কাবেরী বিশ্বাস

ফি বছর অক্টোবর-নভেম্বরে দিল্লিবাসীর কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ে। ধান কাটা সারা হলে পঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশের কৃষকদের ধানের নাড়া পোড়ানো শুরু হয়ে যায়। বছরে প্রায় ২৩০ লক্ষ টন নাড়া পুড়িয়ে তৈরি হয় গম চাষের জমি। দিল্লির বাতাসে দূষণ হয়ে দাঁড়ায় হাজারও রোগের উৎস।

গত পাঁচ বছর ধরে ওই রাজ্যগুলো আপ্রাণ চেষ্টা চলাচ্ছে, কী ভাবে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা যায়। বতর্মানে এই সমস্যার সমাধানে আশার আলো দেখিয়েছেন আইএআরআই – এর বিজ্ঞানীরা। তাঁরা তৈরি করেছেন পুসা ডিকম্পোজার নামে একটি ছত্রাক ভরা ক্যাপসুল। আইএআরআই আটটি সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করেছে যাতে সামনের বছর যথেষ্ট সংখ্যক ক্যাপসুল চাষিরা পান। চারটি ক্যাপসুল পাওয়া যাবে মাত্র ২০ টাকায়। এ বছর দিল্লি ইনস্টিটিউট উত্তরপ্রদেশ, পঞ্জাব,  হরিয়ানার ১২০০০ হেক্টর জমির জন্য ক্যাপসুল সরবরাহ করছে।

কী ভাবে কাজে লাগানো হবে এই ক্যাপসুল?  আইএআরআই সূত্রে  জানা গিয়েছে এই ক্যাপসুলে আছে সাতটি ছত্রাক প্রজাতির রেণু। এই ছত্রাকগুলির উৎসেচক খড়ের মধ্যে থাকা সেলুলোজ, লিগনিন, পেকটিন ভেঙে দিয়ে কম্পোস্ট তৈরি করে।  একটি প্যাকে থাকবে চারটি ক্যাপসুল যা এক হেক্টর জমির জন্য যথেষ্ট। চাষিদের এ  থেকে বানিয়ে নিতে হবে দ্রবণ যা মাঠের নাড়ার উপর স্প্রে করে দিতে হবে। দ্রবণ তৈরির জন্য লাগবে ১২দিন। প্রথমে পাঁচ লিটার জলে মেশাতে হবে ১৫০ গ্রাম গুড়। এই মিশ্রণ ফুটিয়ে ঠান্ডা করে তাতে মেশাতে হবে ৫০ গ্রাম ছোলার বেসন। এর সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে ক্যাপসুলের ছত্রাকগুলি। চার দিন পাত্রের মুখ ঢেকে ছায়ায় রেখে দিতে হবে।

চার দিন পরে ছত্রাকের মাইসেলিয়ামের পুরু স্তর তৈরি হলে আবার মেশাতে হবে পাঁচ লিটার জলে ১৫০ গ্রাম গুড়। এই গুড়জল ফুটিয়ে ঠান্ডা করে মিশিয়ে দিতে হবে আগেরটার সঙ্গে। এই পদ্ধতিটার পুনরাবৃত্তি করতে হবে দু’দিন অন্তর আরও তিন বার। এ বার ৪৭৫ লিটার জলে মেশাতে হবে ওই দ্রবণ। এই দ্রবণ এক হেক্টর জমিতে স্প্রে করার জন্য তৈরি হল। ফসল কাটার পরে নাড়ার উপর ছড়িয়ে দিতে হবে। রোটাভেটর মেশিনের সাহায্যে মাটির সঙ্গে খড় মিশিয়ে দেওয়াও যেতে পারে। ২০-২৫ দিন পরে খড় সম্পূর্ণ পচে গিয়ে জমি পরবর্তী ফসলের বীজ বোনার জন্য উপযুক্ত হয়ে যায়। যেহেতু এতে উর্বরতা বাড়ে সেই কারণে এই পদ্ধতিতে চাষ করলে তিন বছর পর থেকে রাসায়নিক সার কম লাগে।

