কবীর সুমন

প্রথমত স্বাভাবিক ভাবেই লোকে যা বলে আমি তা বলতে চাইছি না যে, আমি খুব মর্মাহত, শোকাহত। আমি তা বলব না। মানুষ আসে, মানুষকে যেতেও হয়। অনেকদিন ওঁর সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু তা হলেও মনে হত কোথাও একজন অভিভাবক আছেন। তিনি চলে গেলেন।

আমি তো কোথাও একজন একবগ্গা, এককাট্টা, একগুঁয়ে সঙ্গীতের লোক। তখন আমেরিকায় ভয়েস অফ আমেরিকার চাকরি করছি। ওয়াশিংটন ডিসিতে। তখন আমার বয়স বত্রিশ-তেত্রিশ হবে, বড়জোর চৌত্রিশ। সেই সময় আমি বাংলা বিভাগের কর্মী ছিলাম। সেখানে আনন্দবাজার পত্রিকা রাখা হত। একদিন একটি পত্রিকায় দেখলাম, আধুনিক বাংলা গানের উপর সুধীর চক্রবর্তীর একটি লেখা। তিনি লিখেছিলেন, আধুনিক গানের কাছে বাঙালির আর কোনও প্রত্যাশা নেই।

কথাটা যে কত সত্যি, আমি জানতাম। নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই জানতাম। কিন্তু তখনও সুধীরবাবুর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়নি। আর একটি কথা হচ্ছে, ওই সময়ে সুধীর চক্রবর্তীর লেখা কোনও বই আমি পড়িনি। এরপর চাকরি ছেড়ে কলকাতায় ফিরলাম। আধুনিক বাংলা গান বাঁধার চেষ্টা করব ভেবেই ফিরেছি। তারপরে যদিও সব পয়সা খরচ হয়ে গেল। মুশকিলে পড়ে আমি আবার ভয়েস অফ জার্মানিতে গেলাম। কিন্তু আমার সেই একবগ্গা পণটা থেকেই গিয়েছিল। এরপর আবার চাকরি ছেড়ে ফিরলাম। যদিও আমি ইচ্ছে করলেই অন্য কোনও দেশের বাংলা বিভাগে কাজ পেয়ে যেতাম।  তখন আমার প্রায় চল্লিশ বছর বয়স। এইরকম সময়ে আমি বাংলা গানই করব এবং করলাম। এই যে করলাম, এর মধ‌্যে দিয়েই সুধীর চক্রবর্তীর সঙ্গে আমার পরিচয় হল।

‘তোমাকে চাই’ যখন বেরলো তখন দেখলাম, এক জায়গায় সুধীর চক্রবর্তী লিখেছেন,  ‘কতদিন পর বাঙালি আবার গানের শুশ্রূষা পেল’। এই যে কথাটা বলছি, আমার বুকের ভেতরটা কেমন করছে।  আমারও ৭২ বছর বয়স হয়ে গেল। আমিও বাঁশি শুনছি,  আমি নদীটাকে দেখতে পাচ্ছি, আমার জন্য একটা নৌকো রয়েছে, আমি দেখতে পাচ্ছি। আমারও সময় এগিয়ে এল। সুধীরবাবু চলে গেলেন। আমি ওঁকে সুধীরবাবু বলতাম, উনি আমায় সুমন বলতেন। ‘কতদিন পর বাঙালি আবার গানের শুশ্রূষা পেল’— এই কথাটা বলতে একজন সুধীর চক্রবর্তীকে লাগে। গান একজনের কাছে কতটা জরুরি হলে একজন বাঙালি হিসেবে এই কথাটি একজন লিখতে পারেন। কই, আর তো কেউ লেখেননি। সুধীরবাবু কিন্তু তখনও আমাকে ব্যক্তিগত ভাবে চেনেন না।

