সায়ন্তন দত্ত

চারপাশে শুধু ধ্বংস আর ধ্বংস। সাধের স্মার্টফোনে সোশ্যাল মিডিয়া, আর টাইমলাইন খুললেই একের পর এক ধ্বংসের ছবি। কোথাও কাকদ্বীপ–সুন্দরবনে স্বজনহারা, ঘরহারা, সর্বহারা মানুষের ছবি, কখনও বা ধ্বংসস্তুপ। কোথাও মাইলের পর মাইল হাঁটতে হাঁটতে, স্রেফ হাঁটতে হাঁটতেই মরে যাওয়া আমার দেশের মানুষের মৃত্যু মিছিল। প্রায়ই নিউজফিডে আসে লকডাউনে জীবিকা হারিয়ে শেষ সম্বলটুকুও খুইয়ে হেরে যাওয়া মানুষের আত্মহত্যার ছবি। খবরের কাগজ, টিভি সবেতেই শুধু এক এক এক ছবি— হাহাকার, মৃত্যু, ধ্বংস।

আমরা যারা প্রিভিলেজড, মধ্যবিত্ত-উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারে স্রেফ ঘটনাচক্রে জন্মে গিয়েছি এবং সংবেদনশীল, তাঁদের অনেকের কাছেই এমন সময় অদ্ভুত এক অসহায়তা ঘিরে রাখে। চোখের সামনে মৃত্যুমিছিল আর ধ্বংসলীলা চলছে, অথচ কিছু জায়গায় অর্থনৈতিক সাহায্য করা আর কেউ কেউ যাঁরা রিলিফের কাজ করেন, তার বাইরে আর কিছুই করার নেই। তাও, বলা বাহুল্য, প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল। দিনের বেশিরভাগ সময়টা নিজের বিবেকের দিকে তাকিয়ে কেটে যায়। লকডাউন ‘জীবন’ থেকে একরকম বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। শুধু চার দেওয়ালের মধ্যে খাওয়া আর ঘুমানো, খাওয়া আর ঘুমানো। এর বাইরে ‘জীবন’ বলতে যে অজস্র মুহূর্তের সমাহার স্বাভাবিক সময়ে আমাদের ঘিরে রাখে, তা এখনকার সময়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন। একলা পথে হাঁটা নেই, ভিড় ট্রেনে যেতে যেতে কোনও একলা মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা নেই, কলেজের ক্লাস শেষে রোজকার খাওয়ার দোকানের দাদা-দিদি-মাসিদের সঙ্গে দুটো কথা নেই, সারাদিন এক, এক, এবং একই রুটিন।

এমন অবস্থায়, অন্য অনেকের মতোই আমার একমাত্র অবলম্বন হয়ে উঠেছে শিল্প। কানে হেডফোন গুঁজে কোনও সুর নিয়ে আর চোখের অন্ধকারে চুপচাপ কিছু সময় কাটিয়ে দেওয়া, ঘর অন্ধকারে ইমেজ-সাউন্ডের দুনিয়ায় হারিয়ে যাওয়া বা সাদা কাগজে অক্ষরের ভিড়ে জীবন খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা ছাড়া এখন আর বিশেষ কিছুই করার নেই। এ ভাবেই দিনভর ক্লান্ত লাগে, মানসিক অবসাদ ঘিরে ধরে। আর তার মাঝেই শিল্পের আশ্রয়ে একটা একটা করে একঘেয়ে দিন কাটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে যাই।

