প্রসূন আচার্য

তখন বামফ্রন্ট আমল। উত্তরবঙ্গ থেকে নির্বাচিত সিপিএমের দু’বারের বিধায়ক ছিলেন মাফুজা খাতুন। এখন অবশ্য তিনি বিজেপিতে। দলের সহ-সভাপতি। ২০১৮ সালের লোকসভা ভোটে মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর থেকে প্রার্থী হয়েছিলেন। সে কথা ভিন্ন। তো বাম আমলেই বিধায়ক মাফুজার জন্য খবরের কাগজের ‘পাত্র চাই’ কলমে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল। তা নিয়ে খবরও হয়েছিল। একজন শিক্ষিত বিধায়কের বিয়ের জন্য পাত্র পাওয়া যাচ্ছে না! মাফুজার জবার ছিল, “রাজনীতি করতে করতে অনেকটাই বয়স হয়ে যাচ্ছে। বাড়িতে কাজে ব্যস্ত থাকলেও বাড়িতে একা লাগে। তাই বাড়ি থেকে এই বিয়ের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে।”

ইদানিং কাগজের পাত্র-পাত্রী কলমে চোখ রাখলে অনেক সময়েই বেশি বয়সে বিয়ে করার জন্য বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে। পুরুষদের ক্ষেত্রে তো বটেই, মহিলাদের ক্ষেত্রেও। তারমধ্যে যে ভাবে বয়স্ক চাকরিজীবী মহিলারা বিয়ে করতে চাইছেন, তা আগে দেখা যেত না। এই পোস্টে যে দুই মহিলার বিয়ের বিজ্ঞাপনের ছবি দিয়েছি, তাঁরা দু’জনেই স্কুল শিক্ষিকা। যে দিন এই দু’টি বিজ্ঞাপন ছাপা হয়, ঠিক এমনই আরও দুটি, মোট চারটি বিজ্ঞাপন একটি বাংলা কাগজে আমার চোখে পড়েছে। অর্থাৎ সকলেই উচ্চ-শিক্ষিতা এবং সামাজিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত। সঙ্গে আর্থিক ভাবেও স্বাবলম্বী। তাহলে তাঁরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য ও একা থাকার স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে চাইছেন কেন? প্রশ্ন এটাই।

এর একটাই উত্তর হয়, একাকিত্ব কাটানো। বাড়তি নিরাপত্তা। আর তার জন্য একজন সঙ্গী খুঁজে নেওয়া। ৫০ বছরের পরে মহিলাদের অনেক ক্ষেত্রেই শারীরিক মিলনের চাহিদা কমে যায়। সেই সঙ্গে বয়সজনিত কারণেই সন্তান উৎপাদনের ক্ষমতাও থাকে না। সেক্ষেত্রে শেষ জীবনে মনের মতো একজন সঙ্গী প্রয়োজন। যাঁর সঙ্গে অবসরে কথা বলা যাবে। বাড়িতে সঙ্গ পাওয়া যাবে। বাইরে বেড়াতে যাওয়া যাবে। বিদেশে এই ধরনের বিয়ের প্রচলন আছে। বিশেষ করে আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোতে। এখন দেখা যাচ্ছে বাংলায়। বিশেষ করে কলকাতায়। এটা খুবই শুভ লক্ষণ।

আসলে ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরে মূলত পূর্ববঙ্গ থেকে আসা মহিলারা নিজে বাঁচা এবং সংসার বাঁচানোর তাগিদে স্বাধীন ভাবে অর্থ উপার্জন বা চাকরি করা আরম্ভ করেন। বলা যায়, তাঁরাই প্রথম প্রজন্মের চাকরি করা বাঙালি মেয়ে। ঋত্বিক ঘটকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’ বা সত্যজিৎ রায়ের ‘মহানগর’ সিনেমায় আমরা সেই ছবি দেখেছি।

পঞ্চাশের শেষ বা ষাটের দশকের থেকে বাঙালি মেয়েরা অনেক বেশি করে স্কুল শেষ করে কলেজ ও উচ্চ শিক্ষার পথে পা বাড়ায়। আমাদের মায়েরা, যেমন আমার নিজের মা, মাসি বা বন্ধুদের মায়েরা চাকরি করতেন। তাঁরা অধিকাংশই কিন্তু প্রথম প্রজন্মের চাকরি করা মহিলা। এখন অবসরপ্রাপ্ত বা মারা গিয়েছেন। মনে রাখতে হবে, সেই সময় কিন্তু টিভি ছিল না। সিনেমা হলে শনি বা রবিবার উত্তম-সুচিত্রা-সৌমিত্র-মাধবী- সাবিত্রী-সুপ্রিয়া-ভানু। রেডিয়োতে সপ্তাহে একদিন নাটক। আর গল্পের বই, বিশেষ করে বাংলা উপন্যাস। এই ছিল সপ্তাহভর চাকরিরতা মহিলাদের বিনোদনের উপায়।