এরপরে সুধীরবাবু একদিন একটি ছোট চিঠি লিখে আমাদের ভবানীপুরের বাড়িতে এসে হাজির। তিনি একজন প্রাজ্ঞ, শান্ত মানুষ। আমাকে বললেন, ‘‘দেখুন, আমার তো বয়স হয়েছে। আপনার চেয়ে বয়সে একটু বড় আমি। আপনার বাড়ি আমি এসে উপস্থিত হয়েছি।  এই অঞ্চলে আমাকে আসতে হয়। এখনও মাস দুই-তিন আসতে হবে। প্রতি শনিবার আপনাদের যদি অসুবিধা না হয়,  দুপুরে আমি এসে আপনার কাছে খাব।’’ তখন আমাদের বসার জায়গা ছিল মাটিতেই। খাওয়াদাওয়ার পরে আমাদের অনেক গল্প হত। সেই সময় তিনি আমাকে একটি প্রস্তাব দেন। বলেন, ‘‘সুমনবাবু, আপনি যে গান লেখেন, গানের মুহূর্তগুলি একেবারে আলাদা। আপনার মতো কেউ আসেনি এর আগে। সোজা কথা আমি আপনাকে বলছি। এটা বলতে বাঙালির বুক ফেটে যাবে।  আপনার মতো কেউ আসেনি এবং কেউ ভাবতেও পারেনি। আমিও ভাবতে পারিনি। এ রকম হয়, আমি জানতাম না। আমি আপনার পরপর দুটো অ‌্যালবাম শুনলাম তো! এটা সম্ভব না। আপনি অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। এখানেই আপনার কাছে আমার একটা দাবি, আপনি তো গান পয়সা করার জন‌্য করছেন না, আপনি গান তৈরি করছেন মুহূর্ত ধরে ধরে। এই মুহূর্ত ধরেই একটা বই দিতে পারবেন?’’

এ বার তিনি আমাকে যা বললেন তা আমিও ভাবতে পারিনি। তিনি বললেন, ‘‘জানেন, আমি কিঞ্চিৎ লেখালিখি করি, লেখাপড়াও করেছি কিঞ্চিৎ, কিন্তু সত‌্যিই আমি যেটা জানি তা হচ্ছে পাবলিকেশন। আমি হলাম, এক স্বপ্নের প্রকাশক। আমি গ্রন্থ প্রকাশনা জিনিসটা যেরকম বুঝি, আমাদের দেশে খুব কম লোক বোঝে। আমার ধ্রুবপদ নামে একটা ছোটো প্রকাশনী আছে। আপনি যদি অনুগ্রহ করে আমাকে একটি বই দেন, আমি এই বইটি এমন ভাবে করব, যেরকম এর আগে কেউ দেখেনি। লম্বা ধরনের একটা বই করব। তার একদিকে আপনার গান থাকবে। অন্যদিকে থাকবে গান রচনার মুহূর্ত ও প্রস্তুতি। এটা যদি আপনি আমাকে প্রস্তুত করে দেন এবং গানের যদি স্বরলিপির মতো করে দেন, তবে একটা নতুন কাজ হয় বাংলায় এবং ভারতে।’’

আমি খুব সাগ্রহে দিলাম। তিনি ‘সুমনের গান, সুমনের ভাষ‌্য’ বলে একটি বই করলেন। বইটি লম্বাটে। তিনি বললেন, ‘‘আপনি যেমন আলাদা, আপনার গান যেমন আলাদা, আপনার অনুষ্ঠান যেমন আলাদা, তেমন আপনার প্রথম লেখাটাও আলাদা হবে। এই একটি অনবদ‌্য কাজ তিনি ইনিশিয়েট করলেন।’’ তিনি বলেছিলেন, ‘‘প্রকাশকদের সঙ্গে অনেকসময় টাকা নিয়ে সমস্যা হয়। আমিও বোধহয় আপনাকে সবটা দিয়ে উঠতে পারব না। প্রথমেই সেই জন‌্য আমি আপনাকে কিছু টাকা দিয়ে রাখতে চাই।’’ তিনি আমাকে টাকা দিলেন। এ ভাবেই ওঁর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা শুরু হল। এবং তিনি একটি অনবদ‌্য কাজ করলেন।

