শ্রুতায়ু ভট্টাচার্য

২০২০ সালের ২৬ নভেম্বর। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেস কাসা রোসাদায় শায়িত রয়েছে তাঁর কফিনবন্দি দেহ। একে একে শ্রদ্ধা জানিয়ে যাচ্ছেন আর্জেন্টাইন জনতা। সেই ভিড়ে শামিল প্রাক্তন তারকা ফুটবলার থেকে রাজনীতিবিদেরাও। কিন্তু তাঁদেরকে ভিড়ের থেকে আলাদা করে দেখার প্রয়োজন নেই। বাইরে তখন হাজারো মুখ অপেক্ষা করে রয়েছে তাঁদের প্রিয় মানুষকে শেষ দেখা দেখার জন্য। কাউকে বার্ধক্য গ্রাস করেছে, কেউ এসেছেন সদ্যোজাতকে কোলে নিয়ে, কেউ এসেছেন ক্রাচে ভর দিয়ে, কেউ বা নিয়ে এসেছেন চে গুয়েভারার মুখ আঁকা রক্তিম পতাকা। কেউ বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন, কেউ বা করতালি দিয়ে তাঁর স্মৃতি উদযাপন করছেন। তাঁদের মধ্যে থেকেই একজন বলে গেলেন, ‘‘দিয়েগোই জনতা’’, আর একজন বললেন, ‘‘দিয়েগোর মৃত্যু নেই, আমাদের মধ্যে উনি বেঁচে আছেন।’’

৩৪ বছর আগের কথা। কাসা রোসাদার ব্যালকনিতে তিনি দাঁড়িয়ে। সামনের বিরাট প্রাঙ্গন, রাজপথ ভেসে যাচ্ছে জনপ্লাবনে। তাঁর হাতে শোভা পাচ্ছে ফুটবল বিশ্বকাপ। শিশুর মতো সেই কাপ নিয়ে তিনি হাসছেন, আনন্দ করছেন সতীর্থদের সঙ্গে। আর সেই আনন্দ সঞ্চারিত হচ্ছে উদ্বেল জনতার মধ্যে। রচনা হচ্ছে ইতিহাসের। তিনি হয়ে উঠেছেন এক আইকন, এক উপাস্য ব্যক্তি যদিও জনতার সঙ্গে তাঁর অন্তরের সম্পর্ক। সেখানে কোনও দূরত্ব নেই। গলি থেকে রাজপথ– তাঁর নামে জনতা খুঁজে পায় নিজেদের সংস্কৃতিকে, খুঁজে পায় মুক্তির চেতনা।

দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনার জীবনের শুরু পথের ধুলোকে সঙ্গী করেই। প্রবল দারিদ্র, অর্থকষ্ট নিয়ে ভিলা ফিওরিতোর বস্তির ঘর থেকে বেরিয়ে রোদে আবর্জনা ফেলার মাঠে ফুটবল নিয়ে দৌড়েই মিলত শান্তি। তিন বছর বয়সে পাওয়া চামড়ার ফুটবল নিয়েই ঘুমোতে যেত ছোট্ট দিয়েগো। সেই ফুটবল খেলা দিয়েই গোটা বিশ্বকে স্বপ্নাবিষ্ট করে ফেলতে বেশি সময় লাগেনি। তাঁর খেলার সৌন্দর্য, নৃত্যশীলতা তাঁকে ফুটবল জনতার কাছে ঈশ্বরের স্থান দিয়েছে। আর্জেন্টিনা থেকে সুদূর ইতালির নেপলস শহর– তাঁর ঐশ্বরিক জাদুতে মুগ্ধ হয়েছে সকলেই। আর তার রেশ ছড়িয়ে পড়েছে গোটা লাতিন আমেরিকা, ইউরোপ-সহ আফ্রিকা, এশিয়ার তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতেও। তাই খেলা ছাড়ার বহু বছর পরে ভারতের মতো দেশে তিনি এলেও তৈরি হয় উন্মাদনা রাত্রিবেলা এয়ারপোর্ট থেকে তাঁর যাত্রাপথের দু’ধারে মশাল জ্বেলে দাঁড়িয়ে থাকে সারি সারি মানুষ।

মারাদোনাকে শুধুমাত্র কিছু শুকনো পরিসংখ্যান দিয়ে মূল্যায়ন করা সম্ভব না। তাঁর স্থান রয়ে গিয়েছে জন-সংস্কৃতিতে। ইতালির উত্তরের প্রবল পরাক্রমশালী ফুটবল ক্লাবগুলোর কাছে ধারে-ভারে-শক্তিতে অনেক পিছিয়ে থাকা ন্যাপোলিকে যখন ১৯৮৭ সালে প্রথমবারের জন্য লিগ এনে দিলেন দিয়েগো, নেপলস-এর সবচেয়ে বড় কবরখানার বাইরে মৃত মানুষদের উদ্দেশে নিয়াপলিট্যানরা লিখে এল, ‘‘তোমরা জানতেই পারলে না কী জিনিস দেখা থেকে বঞ্চিত হলে।’’ কথিত আছে, ঠিক পরের দিনই তার নীচে দেখা গেল আর একটা লেখা, ‘‘এতটা নিশ্চিত হয়ে বোলো না যে, আমরা এই ইতিহাস চাক্ষুষ করিনি।’’ নেপলসের লৌকিক সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিশ্বাসের ছত্রে ছত্রে রয়েছে অলৌকিকতার উপাখ্যান। ন্যাপোলিতে মারাদোনার অতিমানবীয় খেলা তাঁকে সেই ধর্মীয় বিশ্বাসের অঙ্গ করে ফেলল। নেপলস কিংবা বুয়েনোস আইরেসের পথে পথে যে স্ট্রিট-আর্ট দেখা যায় সেখানে প্রায়শই মারাদোনার নতুন নতুন ছবি, মিউরাল, ফ্রেস্কো ফুটে ওঠে। অনেক জায়গাতেই তিনি আবির্ভূত হন এক ঐশ্বরিক প্রতিরূপ হয়ে, তাঁর মাথার পিছনে থাকে জ্যোতির্বলয়।

