শুভদীপ ভট্টাচার্য

কৃষক আন্দোলনের কর্মীদের উপর জলকামান চালাল পুলিশ। এক যুবক ঝুঁকি নিয়ে জলকামান বন্ধ করলেন। প্রত্যাশিত ভাবেই সেই যুবকের ছবি ভাইরাল হয়েছে সমাজ-মাধ্যমে। সেই ছবিটি দেখার পরে লালগোলার চাষি খুদন পালের প্রতিক্রিয়া, ‘‘দুঃসাহসিক কাজ। ও আজ সকলের চোখে হিরো। কিন্তু কৃষকদের দুঃসহ দিন বদলাবে কি?’’

নয়া কৃষিবিল চালুর পর থেকেই বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে ভারতের নানা প্রান্ত। পঞ্জাব, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, কর্নাটক, বিহার, ঝাড়খণ্ড, উত্তরপ্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশের কৃষকেরা জোট বেঁধেছে লড়াইয়ের প্রস্তুতিতে। সম্প্রতি দিল্লিতে শুরু হয়েছে বিক্ষোভ, প্রতিবাদ। কারণ, নয়া কৃষি বিলের বিলোপ। নয়া কৃষি বিল অনুযায়ী, চাষিরা চুক্তিচাষে বাধ্য হবে। ফড়ে যাবে, এজেন্ট আসবে। জমির অধিকারও হারাতে হবে। খুদন বলছেন, ‘‘কৃষকের অধিকার লুট হয়ে যাচ্ছে। আগেও তেমন পড়তা ছিল না। কিন্তু আস্থা ছিল যে, জমিটুকু অন্তত আছে। নতুন আইনের জন্য সেটুকুও থাকবেনা। কিন্তু আমাদের এখানে তেমন আন্দোলন নেই। কৃষক সংগঠনগুলিরও হেলদোল নেই।’’

নওসেরার বাসিন্দা, বছর পঞ্চাশের এমদাদুল হক কাজ করছিলেন জমিতে। খেতে এখন সর্ষে রয়েছে। তাঁর জমি রয়েছে দুই বিঘা। বীজের খরচ পাঁচশো টাকা, সারের দর প্রায় সাড়ে সাতশো , ট্রাক্টর দিয়ে জমিতে হাল দেওয়া নশো টাকা, সেচের জন্য ব্যয় প্রায় হাজার তিনেক। নিড়ানি দিতে খরচ হয় প্রায় দুই হাজার। সেখানেই শেষ নয়। আছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পোকার আক্রমণ, কীটনাশকের খরচ। ফসল ঘরে তুলতেও বিস্তর খরচ হয়। ফসল বোনা থেকে মহাজনের ঘর পর্যন্ত পৌঁছে দিতে বিঘা প্রতি ফসলে খরচ হয় প্রায় দশ হাজার তিনশো পঞ্চাশ টাকা। জমি নিজের না হলে বাড়তি খরচ ছয়-সাড়ে ছয় হাজার। বিঘা প্রতি সর্ষে হয় তিন থেকে পাঁচ কুইন্টাল। কুইন্টাল প্রতি দাম মেলে সাড়ে তিন হাজার টাকা। ফলে জমি নিজের হলে এবং বরাত ভাল থাকলে সামান্য কিছু টাকা লাভ থাকে। আর অন্যের জমি হলে লোকসানই ভবিতব্য।

কান্দির বাসিন্দা পার্থ দাস আলুচাষি। গতবার আলু বিক্রি করেছিলেন চার টাকা কেজি দরে। এ বার সেই আলুই তিনি বাজার থেকে কিনছেন  প্রায় পঞ্চাশ টাকা কেজিতে। পার্থ বলছেন, ‘‘বিঘে প্রতি বীজের দর প্রায় দশ থেকে বারো হাজার টাকা। সার লাগে হাজার তিনেক টাকার। আছে সেচ, কীটনাশক, ট্রাক্টর ও অন্য খরচ।’’ বছর সত্তরের সিরাজউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘‘একেই চাষ করে লাভ নেই। তার উপর এই কৃষিবিল কৃষককে ধনেপ্রাণে শেষ করে দেবে।’’

ইতিহাসের জেলা মুর্শিদাবাদ আবাদের জন্যও বিখ্যাত। কিন্তু এ জেলার বেশিরভাগ চাষি লাভের মুখ প্রায় দেখেন না বললেই চলে। তার উপরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে তো কথাই নেই। বহু চাষির ফসল বিমা নেই। ফলে ক্ষতিপূরণও মেলে না। এমন অবস্থায় কৃষিবিলের ফরমান অনুযায়ী চাষি বাধ্য হবেন চুক্তিচাষে। পাশাপাশি চুক্তিচাষে সব দায় কৃষকের। এখানেই আশঙ্কারই মেঘ দেখছেন কৃষকেরা। তেভাগা, অপারেশন বর্গা কিংবা সাম্প্রতিক অতীতের সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের জমির লড়াইয়ের স্মৃতি রয়েছে বাংলার ইতিহাসে। বছর পঞ্চাশের এমদাদুল বলেন, ‘‘আমরা সংগঠিত হতে পারছি না। কৃষক সংগঠনগুলিও তেমন তৎপর নয়। পঞ্জাব, হরিয়ানা পথ দেখাচ্ছে। অথচ আমরা দিশেহারা।’’