ড. মৃদুল দাস

রাজধানী দিল্লি এবং সারা দেশ এখন কৃষক আন্দোলনে উত্তাল। তিনটি কৃষি-আইন বাতিলের দাবি উঠেছে। সেই আইন তিনটি কী, দেশবাসীর তা আজ আর অজানা নয়। তবুও স্বল্প পরিসরে আর একবার তা দেখে নেওয়া যাক।

প্রথম আলোচ্য আইনটি ঠিক কৃষি আইন নয়। অত্যাবশ্যক পণ্য আইনটির একটি বড়সড় সংশোধনী। অতি আবশ্যক পণ্যগুলির একটা তালিকা এই আইনটির অন্তর্ভুক্ত। তালিকাভুক্ত পণ্যগুলির একচেটিয়া ব্যবসা, মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট বন্ধ এবং মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের জন্য এই আইন। সংশোধিত আইনে সেই তালিকা থেকে চাল, গম, ডাল, তৈলবীজ, ভোজ্যতেল, আলু, পেঁয়াজের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যগুলিকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে, টাকার জোর থাকলে এখন চাল, গম, ডাল, তেল, আলু পেঁয়াজ যত খুশি মজুত করা যাবে।

ফসল ওঠার মরসুমে ৫ টাকা কেজি দরের আলু এখন ৪৫ টাকা। হিমঘরগুলির হিসাব বলছে, সামনের মরসুম পর্যন্ত আলুর ঘাটতি নেই, বরং তা উদ্বৃত্ত। পেঁয়াজ ওঠার সময় ৪ টাকা দর ছিল, এখন তা ৮০ টাকা কেজি। কেন? উত্তরটা সকলেরই জানা। আলু পেঁয়াজ এখন পুরোপুরি বড় ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে, যে দামে তারা বাজারে ছাড়বে, সেই দামেই আমরা কিনতে বাধ্য। উৎপাদন কত হল, তার উপর এখন আর দাম নির্ভর করে না।

কিন্তু তবুও আমাদের মহামান্য কেন্দ্রীয় সরকার বলছে, চাল, গম, তৈলবীজ, আলু পেঁয়াজ উৎপাদন প্রচুর বেড়েছে, মোট চাহিদার তুলনায় গড় জোগান এখন বেশি। তাই, এইসব কৃষিপণ্যে নাকি সরকারি নিয়ন্ত্রণের আর দরকার নেই। শুধুমাত্র অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, গুরুতর প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটলে সরকার হস্তক্ষেপ করবে।

এতদিন কড়া আইন থাকা সত্ত্বেও যেখানে প্রভাবশালী দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও মজুতদাররা প্রশাসন ও সরকারি দলের নেতাদের সঙ্গে যোগসাজশে আলু পেঁয়াজের এমন দর হাঁকছে, সেখানে আইন না থাকলে কী দুর্গতি হবে তা বলাই বাহুল্য।

এ বার আসা যাক দ্বিতীয় আইনটি প্রসঙ্গে। চাষিদের কৃষিপণ্য বিক্রির জন্য ছিল ‘এগ্রিকালচারাল প্রোডিউস মার্কেটিং কমিটি অ্যাক্ট’ বা এপিএমসি আইন। এই আইন মেনে ফসল বেচাকেনা হয় কৃষিমান্ডিতে। মান্ডির পরিচালকেরা ক্রেতা নয়, তারা চাষি ও ক্রেতাদের মধ্যে সমন্বয়কারী। সরকার সেখানে তদারক। আইনটিতে কিছু ত্রুটি থাকলেও ব্যক্তিচাষি এবং চাষি সংগঠনগুলির কথা বলার অধিকার এবং সরকার ঘোষিত ন্যূনতম সহায়ক মূল্য পাওয়ার সুযোগ সেখানে ছিল। পঞ্জাব, হরিয়ানায় এই কৃষিমান্ডি ব্যবস্থাটি বেশ শক্তপোক্ত। তাই সরকার জানত, আইনটি বাতিল করলে কৃষকরা ক্ষেপে যাবে। সেইজন্য এপিএমসি আইনটি বাতিল না করেই আনা হল একটি নতুন আইন “কৃষি উৎপাদন ব্যবসা ও বাণিজ্য (সহায়তা ও সম্প্রসারণ) আইন।”

আইনটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে, কর্পোরেটরা অনায়াসেই এপিএমসি আইনটি অকার্যকর করে দিতে পারে। তবুও কেন্দ্রীয় সরকার চাষিদের বিভ্রান্ত করতে বলছে, মান্ডি ব্যবস্থা তো তুলে দেওয়া হচ্ছে না! চাইলে চাষিরা কৃষিমান্ডিতেও ফসল বেচতে পারবে। নতুন আইনে তাদের মান্ডিতে ফসল বিক্রির বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তারা আরও বলছে, এপিএমসি আইনের বাধা থাকায় ক্রেতারা (আসলে কর্পোরেটরা) চাইলেও বেশি ফসল কিনতে পারত না। ফলে, বাজারে চাহিদা সৃষ্টি হত না এবং চাষিরা কম দাম পেত। নতুন আইনে ক্রেতারা যতখুশি ফসল কিনতে পারবে, বাজারে চাহিদা বাড়বে, চাষি বেশি দাম পাবে এবং তার আয় বাড়বে।

