’ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। আপামর বাঙালিসমাজ এ ভাবে একসাথে, এক কলস্বরে, এক নির্জনতায় শেষ কার জন্য উঠে দাঁড়িয়েছে, কার অসুখে এতদিন ধরে আরোগ্যকামনা করেছে নিরন্তর, কার মৃত্যুতে সমস্ত ভেদাভেদ জলাঞ্জলি দিয়ে কেঁদেছে আকুল – মনে করা সত্যি দুষ্কর। ওহে অসুখ, ওহে প্রজ্বলিত চিতা – দ্যাখো, যাঁকে তুমি কেড়ে নিতে চাও, তিনি যে আগুন – একটি জাতির আশিরনখ জ্বলে থাকা ‘অপরাজিত’ যজ্ঞশিখা; সে বহ্নিকে পোড়াতে পারে, এমন কোনও আগুন তোমার নেই!

‘…মোহরগুলো গালিয়ে

আকাশে ছড়িয়ে দিয়েছিলে যেদিন

আমার তৃষ্ণা তা আকণ্ঠ পান করেও

আশ মেটেনি

সেই আগুন আজ ছড়িয়ে আছে

তোমার স্তব্ধতার মধ্যে

তোমার স্তব্ধতার মধ্যে দিয়েই এখন আমার যাওয়া’

(তোমার স্তব্ধতার মধ্যে/ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়)

(ফিচার ছবিটি গুগল থেকে নেওয়া)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here