যখন সোশ্যাল মিডিয়া বা নিউজ খুললেই শুধু ধ্বংস, হাহাকার আর মৃত্যুর ছবি, তখন শিল্পে ডিস্টোপিক, ডার্ক জগৎ দেখতে ইদানিং আমার বেশ অসুবিধা হচ্ছে। এমনিতে একধরনের ডিস্টোপিয়া সিনেমা-সিরিজের জগতে প্রচলিত হয়ে গিয়েছে, যেখানে ‘স্বাভাবিক’ জীবন থেকে ক্রমশঃ একধরণের অন্ধকারময় জগতে গল্প বদলাতে থাকে। উপরিতলের মিঠে বাস্তবকে খুঁড়ে অন্তঃস্থলের ক্লেদ প্রকাশ করতে পারে শিল্প, পৃথিবীর ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ সিনেমা-সাহিত্য-পেইন্টিং এই পরিকল্পে কাজ করে, কাজ করেছে। আপাত ভাবে পশ্চিম ইউরোপীয় ‘মর্ডানিজম’-এর বোধজগতের সরাসরি বা ঘুরিয়ে রিসেপশন মূলধারার শিল্পে আজকাল হামেশাই দেখা যায়। ঐতিহাসিকভাবে এই ধরনের শিল্পের, অন্তত পশ্চিম ইউরোপীয় মর্ডানিজমের মূল্য অসীম। কিন্তু আমার ইদানিংকালে সুররিয়ালিস্টদের পুরোধা আন্দ্রে বেঁতের কথা বারবার মনে পড়ে, যে কথা বুনুয়েল তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন। সুররিয়ালিস্টদের যে মূল প্রকল্প, বাস্তবকে দুমড়ে মুচড়ে এক ধরনের বিবমিষাময় হিংস্র পরাবাস্তব জগৎ তৈরি করা যা মানুষের চেতনায় ধাক্কা দেবে; আন্দ্রে বেঁতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে বুনুয়েলকে অসহায় প্রশ্ন করেছিলেন, বাস্তবের পৃথিবীতে যে ভায়োলেন্স মানুষ দেখছেন, আমাদের শিল্পের পৃথিবী কি তাকে কখনও ছাপিয়ে যেতে পারে? বাস্তবের এই ভায়োলেন্সের সামনে দাঁড়িয়ে আর কীভাবে মানুষকে বিরক্ত করতে পারব আমরা?

একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকের শেষে আমরা আর ভায়োলেন্স শুধু টিভির পর্দায় বা খবরের কাগজে দেখি না, আমাদের হাতের স্মার্টফোন আর ফেসবুকের নিউজফিড ভায়োলেন্সকে আমাদের নিত্যসঙ্গী করে তুলেছে। ঘুম থেকে উঠে ফেসবুক খুলতেই হয়তো দেখে ফেলছি কুয়োয় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করা, না খেতে পাওয়া মানুষের ছবি বা ট্রেনলাইনে ঘুমিয়ে থাকা মানুষের ছিন্নভিন্ন মৃতদেহ আর পড়ে থাকা অবশেষের ছবি। আজকের পৃথিবীতে কোন শিল্প আছে যা বাস্তবের অতিরিক্ত জগৎ তৈরি করে বাস্তবের চেয়েও বেশি বিরক্ত করবে আমাদের? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ডিজিটাল মিডিয়া ছিল না, মানুষ এ ভাবে সারাদিন স্মার্টফোনে নিত্যসম্প্রচার দেখতেন না। দুনিয়ার কোনও শিল্পের ক্ষমতা নেই তার নিজের জগৎ তৈরি করে ফেসবুকের নিউজফিডের মতো হিংস্র ইমেজ মানুষকে দেখিয়ে যেতে। মনে রাখা দরকার আমরা আফরাজুলের মৃত্যুর খবর শুধু পাইনি, জ্বলন্ত আফরাজুলকে দাউদাউ করে ভিডিয়োয় পুড়তে দেখেছি। আমাদের চোখ চিরে দৃষ্টি জাগ্রত করার জন্য আর কোনও বুনুয়েল বা আঁ শিয়েন আন্দালু’র প্রয়োজন হয় না।

এমন অস্থির অবস্থায় শিল্প কী করতে পারে? এই বাস্তব থেকে পালিয়ে গিয়ে অন্য কোনও কাল্পনিক ফাঁপা জগৎ তৈরি করতে পারে। কিন্তু যে শিল্পের ফাঁপা মিষ্টত্বকে কাউন্টার করেই আমাদের পছন্দের কালো, অন্ধকার প্যারাডিমের শিল্প শুরু হয়েছিল। কিন্তু বাস্তব এবং বাস্তবের ইমেজই যখন সেই শিল্পের তুলনায় কয়েকশো গুণ কালো এবং অন্ধকার, তখন শিল্প কী করবে? যে মানুষ শিল্প ছাড়া বাঁচতে জানেন না তাঁর কাছে শিল্প এই মুহূর্তে কী নিয়ে আসবে?