এর পরে এল সত্তর দশক। দেশের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গাঁধী। অধিকাংশ কলেজ পড়ুয়া বাঙালি মেয়ে হয় মার্ক্সবাদী না হলে নকশালপন্থী। এঁদের বর্ণনা আছে সমরেশ মজুমদারের কালবেলায়। মাধবীর চরিত্রে। কিংবা সুনীল গাঙ্গুলি, বুদ্ধদেব গুহ, সুবোধ ঘোষের লেখায়। অনেকের আদর্শ ইন্দিরা। কারও আবার একটু বেশি আধুনিকা, অপর্ণা সেন। তখনও কিন্তু মহিলাদের জন্য কোনও বৃদ্ধাশ্রম হয়নি। অন্যদিকে বাঙালি মেয়েরা আরও বেশি স্বাধীন, একলা চলা জীবনের স্বাদ পেয়েছে।

সময় গড়াচ্ছে। কলেজে প্রেম হচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন নিজের পছন্দে প্রেম করে বিবাহ বাড়ছে, তেমনিই বাড়ছে ডিভোর্স। বিবাহ বিচ্ছেদ। পুনর্বিবাহ। এই আশির দশক থেকেই আবার দেখা গেল, আর্থিক ও সামাজিক দিক থেকে স্বাবলম্বী বহু মহিলাই নানা কারণে বিয়ে করতে চাইছেন না। তাঁরা একলা জীবন কাটাতে চান। বাংলায় শুধুই মেয়েদের জন্য ম্যাগাজিন বাজারে এসেছে। তারমধ্যে অপর্ণা সেন সম্পাদিত সানন্দা অন্যতম।

নব্বইয়ের দশকে এই প্রবণতা আরও বাড়ল। সেই সঙ্গে পঞ্চায়েত থেকে বিধানসভা, বাঙালি মেয়েদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পালা শুরু হল। মহিলারা ডব্লিউ বিসিএস, আইএএস, বিচারপতি হলেন। সিপিএম, সিপিআই বা কংগ্রেসে মহিলা নেত্রীরা ছিলেন ঠিকই, কিন্তু বাংলার রাজনীতিতে মমতা ব্যানার্জির উত্থান একটা মাইল স্টোন। আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী মেয়েরা ভাবতে শুরু করলেন, ‘আমরা একাই জীবন কাটাতে পারি।’
এল ইন্টারনেট, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন। অর্থাৎ বিনোদনের কোনও অভাব রইল না। এমনকি চাইলে সন্তানও। সুস্মিতা সেনের মতো দত্তক নেওয়া নয়। আমার দুই পরিচিত মহিলা স্পার্ম ব্যাঙ্কের কল্যাণে সন্তানের মা হয়েছেন। যাঁদের বাচ্চারা এখনও স্কুলে পড়ে। এরা কিন্তু কেউ বাবার পরিচয় জানে না। এদের বাবা-মা দুটোই মা।
কিন্তু তার পরেও যেন কোথাও মেয়েদের একাকিত্ব গ্রাস করে। বিশেষ করে পঞ্চাশ পেরিয়ে যাওয়ার পরে। স্বাভাবিক ভাবেই বাইরের সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, হৈ হুল্লোড়ে ভাঁটা পড়ে। আগের থেকে সঙ্গী-সাথীও কমে আসতে থাকে। চাকরির পরে বাড়ি ফিরে কথা বলার লোক থাকে না। বিশেষ করে যাদের একলা থাকতে হয়।
দিনের শেষে কিন্তু মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। সে একলা থাকতে পারে না। সিঙ্গল মহিলাদের হস্টেলের সংখ্যাও কম। সেই স্কুল-কলেজ-অফিস থেকে বাড়ি ফিরে বন্ধ দরজা। একলার ফ্ল্যাট। আয়নার মুখোমুখি একা। রাতে স্লিপিং পিল। সেখান থেকে মুক্তি পেতেই পঞ্চাশোর্ধ্ব মহিলারাও বিয়ের বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন। নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।

(মতামত ব্যক্তিগত। লেখাটি লেখকের অনুমতি নিয়ে তাঁর ফেসবুক পোস্ট থেকে নেওয়া) 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here