শঙ্কর মণ্ডল ● হোগলবেড়িয়া

সামান্য সব উপকরণ। আর সে সব দিয়েই সীমান্তের চাষিরা তৈরি করে ফেলেছেন কাক-পাখি তাড়ানোর মোক্ষম উপায়। দড়ি ধরে টান মারলেই শোনা যাচ্ছে নানারকম শব্দ। সেই শব্দ শুনেই ভয় পেয়ে পালাচ্ছে পাখির দল।

তাহলে কি কাকতাড়ুয়ার দিন ফুরিয়ে গেল?

নদিয়ার হোগলবাড়িয়ার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের চাষিরা সমস্বরে বলছেন, ‘‘বাব্বা, ওই ভুল আবার!’’

ভুল কেন?

চাষিরা জানাচ্ছেন, সে বছরকয়েক আগের ঘটনা। কাছারিপাড়া সীমান্তে এক চাষি পাখির অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে তাঁর বেগুন খেতে একটি কাকতাড়ুয়া বসিয়েছিলেন। গাঁ-গঞ্জে প্রায় সব চাষিই কাকতাড়ুয়া তৈরি করতে জানেন। সেই চাষিও হাঁড়ি, ছেঁড়া পাঞ্জাবি ও লুঙ্গি পরিয়ে দিব্যি তৈরি করে ফেলেন একটি কাকতাড়ুয়া। আর অঘটনটা ঘটেছিল সেই রাতেই।

কী রকম?

কাছারিপাড়ার চাষিদের এখনও মনে আছে, সেই রাতেই বেচারা কাকতাড়ুয়াকে ‘ডাকু’ ভেবে গুলি ছুড়েছিলেন বিএসএফ জওয়ান। চোর-ডাকাতের অত্যাচারে জর্জরিত গ্রামের লোকেরা অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে ছুটেছিলেন ডাকাতের ‘বডি’ খুঁজতে। কিন্তু ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেল, গুলি খেয়ে কাকতাড়ুয়া কুপোকাত হয়ে পড়ে আছে। আর কাকতাড়ুয়ার মাথার হাঁড়ি গুলির সৌজন্যে টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে আছে মাটিতে। ঘটনাটি যে নিছকই বিভ্রমের বশে ঘটেছিল তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু তারপরেই বিএসএফ কর্তৃপক্ষ মৌখিক ভাবে জানিয়েছিলেন, বর্ডার থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যে কোনও কাকতাড়ুয়া বসানো যাবে না।

সীমান্তের চাষিরা জানাচ্ছেন, তার পর থেকেই একেবারে বর্ডারের জমিতে কেউ আর কাকতাড়ুয়া বসান না। তাছাড়া পাখিরাও আজকাল কাকতাড়ুয়াকে আগের মতো ভয় পায় না। তাই নিত্য নতুন উপায় বের করতে হয়। এর আগে কাকতাড়ুয়া তো ছিলই। বাঁশের শুকনো পাতা পাটকাঠির সঙ্গে বেঁধে ঝুলিয়ে দেওয়া হত। একই পদ্ধতিতে প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগ ঝোলানো হতো। পাখি তাড়াতে বাতিল অডিয়ো ক্যসেটের ফিতেও একসময় চাষিরা জমিতে ঝুলিয়ে রাখতেন। এখনও বাতিল সিডি বা ক্য়ারিব্য়াগ ঝুলিয়ে রাখা হয়।

কিন্তু পাখিরাও কম যায় না! মানুষের সব কেরামতিই তারা ধরে ফেলে। সম্প্রতি কাছারিপাড়ার আনাজ ও ধান চাষি সঞ্জিত জোয়ারদার পাখি তাড়াতে একটা বেড়ে বুদ্ধি বের করেন। লম্বা ধান খেতের মাঝ বরাবর কয়েকটা খুঁটির সাহায্যে এক প্রান্ত থেকে ওপর প্রান্ত পর্যন্ত একটা নাইলনের দড়ি টাঙিয়ে দেন তিনি। সেই দড়িতে দশ-বারো ফুট অন্তর বেশ কয়েকটা প্লাস্টিকের বোতল ঝুলিয়ে দেন। প্রতিটি বোতলের মধ্যে তিনি ভরে দেন নুড়ি-পাথর, বাতিল নাট-বল্টু ও কাচের গুলি। কাজের ফাঁকে মাঝে মাঝেই তিনি দড়ির এক প্রান্ত ধরে টান দিচ্ছেন। আর বোতল থেকে অদ্ভুত আওয়াজ হচ্ছে। পাখিরাও পালাতে পথ পাচ্ছে না। সঞ্জিত বলছেন, ‘‘এখন কিছুদিন নিশ্চিন্ত। তার পরে ফের নতুন উপায় বের করতে হবে।’’ সে যবে হবে, হবে। তবে সঞ্জিতের দেখাদেখি এখন অনেকেই পাখি তাড়ানোর এই পদ্ধতি কাজে লাগাচ্ছেন।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here