আইএআরআই-এর বিজ্ঞানীদের মতে, এটি সহজে প্রয়োগ করা যায়, সস্তা,  লাভজনক এবং পরিবেশ বান্ধব। তবে অত্যন্ত উপযোগী এই ডিকম্পোজার নিয়ে চাষিদের মনে রয়ে গিয়েছে কিছু জরুরি জিজ্ঞাসাও। উত্তর ভারতের গমচাষিদের কাছে ধান কাটা আর গম বোনার মধ্যের সময়টা একটা বড় ফ্যাক্টর। তাঁরা যেদিন ফসল কাটেন তার পরের দিন থেকেই গম বোনার প্রস্তুতি শুরু হয়। কী করে তাঁরা ২০-২৫ দিন অপেক্ষা করবেন?

গম বোনার আদর্শ  সময় হল নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ। ফসল উঠতে লাগে পাঁচ মাস। গম বুনতে দেরি হলে গরম পড়ার আগে ফসল উঠবে না। ফলন কমে যাবে। তাই চাষি চিরাচরিত পথেই চলতে চান। আইএআরআই-এর  মাইক্রোবায়োলজিস্ট ড. অন্নপূর্ণার মতে, স্প্রে করার পরে ২৫ দিন অপেক্ষা না করলেও চলবে। ১৫ দিন পর থেকেই মাটি চষা, বীজ বোনা করতে পারবেন চাষিরা। তাঁরা এর সঙ্গে হ্যাপি সিডার ব্যবহার করতে পারেন। হ্যাপি সিডার হল জমিতে বীজ পোঁতার সঙ্গে সঙ্গে আগের ফসলের খড় কেটে মাটিতে বিছিয়ে দেওয়া। ফলে দ্রুত কম্পোস্ট তৈরি হবে। তার মানে খড় পোড়ানোর যে বিকল্প পদ্ধতিগুলো এতদিন বলা হচ্ছিল সেগুলো পুরোপুরি বিকল্প ক্যাপসুল নয়। তার পরিপূরক মাত্র।

এ কথা সমর্থন করেন আইএআরআই-এর ডিরেক্টর মি. সিংহও। তাহলে ক্যাপসুল শুধু নাড়ার পচন ত্বরান্বিত করবে। কিন্তু নাড়া জমিতে পড়ে থাকলে পাঁচ মাস পরে মাটির জীবাণুরাই তাকে পচিয়ে সার বানাবে বিনা খরচে। তাহলে ডিকম্পোজার মেশানোর ঝামেলা কেন পোহাবেন চাষি?

অবশ্য এটা খুবই কাজে লাগবে সেই সব চাষিদের যাঁরা সুপার সিডার যন্ত্র কিনতে পারবেন না এবং জমির পরবর্তী ফসল এমন হতে পারে যেখানে ২৫ দিন দেরিতেও লাগানো যাবে। যে সব রাজ্যে ধানের পরে একই জমিতে গম লাগানো হয় না সেখানে এই ক্যাপসুল ব্যবহার করা যায়। চাষিদের এই বার্তা দিতে হবে যে, নাড়া পোড়ানোর চেয়ে জমিতে পচানো জমি ও পরিবেশের পক্ষে কল্যাণকর। যদি ধানের পরে একই জমিতে ডাল শস্য, তৈলবীজ চাষ করতে হয় সেটা করাই শ্রেয়। আর যাঁদের পক্ষে সুপার সিডার ব্যবহার করা সম্ভব তাঁরা ধানের পরে গম চাষ করুন, কিন্তু নাড়া পোড়ানো নৈব নৈব চ। সরকারের দায়িত্ব চাষিদের পাশে থেকে নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা দেওয়া যাতে তাঁরা চাষের ধরন পাল্টাতে উৎসাহিত হন। প্রাণঘাতী বায়ুদূষণ বন্ধ হোক।

তথ্যসূত্র: ১) Vijayta Lalwani, scroll.in

২)Shivam Patel,Oct,10,2020, The Indian Express

৩) Vivan Fernandes, smartindianagriculture.com

(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)