এই “ঈশ্বর”ই আবার পোপ দ্বিতীয় জন পলকে ভ্যাটিকানের সোনায় মোড়া সিলিং বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে দরিদ্র শিশুদের সাহায্য করতে বলেন। ইংল্যান্ড কর্তৃক ফকল্যান্ডের অন্যায় দখলদারির বিরুদ্ধে স্টেটমেন্ট হয়ে দাঁড়ায় তাঁর পাঁচ জনকে অবলীলায় কাটিয়ে গোল। আবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশকে অত্যাচারী তকমা দিতেও ছাড়েন না ফিদেল কাস্ত্রোর অনুরাগী এই ফুটবলার। অথচ নিজের ব্যক্তিগত জীবনেও কাঁটার আঘাত ক্ষতবিক্ষত করেছে তাঁকে। মাদকাসক্তি ও অসংযত জীবনযাপন তাঁর খেলার কেরিয়ারকে সংক্ষিপ্ত করেছে। তবে ১৯৯৪-এ নিষিদ্ধ ড্রাগ নেওয়ার দায়ে বিশ্বকাপ থেকে নির্বাসিত হলে তাঁর অসংখ্য অনুরাগী প্রতারিত বোধ করেছেন।

১৯৯৮ সালে আর্জেন্টিনার রোসারিওতে মারাদোনার অনুরাগীরা গড়ে তোলেন মারাদোনিয়ান চার্চ। উপাস্য দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা। এখানে ফুটবল ধর্ম এবং দিয়েগো তার ঈশ্বর। ফুটবলের সৌন্দর্যের প্রতি ভালবাসাই এখানে উপাসনার এক প্রধান শর্ত। তবে চার্চের বাইরেও তিনি লাতিন ‘‘দিওস’’ ; বা ঈশ্বর, তাঁর ফুটবলার পরিচিতি ‘D10’ তাতেই স্বীকৃতি দেয়। মারাদোনাকে কেন্দ্র করে অনেক গল্প ছড়িয়ে রয়েছে। শোনা যায় ন্যাপোলি একবার জুভেন্তাসকে হারানোর পরে ভোরবেলা মারাদোনা ও সতীর্থরা রাস্তাতেই উৎসবে মাতেন; তাঁদের চিৎকারে ঘুম ভেঙে যায় কাছাকাছি এক ভাড়াবাড়ির এক বৃদ্ধার। বিরক্ত হয়ে জানলা খুলে তিনি চিৎকার করেন, “নিজেকে কি নেপলসের রাজা ভাবো?” উত্তর ভেসে আসে “আমি মারাদোনা”। নিমেষেই বৃদ্ধার অভিব্যক্তি পাল্টে যায়, তিনি আনন্দে হাততালি দিয়ে ওঠেন এবং মারাদোনার দিকে স্নেহচুম্বন ছুড়ে দেন।

বিশিষ্ট লেখক এদুয়ার্দো গ্যালিয়ানো বলেছিলেন, মারাদোনা হলেন সমস্ত দেবতার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানবীয়। কিন্তু জনতার ইশ্বর হয়ে ওঠার প্রত্যাশা তাঁকে বয়ে নিয়ে চলতে হয়েছে। তাই হয়তো জীবনের অন্ধকার সময়ে তিনি হয়ে উঠেছেন পতিত এক দেবদূত। মারাদোনা নিজে বলেছিলেন তিনি ইশ্বর নন। তবু জনতার বিশ্বাস পাল্টায়নি। তাঁর এক জীবনীকার জিমি বার্নস ১৯৯৬ সালে লিখেছিলেন, এটা নিশ্চিত মারাদোনার যখন মৃত্যু হবে তখন শেষকৃত্যে প্রবল জনসমাগম হবে কিন্তু তাঁর মৃত্যু মানুষ বিশ্বাস করতে চাইবে না। ২৪ বছর পরে সেই ছবি আর্জেন্টিনা থেকে নেপলসের রাজপথে সত্যি হয়ে ফুটে উঠল। কফিনবন্দি কিন্তু জনমানসে অমরত্ব পাওয়া ফুটবল-ইশ্বর যেন বলে গেলেন, “পথ আমার চলে গেল সামনে, সামনে, শুধুই সামনে…দেশ ছেড়ে বিদেশের দিকে, সূর্যোদয় ছেড়ে সূর্যাস্তের দিকে, জানার গণ্ডী এড়িয়ে অপরিচয়ের উদ্দেশে…”।

(ফিচার ছবিটি গুগল থেকে নেওয়া)