প্রসূন আচার্য

আজমের শরীফের খাজা মঈনুদ্দিন চিস্তির দরগার কথা আমরা জানি। মুঘল আমলের আগেই সুন্নি সম্প্রদায়ের ধর্ম প্রচারক মঈনুদ্দিন খোদ পারস্য থেকে ভারতে এসেছিলেন। মৃত্যুর পরে আজমের শরীফে তাঁকে দফন করা হয়। পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মালয়েশিয়ার মত মুসলিম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা ভারতে এলে একবার আজমের শরীফে চাদর আর ফুল চড়িয়ে যান। মুঘল আমলের সুফি সেলিম চিস্তির সুবিখ্যাত দরগা ফতেপুর সিক্রিতে। মুঘল আমলের শিল্প কারুকার্যে ঐতিহ্যমণ্ডিত। সেলিম চিস্তি ছিলেন মঈনুদ্দিন চিস্তির শিষ্য। মারা যান ১৫৭২ সালে। আর আকবর তাঁর সুবিখ্যাত সমাধি তৈরি করেন ১৫৮০-৮১ সালে।

শিবসাগরের এই আজান পীরের দরগা কিন্তু অসমের বাইরে এতটা বিখ্যাত নয়। কিন্তু তামাম অহম বা অসমবাসীর কাছে, বিশেষ করে যাঁরা উজনি অসমে বাস করেন, তাঁদের কাছে শুধুই এক ধর্মীয় হেরিটেজ স্থান নয়, আরও বেশি কিছু। বছরের পর বছর এই অঞ্চলের মানুষের কাছে হিন্দু মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের বন্ধুত্বের, মধুর সম্পর্কের প্রতীক। দুই সম্প্রদায়ের কাছেই পবিত্র স্থান। উভয়েরই পুজো দেয় এখানে।

কে এই আজান পীর? ১৭০০ শতাব্দীতে আজান ফকির, যাঁর আসল নাম হজরত শাহ মিরান খোদ ইরাকের রাজধানী বাগদাদ থেকে জাহাজে পাড়ি দিয়ে ভারতে আসেন। মূল উদ্দেশ্য ছিল ধর্ম প্রচার। দেশ-দেশান্তর ঘুরে শেষে আশ্রয় নিয়েছিলেন অহম রাজা চাও লুং সুখাফার গড়ে তোলা রাজত্বে। রাজধানী সরাইদেও এর নিকটবর্তী শিবসাগরে ব্রহ্মপুত্র-তীরে গড়ে তুলেছিলেন তাঁর উপাসনা কেন্দ্র বা দরবার। সম্ভাব্য সময় ১৬৩০। দেশে তখনও মুঘল শাসন। অসমে তার আগে থেকেই মুসলমানরা থাকতো। যদিও মুঘলরা কোনও দিন ব্রহ্মাপুত্র পেরিয়ে অসম দখল করতে পারেনি। একাধিক যুদ্ধে পরাজিত হয়েছে। ফলে মুঘল ধর্মীয় সাংস্কৃতির কোনও প্রভাব অসমে পড়েনি। ইংরেজরা আসার পরে কিছু ব্রিটিশ প্রভাব পড়ে।

অসমের মুসলমানরা নিরাকার নবীর উপাসনা করলেও আজান দিতে জানত না। কোরান ও হাদিস সম্পর্কেও তাঁদের সম্যক জ্ঞান ছিল না। কিন্তু শাহ মিরান বাগদাদি এসে তাঁদের কাছে কোরান ও হাদিসের ব্যাখ্যা দেন। সেই সঙ্গে আরবি ভাষায় আজান দিতে শেখান। সেই কারণেই তাঁর নাম হয় আজান পীর।

শাহ মিরান একাই বাগদাদ থেকে আসেননি। সঙ্গে ছিলেন তাঁর ভাই শাহ নবীও। দুই ভাই শুধু সুফি সাধকই ছিলেন না, ভাল গানও গাইতেন। উচ্চবংশের এক অহম মহিলা তাঁর প্রেমে পড়েন। এমনিতেই ইরাকের পুরুষরা দেখতে সুন্দর। অন্য দিকে অহম মহিলারাও খুবই রুচিবান এবং সুন্দরী। ফলে কিছু দিনের মধ্যেই তাঁরা বিবাহ বন্ধনে বাঁধা পড়েন।

এতদিন শুধুই উজনি অসমে শ্রীমন্ত শঙ্করদেবের রচিত বৈষ্ণবী কীর্তন গাওয়া হত। কিন্তু আজান পীর এসে খুব দ্রুত অহমিয়া ভাষা রপ্ত করে নেন। বোধহয় সুন্দরী অহম নারীর প্রেম এ ব্যাপারে তাঁকে সাহায্য করেছিল। ফলে তিনি স্থানীয় ভাষায় সুফি গানের নতুন মাত্রা দেন। মিরান সাহেব বাগদাদ থেকে কিছু চিকিৎসাও শিখে এসেছিলেন। স্থানীয় মানুষদের তা প্রয়োগ করতে অনেকেই রোগ মুক্ত হন। ফলে তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। এবং দরবার গড়ে তোলার জন্য হিন্দু রাজা তাঁকে জমিও দান করেন।

প্রতিবছর উরস উৎসবে এই দরগায় বহু মানুষ আসেন। একদিকে ব্রহ্মপুত্র নদের ধূ ধূ বালুরাশি। তারপরে দিগন্ত বিস্তৃত নদী। অন্যদিকে সবুজের সমারোহের মধ্যে শান্ত দরগা। যেখানে শুধুই শান্তি আছে। আর পাখির কলতান। শান্তি আর মৈত্রীর জন্য এর থেকে ভালো জায়গা আর কি হতে পারে?

(মতামত ব্যক্তিগত। লেখাটি লেখকের অনুমতি নিয়ে তাঁর ফেসবুক পোস্ট থেকে নেওয়া) 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here