ওই বইটি হইহই করে শেষ হয়ে যায় বইমেলাতেই। একটি সংস্করণের পরে ধ্রুবপদ বইটি আর বের করেনি। পরে আবার আর এক প্রকাশক সপ্তর্ষি সুধীরবাবুর অনুমতি নিয়েই বইটি বের করে। সেই বইটিও দারুণ বিক্রি হয়। কিন্তু আইডিয়াটা সুধীর চক্রবর্তী মহাশয়ের। গানভাষ‌্য এই আইডিয়াটা সম্পূর্ণ ওঁর। এরপর নানা সময়ে ওঁর সঙ্গে কথা হয়েছে এবং জানতে পেরেছি যে, সুধীরবাবু প্রকৃত অর্থে একজন শিকড় খোঁজা মানুষ। তিনি শিকড় খোঁজেন এবং তা নিয়ে কোনও গরিমা নেই। তিনি মানুষকে সামনে নিয়ে আসেন তার শিকড় সমেত। তিনি আমার কাছে গল্প বলেছেন, যেগুলি তিনি ঘুরে ঘুরে খুঁড়তেন। তথ‌্য খুঁড়ে বের করে আমাকে বলেছেন তাঁর গল্প। বলেছেন,  ‘‘আমি একাধিক ঘটনা জানি, নিঃসন্তান হিন্দু গ্রামবাসী মারা গিয়েছেন। তাঁর দাহ করেছেন সেই মুসলমান প্রতিবেশীরাই। এ রকম অজস্র ঘটনা ঘটেছে।’’ ওই দু’-তিন মাস তাঁর সান্নিধ‌্য আমার কাছে ছিল ‘গল্পদাদার আসর’। বসে বসে দু’-তিন ঘণ্টা স্রেফ নিমেষেই কেটে যেত।

আমাকে একদিন তিনি বললেন, আপনাকে একটি গান তৈরি করতে হবে। একটি গ্রাম আছে। ভীষণ গরিব। কোনওরকমে ভাত জোটে কিনা সন্দেহ। সেইগ্রামে প্রত‌্যেকটি পরিবার এক মাসে বা দু’মাসে নিমন্ত্রণ করেন তাঁদের প্রতিবেশীদের। শালপাতায় তাঁদের দেওয়া হয় একটুখানি ভাত, বড়জোর একটুখানি ডাল আর পুকুর থেকে তোলা শাক। এইটুকুই। প্রতিবেশীরা এসে খেয়ে গেলেন। বাড়ির বড় বউ তাঁদের আপ‌্যায়ন করলেন। অথচ বড় বউ নিজে খান না। তিনি একটি বড় শালপাতায় যা রান্না হয়েছে তার নমুনা নিয়ে একটি মাঠে গিয়ে বসলেন। মাঠে বসেই তিনি ডাকবেন আকাশকে, হাওয়াকে। ডাকবেন মেঘকে, সূর্যকে। ডাকবেন গাছগুলোকে, পুকুরগুলোকে। আশপাশের নদীগুলোকে, যা যা প্রকৃতিতে তাঁরা দেখেন, সবকিছুকে। কোনও প্রাণীকে নয় তবে, প্রাণীরা খেয়ে গিয়েছে, কুকুর, বিড়ালকে আগেই দেওয়া হয়েছে। তিনি ডাকছেন বিশ্ব চরাচরকে। তিনি বলছেন, ‘‘এসো, তোমরা খেয়ে যাও। এসো, এসো…।’’

এই কথাগুলি বলতে গিয়ে এ বার আমার চোখে জল আসছে। আমি বুড়ো হয়ে গেলাম। সুধীরবাবু চলে গেলেন। ওঁর পরামর্শমতো আমি চেষ্টা করেছিলাম গানটা লিখতে। কিন্তু পারিনি। যতবার খানিকটা এগিয়েছি, কাঁদতে আরম্ভ করে দিয়েছি। গানটা আরম্ভ হয়েছিল— ‘এসো আকাশ খাবে এসো তোমাকে তো ডাকিনি এই ঘরে/ এসো আকাশ খাবে এসো আমি খাব তুমি খাবার পরে।’ আমি কিছুটা তাঁকে শুনিয়েছিলাম। তিনি শুনে বলেছিলেন, ‘‘এটা একটা গান হল।’’ আমি বললাম, এখনও কমপ্লিট হয়নি। তিনি বললেন, ‘‘দরকার নেই। আপনি দেখুন, যদি হয়।’’ আমার কাছে সুধীরবাবু ছিলেন এমনই। আমাকে একদিন বললেন, ‘‘আপনি ক্রমশ একলা হবেন। আপনাকে বোঝার মতো ক্ষমতা লোকের নেই। এটা মেনে নিন। আপনার বাড়ির লোকের নেই। দেশের কারও নেই। কষ্ট পাবেন না, রাগ করবেন না। আপনি খুব মেজাজি লোক। মেজাজ গরম করবেন না। শরীর খারাপ হবে। অথবা করবেন। আপনার কপালে যা আছে তাই হবে। তবে আপনাকে কেউ বোঝে না। আপনার ধারেকাছে কেউ আসবে না। এই যে বললাম, আপনি চারটে লাইন লিখলেন। কেউ এরকম চারটে লাইন লিখতে পারবে না। পারেনি কোনওদিন। তা হলে তো হয়েই যেত।’’