এই প্রশ্নের কোনও স্পষ্ট উত্তর নেই। এ উত্তর হয়তো আমরা সবাই নিজের মতো অল্পবিস্তর খুঁজে চলেছি। জানি, আমি ব্যক্তিগত ভাবে শিল্পের কাছে এখন আশ্রয় চাই, দগদগে মনে খানিক হাত বুলিয়ে দেওয়া চাই, খানিক আশ্বাস চাই যে সবকিছু পেরিয়ে তবুও যদি কয়েক ফোঁটা জীবন বেঁচে থাকে। আর আমি জানি, এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে নিখুঁত এবং আন্তরিক ভাবে, অন্তত আমার জন্য এ কাজ করেন আব্বাস কিয়ারস্তামি। গত কয়েকদিনের নিরন্তর মিডিয়া আর খবরের কাগজে ধ্বংসের ছবি দেখে যাওয়ার পরে আব্বাস কিয়ারোস্তামির একটি ছবি ফিরে দেখে চার দেওয়ালের মধ্যে যেন একটুকরো জীবনের সাধ পেলাম। অনেক, অনেকদিন পর।

যাঁরা আব্বাসের কাজের সঙ্গে পরিচিত, তাঁরা জানেন আব্বাস গত শতকের নব্বই দশকে ইরানের ককার অঞ্চলটিতে খানপাঁচেক ছবি করেন। তার মধ্যে প্রথম তিনটি কোকের ট্রিলজি হিসেবে পরিচিত। প্রথম ছবি ‘হোয়ার ইজ মাই ফ্রেন্ড’স হোম’ ১৯৮৭ সালে তৈরি হয়, তার বছর তিনেক পরে এই অঞ্চলে ভয়াবহ একটি ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটে যেখানে প্রায় তিরিশ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটে। আব্বাস সেই ভূমিকম্পের কয়েকদিন পরেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন ওঁর আগের ছবির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করা বাচ্চা ছেলেটিকে খুঁজে বের করতে। আর তাঁর এই যাত্রাপথে ফিল্ম করতে করতে চলেন, তাঁর চরিত্রে অন্য এক অভিনেতাকে বসিয়ে। আব্বাসের বেশিরভাগ ছবি যেমন হয়, এখানেও তেমন গল্পের ছুতো একটি থাকে, আগের ছবির নায়ক আহমেদকে খুঁজে বের করা। কিন্তু এটুকুই, ছবিটি গল্পকে ধাওয়া করে ধ্বংসস্তুপকে ফিকশনাল বিশ্বে পরিণত করে না, বরং সেই ধ্বংসের মাঝে আটকে পড়া, কোনওক্রমে বেঁচে যাওয়া মানুষের সামনে এসে চুপটি করে দাঁড়ায়, তাঁদের কথা শুনতে চায়। গোটা ছবি জুড়ে আমরা দেখতে থাকি, সব হারিয়ে লড়াই করতে থাকা গ্রামের মানুষদের ছবি। তাঁদের টুকরো টুকরো গল্প গেঁথে ছবিটি তৈরি হয়। ছবি বলে, শিল্প বলেই নিউজ মিডিয়া বা টাইমলাইনের মত ‘খবর’এ সীমাবদ্ধ থাকেন না ওঁরা, শিল্পের ক্যানভাসে সত্যিকারের জীবন গড়ে উঠতে থাকে। ছবির শেষে আভাস থাকে হয়তো আহমেদকে খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু তাঁর আগেই রাস্তায়, ভেঙে পড়া বাড়িতে, ধ্বংস্তুপে লড়তে থাকা অজস্র আহমেদকে দেখতে পাই আমরা।

