রঞ্জন ভট্টাচার্য

বুড়িমা প্রতি বুধবার প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বর্হিবিভাগে আসতেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী মাত্র সাত দিনের ওষুধ পেতেন। এরকমই চলত প্রতি সপ্তাহ, মাস, বছর। তখন আমার চাকরি জীবনের সূত্রপাত। আমাকে প্রতি সপ্তাহে ওঁর রক্তচাপ মেপে দিতে হত। চিকিৎসা শেষে অশীতিপর ওই বৃদ্ধা আমাকে দিয়ে যেতেন একজোড়া হাঁসের ডিম আর এক গালে হামি। আমি তখন প্রায় তিনশোরও বেশি রোগী একা সামলে কিঞ্চিৎ বিরক্তই হতাম। তবু ছানি চোখে, লাঠি হাতে, ন্যুব্জ দেহে তাঁর ভালবাসার অত্যাচার চুপ করে মেনে নিতাম। এক বুধবার তিনি এলেন না। আমরা বর্হিবিভাগ শেষে তাঁর আসার রাস্তার দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলাম। শেষতক আর ধৈর্য না রাখতে পেরে এক ট্রেকার ভাড়া করে আমরা পৌঁছে গেলাম তাঁর জীর্ণ কুটিরে। মাটির দাওয়ায় এক খাটিয়ায় শুয়ে আমাদের বুড়িমা। জ্বরে তাঁর গা পুড়ে যাচ্ছে। যথোপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করে ফিরে এলাম। পরের বুধবার আবার জোড়া হাঁসের ডিম আর এক গালে হামি। আমরাও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে জীবনের ছন্দে ফিরলাম।

বিগত কয়েক বছরে চিকিৎসকেরা বিভিন্ন দাবিতে রাজপথে নেমেছেন। বিগত পাঁচ বছরে সারা দেশে চিকিৎসক নিগ্রহ, হাসপাতালের সম্পত্তি ভাঙচুর, সরকারি-বেসরকারি  ক্ষেত্রে তাণ্ডব আজ চিকিৎসকদের হতাশ, ক্রোধান্বিত এবং রক্ষণাত্মক করে তুলেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কিছুক্ষেত্রে পুলিশ ও প্রশাসনের নির্বাক দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া। এর মধ্যে নব্যতম সংযোজন ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশন। বিকেন্দ্রীকরণ থেকে পুনরায় কেন্দ্রীয়করণ এই রাজনৈতিক বাদানুবাদের ঘূর্ণিবতে পড়তে চাই না। কিন্তু ‘মিক্সোপ্যাথি’-র ককটেলে চুবিয়ে আপামর জনগণকে আফিমের নেশায় ডুবিয়ে কতদিন রাখা যাবে তাতে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। দু’মিনিটে জনপ্রিয় ফাস্টফুড তৈরি হতে পারে কিন্তু ব্রিজ কোর্সের সেতুবন্ধন করে দু’মাসে ডাক্তারি করতে গেলে সমূহ বিপদ।

আজও বেশিরভাগ গ্রামবাংলার প্রান্তিক সহায়-সম্বলহীন মানুষ চিকিৎসককে অগ্নীশ্বর বলে মনে করেন। রোগী-চিকিৎসক সম্পর্কের অবনমনের কারণ তাই বহুমাত্রিক। আসুন, সেগুলির উপর আলোকপাত করি। কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা রামের সুমতি গল্পে আমরা দেখছি, যখন বউদির জ্বর হয়, রাম তখন ডাক্তারকে শাসিয়ে আসে এবং ধমক দিয়ে বলে, ডাক্তার যেন ভাল ওষুধ দেন, নচেৎ তার পরিণাম ভাল হবে না। অর্থাৎ পেশায় বিচ্যূতি, ডাক্তারদের ধমকে সুচিকিৎসা আদায় করা ও বিফলে তাঁকে প্রহারেণ ধনঞ্জয় করা তা সমসাময়িক সাহিত্যরসে পরিপূর্ণতা পেয়েছিল।

মধ্যবিত্ত পরিবারে এখনও সংখ্যাগরিষ্ঠ বাবা-মায়েদের স্বপ্ন তাঁদের সন্তান ডাক্তার হোক। তার জন্য নবম শ্রেণি থেকেই শুরু হয় এক কঠিন প্রতিযোগিতা। কিন্তু আমাদের রাজ্যে মাত্র চার হাজার মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে পড়ার সুযোগ আছে। তাই প্রায় লক্ষাধিক অসফল পরিবারে নেমে আসে গভীর হতাশা। বেসরকারি ক্ষেত্রে পড়াশোনার খরচ ও অনিয়মে বোপিত হয় অবিশ্বাসের প্রথম বীজ। রোগ-ব্যাধি ও জরাকালের অমোঘ নিয়মে সকলের জীবনে কখনও না কখনও সমস্যা নেমে আসবেই। অসুস্থ অবস্থায় প্রথমেই মনে পড়ে নিজের মা-কে আর তারপরে ঈশ্বরকে। আদি-অনন্তকাল ধরে মানুষ ডাক্তারকে ঈশ্বর প্রেরিত দূত হিসেবে মনে করেন। তাই ঈশ্বর আর ডাক্তারের বিচ্যূতি মেনে নেওয়া অসম্ভব। কিন্ত রাশিবিজ্ঞানের তত্ত্ব অনুযায়ী, সব অসুখ সারবে না আর মানুষ এখনও অমরত্ব লাভ করেনি।