তারপরে তিনি বললেন, ‘‘তবে একটা জিনিস, জ্ঞান কিন্তু আপনি লুকিয়ে রাখতে পারবেন না।’’ আমি বললাম, কী রকম? তিনি বললেন, ‘‘এই যে এত জ্ঞান অর্জন করলেন, এত দেশ ঘুরে, এত কিছু শিখে, এত সঙ্গীত শিখলেন, আপনি কিন্তু সে সব লুকিয়ে রাখতে পারবেন না। সুযোগ পেলে সেগুলো বাইরে বেরিয়ে আসবে।’’ এরপরে সুধীরবাবুর সঙ্গে আমার খুব কম দেখা হত। তার পরে হঠাৎ একদিন তিনি এসে বললেন, ‘‘দিলীপকুমার রায়ের উপর লেখার একটা লোকও নেই। আপনি লিখুন।’’ আমি বললাম, ‘‘মরেছে, আমি তো এত কিছু জানি না।’’ তিনি বললেন, ‘‘যা জানেন, তাই লিখুন। একজন সঙ্গীতকারের দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে দিলীপকুমার রায়ের উপর লিখুন মশাই। আর কেউ লেখার নেই।’’

তারপরে দু’জন দু’দিকে চলে গিয়েছি। দেখা হয়নি। তাঁর লেখা পড়েছি। সব মিলিয়ে সুধীরবাবু কখনও মাঝখানে নেই। যেমন, শঙ্খ ঘোষ মাঝখানে থাকেন। কবি ছাড়াও শঙ্খবাবু একজন স্বীকৃত অভিভাবকত্বের প্রতিনিধি। সুধীরবাবুর সেরকম কোনও জায়গা নেই। বা ধরুন, মহাশ্বেতা দেবী। তাঁরও স্বীকৃত জায়গা ছিল। সুধীরবাবু কিন্তু তা নন। আমরা কথায় কথায় বলি মাটির গন্ধ, মাটির অমুক, মানুষ, সুধীরবাবু কখনও এগুলো বড় মুখ করে বলতেন না। সুধীরবাবু কখনও বলেছেন, ‘‘আমি কিন্তু এই লেখাটির জন্য পয়সা দিতে পারব না। আপনাকে লিখতে হবে। লেখার কেউ নেই।’’ আমি বলেছি, মশাই, সময় নেই। সুধীরবাবু বলেছেন, ‘‘সময় বের করুন। যে ভাবেই হোক। দরকার হলে দু’দিন স্নান করবেন না। ওই সময়ে লিখুন।’’ খুব মজার মানুষ ছিলেন। তাই বলে যে হো হো করে হাসতেন তা নয়। মুচকি হাসতেন। আর ধুতি-পাঞ্জাবি পরতেন পরিপাটি করে। মানে ওই আলুথালু আঁতেল না। একজন পরিচ্ছন্ন মানুষের যেরকম থাকা উচিত। যে রকম দেখতে, দেখে মনে হয় আমার অভিভাবক। আমি কোনওদিন দেখিনি, সুধীরবাবু কোথাও দাঁড়িয়ে ভীষণ ভাষণ দিচ্ছেন। সুধীরবাবু যে কাজ করেছেন সেই কাজটা জারিয়ে গিয়েছে এই সমাজে। আমি তাই কথাগুলো আপনাকে বলতে পারছি। সুধীরবাবু দিয়েছিলেন বলেই এগুলো আপনাদের কাছে পৌঁছে দিতে পারলাম।

(টেলিফোনে কবীর সুমনের প্রতিক্রিয়া শুনলেন সাদাকালো-র সাংবাদিক শুভদীপ ভট্টাচার্য। ফিচার ছবি ও কবীর সুমনের ছবি গুগল থেকে নেওয়া।  সুধীর চক্রবর্তীর ছবিটি এঁকেছেন কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত)