মৌসুমী মজুমদার

রাজা যযাতি শুক্রের অভিশাপে জরাগ্রস্ত হলে কনিষ্ঠ পুত্র পুরু নিজের যৌবন পিতাকে দিয়েছিলেন। পুত্রের যৌবন নিয়ে যযাতি অভীষ্ট বিষয় ভোগ, প্রজাপালন ও বহুবিধ ধর্ম-কর্মের অনুষ্ঠান করেছিলেন। মহাভারতের এই গল্পই বলে দেয়, বার্ধক্য আমাদের কাছে কতখানি ভয়ঙ্কর ও অনাকাঙ্ক্ষিত। কিন্তু  বয়স থেমে থাকে না। প্রতিটি দিনের সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে একটু একটু করে মানুষ বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যায়। শত চেষ্টা করেও শরীরের বার্ধক্য থামিয়ে রাখা যায় না।

অথচ মানুষ নিরন্তর চেষ্টা করে চলে নিজের বয়সকে অন্যের চোখে কমিয়ে দেখানোর। নিজের বয়স কমিয়ে ভাবতে বা বলতে আমরা ভালবাসি। অন্যের কাছ থেকে পাওয়া নানা প্রশংসার মধ্যে “বেশ বাচ্চা বাচ্চা লাগছে” বা “বয়স তো বোঝাই যাচ্ছে না” জাতীয় প্রশংসা বাক্য বোধহয় সবচেয়ে কাম্য ও উপভোগ্য। নিজের তুলনায় অন্যদেরকে বয়সে বড় ভাবতে বেশ ভালই লাগে। পরের বয়স ও পরের টাকা সবসময়ই নাকি মানুষ বেশি দেখে। আমরা সকলেই কমবেশি এমন বোধে ভুগি।

অন্যের চোখে নিজের বয়স লুকিয়ে রাখার প্রচেষ্টায় আমাদের কেটে যায় বহু সময়। চুলের কলপ থেকে অ্যান্টি এজিং ক্রিম সবই বয়স লুকোনোর মন্ত্র। অর্থাৎ আমরা সকলেই বৃদ্ধাবস্থাকে ভয় পাই। সাধারণত চল্লিশের পর থেকে মানুষের মনে বয়স্ক হয়ে যাওয়ার ভয় ঢুকে যায়। ধীরে ধীরে  পঞ্চাশ অতিক্রম করলেই এক ধরনের হতাশা আমাদের  গ্রাস করে। আর ষাট পার করলে তো কথাই নেই, মানুষ তখন  নিজের প্রতিই শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলে। চাকুরিজীবীরা অবসর গ্রহণের পরদিন থেকে নিজেকে অকিঞ্চিৎকর ভাবতে শুরু করেন।

আর সমাজও তাকে ধীরে ধীরে বাতিলের দলে ঠেলে দেয়। ‘পেনসন ভোগী’, ‘প্রবীণ নাগরিক’ ইত্যাদি শব্দগুলো ষাটোর্ধ্ব মানুষের মনে রীতিমতো পীড়া দেয়। ট্রেনে, বাসে, রাস্তাঘাটে অন্যের মুখ থেকে শোনা ‘কাকু’, ‘দাদু’, ‘মাসিমা’, ‘কাকিমা’ সম্বোধনগুলো মনকে আদৌ প্রীত করে না। এ সবের কারণ একটাই, ষাট বছরের পরের জীবন আমাদের কাছে অনুৎপাদক সময়। ষাট মানেই সমস্ত ইচ্ছের মৃত্যু, সব চাহিদার অবসান। কারও বয়স ষাটের কাছাকাছি বা ষাটোর্ধ্ব জেনে গেলেই আমরা তাঁদেরকে একটা আলাদা দলে ফেলে দিই। রেলের টিকিটের মূল্য কমিয়ে, বাসের সিটে বসার বাড়তি অধিকার দিয়ে আসলে তাঁদের কাছ থেকে জীবনের অধিকার কেড়ে নেয় সমাজ।

পুরুষদের ক্ষেত্রে বয়স্ক হওয়ার সীমাটা ৬০- ৬৫ বছর হলেও মেয়েদের ক্ষেত্রে এ সীমারেখা আরও অনেক কম। আগে তো মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল, মেয়েরা নাকি কুড়িতেই বুড়ি। বঙ্কিমচন্দ্র ঘোষণা করেছেন, “কুড়ি হইলেই তোমরা বুড়ী হইলে। অল্পদিনের মধ্যেই অঙ্গ সকল তোমাদের শিথিল হইয়া পড়ে। বয়স আসিয়া শীঘ্রই তোমাদের গলার লাবণ্যমালা ছিঁড়িয়া লয়। চল্লিশ পঁয়তাল্লিশে পুরুষের যে শ্রী থাকে, বিশ পঁচিশের ঊর্ধ্বে তোমাদিগের তা থাকে না।” (কমলাকান্তের দপ্তর, ‘স্ত্রীলোকের রূপ’ প্রবন্ধ)। বঙ্কিমচন্দ্রের কাল থেকে সময় এখন কিছুটা এগিয়েছে। মেয়েদের ক্ষেত্রে এখন বুড়ি হওয়ার বয়স সমাজের নিরিখে পঁয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চাশ; আর পুরুষদের ক্ষেত্রে ষাট থেকে পঁয়ষট্টি।

কিন্তু প্রশ্ন হল, বয়স মানুষের জীবনকে শাসন করবে কেন? কেন মানুষ তার অবসর জীবনকে উপভোগ না করে, কোনও বিশেষ কাজে না লাগিয়ে তাকে বোঝা বলে মনে করবে? সমাজ তাদের বাতিলের দলে ফেলে দেবে কেন? ইংরেজি বাগধারায় আছে, ‘ওল্ড ইজ গোল্ড’। মানুষ যত বয়স্ক হয়, তার বোধ, বুদ্ধি তত তীক্ষ্ণ হয়। অল্প বয়সের আবেগের তাড়না বা হঠকারী বুদ্ধি তার থাকে না। সবরকম পরিস্থিতিতে শান্ত-সংযত হয়ে কাজ করার ক্ষমতা বাড়ে। পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে চলার ক্ষমতা বাড়ে। তার অভিজ্ঞতার ঝুলি পূর্ণতর হয়ে ওঠে যা জীবনে নানা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।

সুতরাং বয়স হয়ে যাওয়া মানেই থেমে যাওয়া নয়; বরং এতদিন না মেটা শখগুলোকে পূর্ণ করে নেওয়ার পালা শুরু। ছোট বয়সে অর্থের অভাবে, সময়ের অভাবে বা পরিস্থিতির চাপে যা করতে পারা যায়নি, নতুন করে আবার সেগুলোকে শুরু করতে হবে। এ সময় কোনও কোর্সে ভর্তি হতে পারা যায়; নাচ, গান, অঙ্কন ইত্যাদি ললিতকলার চর্চা শুরু করা যায়, নতুন কোনও ব্যবসা শুরু করা যায়, প্রাণভরে পৃথিবী ঘোরা যায়, সমাজসেবার সঙ্গে যুক্ত হওয়া যায়। এককথায় নিজের খুশি মতো বাঁচা যায়। ‘আমরা যতদিন বাঁচি ততদিন শিখি’— কথাটি নিজের জীবনে প্রয়োগ করা যায়।

অনেকের ধারণা, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের ধারণ ক্ষমতা কমে যায়। কিন্তু এ ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। মস্তিষ্ক একটি পেশি এবং আধুনিক গবেষণা বলছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে শেখার কোনও দ্বন্দ্ব নেই। মস্তিষ্কে নতুন কোষ সৃষ্টি হয়েই চলে; সুতরাং নতুন কোনও জিনিস শেখা, আত্মস্থ করা বা সৃজন করার ক্ষেত্রে বয়সের কোনও নঞর্থক ভূমিকা নেই। একজন সত্তরোর্ধ্ব বিজ্ঞানী যদি নতুন আবিষ্কার করতে পারেন; একজন সত্তরোর্ধ্ব রাজনীতিবিদ যদি দেশের কর্ণধার হতে পারেন তাহলে আপনিও পারেন নিজের জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করতে। দামি উপহার যেমন যত্নে ব্যবহার করতে হয় তেমনি এই প্রৌঢ় বা বৃদ্ধ বয়সটাও আমাদের জীবনের দামি উপহার। অবসাদে না ভুগে জীবনের এই উপান্তকে উপভোগ করতে হবে। যথাযথভাবে এই জীবন আমাদের ব্যবহার করতে হবে। জীবনের এই দ্বিতীয় ইনিংস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জীবনের প্রথম ভাগের খেলাটা আমরা বুঝে ওঠার আগেই খেলতে শুরু করি এবং বেশিরভাগ সময়েই তা হাতের বাইরে চলে যায়। কিন্তু আমাদের দ্বিতীয় ইনিংসের এই খেলায় এক একটা দিন অত্যন্ত যত্ন নিয়ে, ধৈর্য ধরে খেলতে হবে। অত্যন্ত সফলভাবে সময়টাকে কাজে লাগাতে হবে।

লোকগল্পে শোনা যায়, মানুষ নাকি চল্লিশের পর থেকে গাধা, শকুন ইত্যাদি ইতর প্রাণীর জীবন ধার নিয়ে বাঁচে। কিন্তু এই জাতীয় ধ্যান-ধারণার দিন শেষ হয়েছে। সমাজে প্রচলিত জাতি-বর্ণ-লিঙ্গ ইত্যাদি নানা বৈষম্যের বিরুদ্ধে যেমন লড়াই চলছে, তেমনি বৃদ্ধ বয়সকে অবহেলার চোখে দেখার বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়াতে হবে। ষাট বছর মানে পূর্ণচ্ছেদ নয় বরং সেমি কোলন চিহ্ন; আর তারপরেই শুরু হোক আর এক রঙিন জীবন। যে জীবন চ্যালেঞ্জ নিতে ভয় পায় না, যে জীবন বিপ্লবের কথা বলতে  দ্বিধা করে না, যে জীবন করুণা নয় মানুষের সমীহ আদায় করে নেয়।

‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থে ‘কবির বয়স’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছেন, “কেশে আমার পাক ধরেছে বটে/তাহার পানে নজর এত কেন/ পাড়ার যত ছেলে এবং বুড়ো /সবার আমি এক বয়সী জেনো।” কবির মতো আমাদেরও বয়স নিয়ে ভাবলে চলবে না। পরকালের ডাক যখন আসার আসুক, তার আগে ইহকালটাকে সুন্দর করে উপভোগ করে নিতে হবে। মনে রাখতে হবে “এজ ইজ জাস্ট আ নাম্বার।”

(ফিচার ছবিটি গুগল থেকে নেওয়া)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here