তাহলে কি সব মৃত্যুর জন্যই কি ভুল চিকিৎসা দায়ী? স্বজন হারানোর বেদনার তাৎক্ষণিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশে আর সীমাবদ্ধ নেই এই সমস্যা। ক্রেতা সুরক্ষা দফতর, নিয়ামক সংস্থা মেডিক্যাল কাউন্সিল ও মামলা মোকদ্দমার ফলশ্রুতিতে চিকিৎসকেরাও আর অ্যাপোলো, হিপোক্রেটিস, এস্কুলেপিয়াস, প্যানাসিয়া, হাইজিয়া, চরক বা সুশ্রুতের আসনে আসীন নেই। বরঞ্চ ধীরে ধীরে তাঁরা গণশত্রুতে  রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছেন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সরকারি হাসপাতালের ক্রমবর্ধমান রোগীর চাপ আর বেসরকারি ক্ষেত্রে চিকিৎসা খরচের মানসিক চাপ। মুদ্রার অপর পিঠে অর্থাৎ রোগী ও তার পরিবারের মনস্তাত্ত্বিক দিকটিও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে প্রধান ও সর্বজনীন অভিযোগ, তাঁদের ব্যবহার মানবিক নয়। রোগীর পরিজনেরা যখন রোগ বা রোগীর অবস্থা সম্পর্কে জানতে চান তখন ব্যস্ততা আর ক্লান্তির কারণে চিকিৎসকেরা দুর্ব্যবহার করেন এটা অনেকেরই অভিযোগ। রোগীর পরিজনকে স্বল্পবাক্যে মিষ্টভাষী হয়ে রোগ ও চিকিৎসা সম্পর্কে সম্যক অবহিত করা একটা কলা ও দক্ষতা, যার মধ্যে বিজ্ঞান বা বাণিজ্যের কোনও স্থান নেই। সমীক্ষায় প্রকাশ, যে চিকিৎসকেরা তাঁদের রোগীকে বেশি সময় দেন তাঁরা এক বিশেষ আত্মিক বন্ধনে রোগীর সঙ্গে আবদ্ধ হন এবং তা দ্রুত রোগ নিরাময়ের পথ সুগম করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকায় আমাদের এই উপমহাদেশে চিকিৎসক-রোগীর যে অনুপাত হওয়া উচিত তা তুলনায় আশাব্যঞ্জক নয়,  অর্থাৎ আমরা অনেক পিছিয়ে।

তাই সরকারি হাসপাতালের বর্হিবিভাগে রোজ চারশোরও বেশি রোগী দেখে যেমন চিকিৎসকরা ধৈর্যচ্যূত হন তেমনি হতদরিদ্র প্রান্তিক স্থান থেকে আসা অসুস্থ মানুষটি দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষায় থাকতে থাকতে তাঁর পুঞ্জীভূত ক্ষোভ উগরে দেন চিকিৎসকের উপরে। এরমধ্যে আগুনে ঘৃতাহুতি দেওয়ার জন্য প্রস্তত থাকে মধ্যস্থতাকারী চক্র। রোগীরা তাদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হন আর মুণ্ডপাত করেন ডাক্তারদের। কী সাবলীল ভঙ্গিতে মধ্যস্থতাকারীরা মিশে যায় রোগীর পরিবারের সঙ্গে তা এক বিস্ময়!

সদ্য পাশ করা জুনিয়র ডাক্তারদের কর্মজীবনের শুরুতেই পড়তে হয় পাহাড়প্রমাণ চাপের মুখে। হরিণ শাবককে জঙ্গলে  অরক্ষিত ছেড়ে দিলে যে অবস্থা হয় আমাদের ইন্টার্ন-হাউস স্টাফের অবস্থা অনেকটা সেরকমই। প্রতি ছয় মিনিটে ওভার শেষ হওয়ার মতো একটি করে নতুন রোগী ভর্তি আর জুনিয়র ডাক্তারদের এক ওয়ার্ড থেকে আর এক ওয়ার্ডে হাঁপানি, হার্ট অ্যাটাক, হিস্টিরিয়া রোগী সামলাতে গিয়ে ওয়াক-ওভার দেওয়ার মতো অবস্থা। তার সঙ্গে এই কোভিডকালীন রোগী দেখার চাপ। দৈনিক তিন চার জন করে চিকিৎসকের মৃত্যুমিছিল লেগেই আছে, মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষা থেকে লড়াকু চিকিৎসক নেতা, কেউই বাদ নেই। কমবেশি ৮০ জন চিকিৎসক ইতিমধ্যেই আমাদের রাজ্যে করোনায় বলি হয়েছেন।