এই ছবিটির অবিস্মরণীয় বৈশিষ্ট এখানেই, স্থানীয় মানুষদের দ্বারা অভিনীত চরিত্রগুলো যেভাবে সেই ধ্বংসের মধ্যে জীবনকে আঁকড়ে ধরে থাকে। কেউ কমোড হাতে হাঁটতে হাঁটতে আমাদের গল্প শোনান, কেন এই পরিস্থিতিতেও যাঁরা বেঁচে আছে তাঁদের জন্য কমোড অত্যন্ত জরুরি একটি জিনিস।  অল্পবয়সী একটি ছেলে ভূমিকম্পের পরের রাতে বিয়ে করে আমাদের বলে, ওর পরিবারের সবাই প্রায় মরে গিয়েছে, আর কেউ নেই ওর; তাই এই অবস্থায় কিছুদিন পরে বিয়ের দিন ঠিক থাকলেও সে আগেই বিয়ে সেরে ফেলে, তাঁর সদ্যবিবাহিত প্রেমিকাকে নিয়ে জীবন খুঁজে নেওয়া আর একটু সুবিধের হবে বলে। হাহাকার করা ধ্বংসস্তুপের মধ্যে এহেন নাছোড় ঘর বাঁধার পরিকল্পনা দেখে আমাদের চোখে জল চলে আসে, আমরা বুঝতে পারি না, কোনটা আসল সত্যি, এক মুহূর্তে ধ্বংস হয়ে যাওয়া গোটা গ্রাম নাকি প্রাণপণে জীবন খুঁজতে থাকা আল্লার প্রতি বিশ্বাসে অটল এই সাধারণ মানুষ।

ছবির প্রায় ক্লাইম্যাকটিক মুহূর্ত আসে তাঁবু খাটিয়ে কোনওক্রমে দিন গুজরান করা কিছু মানুষের অ্যান্টেনা ঠিক করতে করতে টিভিতে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখার চেষ্টায়। কয়েকটি গ্রামের কিছু মানুষ যাঁরা কোনওক্রমে বেঁচে আছেন, তাঁরা সেই অবস্থাতেও যখন বিশ্বকাপ ফুটবল মিস করতে চান না, তখন দর্শকের হয়ে প্রধান চরিত্র অভিনয় করা ফারহাদ যেন প্রশ্ন করেই ফেলেন, আচ্ছা, এই অবস্থাতেও তোমরা খেলা দেখবে? একগাল হেসে অল্পবয়স্ক ছেলেটি উত্তর দেয়, কী করব বলুন, ভূমিকম্পে আমার বাড়ির সবাই মরে গিয়েছে। তবুও তো বিশ্বকাপ চার বছরে একবারের বেশি আসবে না, যাইহোক না কেন, জীবন তো বহমান।

নিরন্তর ধ্বংসস্তুপের মধ্যে দাঁড়িয়ে ২০২০ সালের ভারতবর্ষে এই মানুষগুলোকে দেখতে দেখতে আমি শিউরে উঠি। ভাবি আমাদের মধ্যে কোনও আব্বাস নেই কেন, যিনি এই সময়ে সুন্দরবন-কাকদ্বীপ দিয়ে খুঁজে নিতে চান এমন কত শত মানুষের গল্প! চতুর্দিকে ধ্বংসস্তুপের মধ্যে দাঁড়িয়ে এই ছবিটির তুচ্ছ, কঠোর বাস্তব এক লহমায় অলৌকিক. হয়ে ওঠে যেন, যেখানকার বাসিন্দারা বাস্তবের ধ্বংস পেরিয়ে জীবন খুঁজে চলেছেন। আর নিজেরা বারবার বলতে পারছেন, মৃত্যু তো খোদার ইচ্ছে, আসলে জীবনটাই বহমান। ছবিতে একটি সংলাপ ফিরে ফিরে আসে, মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন যাঁরা তাঁরা জীবনকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন। কারও তুচ্ছ কমোড, কারও একটি ল্যাম্পশেড, কারও বা সদ্য শুরু হওয়া দাম্পত্যজীবন আর কারও বা দু’ঘণ্টার ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ। জীবনকে ফের আঁকড়ে ধরার জন্য এটুকুই যথেষ্ট হবে। আর আব্বাস ছবি বানিয়ে যাবেন। যে ছবি আসলে ছবি বলেই বাধ্য হয়ে শেষ হয়ে যাবে কোনও এক সময়ে। ছবির শেষে জীবন, শুধুই জীবন পড়ে থাকবে। ২০২০ সালের কলকাতায় আমফান-করোনার ধ্বংসস্তুপে আমাদের বাংলা সিনেমা নেই তো কী, আব্বাস কিয়ারোস্তামি আছেন।

(লেখক যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম স্টাডিজ-এর পড়ুয়া। ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)