কথাগুলো শুনতে ভাল হলেও সকলেই আজ জানেন, কর্পোরেটরা কী কায়দায় পুরো বাজারের দখল নেয়। পুঁজির জোরে একটু বেশি দাম দিয়ে চাষির কাছ থেকে প্রথম দু’চার বছর সব ফসল কিনে নিলে কোনও চাষিই আর কৃষিমান্ডিতে ফসল বেচতে যাবে না। অচিরেই মান্ডিগুলি বন্ধ হয়ে যাবে। নতুন আইনে প্রাইভেট কৃষিমান্ডির সংস্থান থাকায় কর্পোরেটরা তখন মান্ডি তৈরি করবে অথবা বন্ধ মান্ডিগুলিই কিনে নেবে। তখন আর তাকে চাষির কাছে যেতে হবে না, চাষিই প্রাইভেট মান্ডিতে এসে হত্যে দেবে। দয়া করে কর্পোরেট প্রভুরা তখন যে দাম দেবে, তা নিয়েই চাষিকে বাড়ি যেতে হবে। ফলে চাষিকে বাঁচতে আরও ঋণগ্রস্ত হতে হবে, জমিজমা বেচতে হবে, নতুবা আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হবে।

অত্যাবশ্যক পণ্য আইনের সংশোধনী এনে যতখুশি মজুত করার এবং এই নতুন আইনে যতখুশি কেনার অধিকার দেওয়া হল। যতখুশি কিনবে এবং মজুত করবে কারা? ছোট ব্যবসায়ীরা নিশ্চয়ই নয়। কর্পোরেটরা, যাদের টাকার কোনও সীমা পরিসীমা নেই। তারা ফসল কিনবে চাষির মাঠ, গোলা বা যেকোনও জায়গা থেকে। এমনকি অনলাইনেও। অর্থাৎ, মাঠে উৎপন্ন হওয়ার পরে এই কৃষিজ পণ্যগুলি পুরোটাই কর্পোরেটের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। সমস্ত অপরিহার্য খাদ্যদ্রব্য তাদের হাতে চলে যাওয়ার ফল কী হবে তা কল্পনা করা নিশ্চয়ই খুব কষ্টসাধ্য নয়। প্রতিটি সাধারণ মানুষকেই তার চড়া মূল্য চোকাতে হবে।

তৃতীয় আইনটি হল, “ফসলের দামের নিশ্চয়তা এবং কৃষি পরিষেবার ক্ষেত্রে চাষির (ক্ষমতায়ন ও সুরক্ষা) চুক্তি আইন”। সহজ কথায় “চুক্তিচাষ”। ‘ফসলের দামের নিশ্চয়তা’, চাষির ‘ক্ষমতায়ন’, ‘সুরক্ষা’ ইত্যাদি যত কিছুই বলা হোক না কেন, চুক্তি যদি চাষি করে, চুক্তির মেয়াদকালে চাষির যত প্রয়োজন থাকুক, সে-চুক্তি বাতিল করা, জমি বিক্রি, লিজ, বন্ধক দিতে পারবে না। অন্যদিকে, কেউ চুক্তিভঙ্গ করলে বিরোধ-নিষ্পত্তির জন্য যেতে হবে সাব ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে। তাঁর তৈরি সালিশি বোর্ডে হবে ফয়সালা। রায় পছন্দ না হলে যেতে হবে জেলা কালেক্টর বা অ্যাডিশনাল কালেক্টরের কাছে। সেখানে রায় পছন্দ না হলে আবেদন করতে হবে কেন্দ্রীয় সরকারের যুগ্মসচিবের কাছে। ক’জন চাষি এমন চক্কর খেতে পারবে? ক’জন আমলাকেই বা চাষির পক্ষে রায় দিতে দেখা যাবে?

আন্দোলনকারী কৃষকরা আজ নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে বলছেন, কর্পোরেটদের অবাধে প্রবেশের ব্যবস্থা করার পরে সরকারি হাসপাতাল, স্কুল, ব্যাঙ্ক, টেলিফোন-সহ সব সরকারি ব্যবস্থাগুলি হয় পঙ্গু হয়েছে নয়তো উঠে যাচ্ছে। ফলে, আজ কৃষিতে তিনটি আইনের দ্বারা উৎপাদন কী হবে, কী শর্তে কৃষিপণ্য বিক্রি হবে, মজুতদারি কতটা হবে তা ঠিক করার ভার  সেই কর্পোরেট হাঙরদের হাতে তুলে দিলে চাষি মেহনত করেও বাঁচতে পারবে না। কৃষকরা তাই বাঁচার তাগিদে আজ রাজপথে সংগ্রামরত। দেশের এই আক্রান্ত ও সংগ্রামরত কৃষকদের পাশে থাকা আজ আমাদের সামাজিক কর্তব্য।

(লেখক কৃষিবিজ্ঞানী, মতামত ব্যক্তিগত)

ফিচার ছবিটি গুগল থেকে নেওয়া

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here