টানা চব্বিশ ঘণ্টারও বেশি সদাসতর্ক অবস্থায় কর্মরত থাকার ফলে তাঁদের জীবনীশক্তি নিঃশেষিত হয়ে পড়ে। তখনই ঘটে ভুলভ্রান্তি আর দুর্ব্যবহারের সমূহ সম্ভাবনা। বেসরকারি ক্ষেত্রে সমস্যা ট্যাক্সির মিটারের মতো বিল যার আনুমানিক পাঁচ থেকে দশ শতাংশ পান চিকিৎসক আর বাকিটা যায় নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষের কাছে। কিন্তু রোগীর পরিজনের পকেট হালকা হওয়ার জন্য একমাত্র দোষী সাব্যস্ত হন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক। বেসরকারি ক্ষেত্রে নিন্দুকেরা যে অভিযোগ করেন নার্সিংহোমের বিল আর ডাক্তারের পসার সমানুপাতিক তা সর্বাংশে মিথ্যা নয়। কিন্তু সব পেশাতেই যেমন কালো ভেড়া থাকে চিকিৎসা পেশাও তার ব্যতিক্রম নয় এবং রাশিবিজ্ঞানের গণনায় এই বিচ্যূতি আপাতগ্রাহ্য নয়। বেসরকারি ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ছোট-মেজ-বড় কর্মকর্তা যাঁরা থাকেন তাঁদের অতিসক্রিয়তা এবং চিকিৎসাক্ষেত্রে মধ্যস্থতা বেশিরভাগ সময় ব্যক্তি-স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে। এর ফলে একাধারে খরচ বাড়ে এবং চিকিৎসার মানও পড়ে যায়। তার উপরে চিকিৎসকদের প্রতি বিশ্বাসভঙ্গতার কারণে এখন কোনও চিকিৎসক আর অগ্নীশ্বর হওয়ার চেষ্টা করেন না।

তবে এ কথা অনস্বীকার্য বেসরকারি ক্ষেত্রে বর্হিবিভাগীয় পরিষেবা সরকারি ক্ষেত্রের তুলনায় বহু যোজন পিছিয়ে থাকলেও অর্ন্তবিভাগীয় চিকিৎসার মানে কিছুটা হলেও এগিয়ে। রোগী ও স্বাস্থ্যপ্রদানকারীর অনুপাত এ ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত স্বাস্থ্যকর। সরকারি ক্ষেত্র ছেড়ে অনেক আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসকেরা কিন্তু এখনও বেসরকারি ক্ষেত্রে চিকিৎসার অশ্বমেধের ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছেন। আমাদের রাজ্যের চিকিৎসক মহলের ক্ষোভ একটাই, তাঁরা বিশ্বে বন্দিত আর বঙ্গে নিন্দিত।

তাহলে সমাধান কী? একহাতে যেমনি করতালি দেওয়া যায় না, তেমনি এই দ্বন্দ্ব অবসানে উভয়পক্ষকেই কিছুটা নমনীয় হতে হবে। দাম্পত্যজীবনের টানাপড়েনের মতোই চিকিৎসক-রোগীর অম্লমধুর সম্পর্ক চিরকালই চড়াই-উতরাই পথে এগিয়ে চলবে। অসহিষ্ণুতা ও অবিশ্বাস বিসর্জন দিয়ে উভয় পক্ষকেই আরও পরিণত ও দায়িত্ববান হতে হবে। বিশল্যকরণী বা মকরধ্বজের সন্ধান যতই নেটিজেনরা করুন না কেন সর্বকার্যহিতায়েষু মহৌষধ বা প্রফেসর শঙ্কুর মতো কোনও বটিকা ইন্ডিকা এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। তাই দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের গূঢ় তত্ত্ব অনুধাবনের মতোই আমাদের মুখোমুখি  বসতেই হবে। চিকিৎসার এথিক্সের যে চারটি মূল স্তম্ভ, যথা রোগীর উপকারের যথাসম্ভব প্রচেষ্টা করা (Beneficence), কোনওভাবে রোগীর ক্ষতি না হওয়ার অঙ্গীকার করা (Non-maleficence), রোগীর নিজস্ব পছন্দ বা স্বাধীনতা হরণ না করা (Autonomy) আর সর্বোপরি রোগীকে সুবিচার করা (Justice); এগুলি সঠিক ভাবে পালন করতে কোনও চিকিৎসকই যেন বিস্মৃত না হন। অন্যদিকে রোগী ও তার পরিবারকেও লক্ষ্য রাখতে হবে যেন তারা ‘নীতিপুলিশ’ হয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে চিকিৎসক হেনস্থা না করেন ও হাসপাতালের সম্পত্তি ভাঙচুর না করেন। আসুন, আমরা পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মর্যাদা বজায় রেখে কাজ করি, কোভিড যুদ্ধে জয়ী হই, মাস্ক ও হাতশুদ্ধির ব্যবহার করি, শারীরিক দূরত্ব বাড়াই কিন্তু মানসিক ব্যবধান কমাই।

(লেখক মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। মতামত ব্যক্তিগত। ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here