সুদীপ জোয়ারদার

‘ না না আজ রাতে আর যাত্রা শুনতে যাব না/শুনেছি চৌধুরী বাড়িতে নাকি বসেছে আসর/এসেছে কলকাতারই নামকরা সেই নট্ট কোম্পানি।’

আমাদের সৌভাগ্য মান্না দে-র এই গান এবং নট্ট কোম্পানির যাত্রা দুইয়েরই বিপুল জনাদর দেখে আমরা বড়  হয়েছি। মান্না দে-র গান আজও রয়ে গিয়েছে একই জায়গায় কিন্তু পিছিয়ে গিয়েছে শুধু নট্ট নয় অন্য বড়, ছোট সব যাত্রা দলেরই কর্মকাণ্ড।

খুব বেশিদিন আগের কথাও নয়। পঞ্চাশ থেকে আশির দশক, এমনকি নব্বইয়ের দশকেরও বেশ কিছুটা সময় বঙ্গজীবনের বিনোদনের একটা মস্ত উপকরণ ছিল যাত্রা। যদিও যাত্রার সময়কাল ছিল দুর্গাপুজোর ষষ্ঠী থেকে জষ্ঠী, তবুও বেশিরভাগ বাঙালির কাছে সে ছিল এক মনোরম শীতসাথী।

দল বেঁধে যাত্রা দেখতে যাওয়ার যুগে বড় হওয়া আমাদের কাছে স্বভাবতই এই বিনোদনের অজস্র স্মৃতি শীত এলেই বেরিয়ে আসে বিস্মৃতির ধুলো ঝেড়ে। কত দল, কত পালা! নট্ট কোম্পানি তো ছিলই, রাজার মর্যাদা নিয়ে। সেই সঙ্গে, শিল্পীতীর্থ, মঞ্জরী অপেরা, সত্যনারায়ণ অপেরা, মোহন অপেরা আর কত কত নামী দল। গ্রামে গঞ্জে তখন ছেলে ছোকরাদের আলোচনায় ঘুরে বেড়ান, বীণা দাশগুপ্ত, গুরুদাস ধারা, জ্যোৎস্না দত্ত, ছন্দা চ্যাটার্জি, শান্তিগোপাল, স্বপন কুমার, রাখাল সিংহ, শেখর গাঙ্গুলিরা। বীণা দাশগুপ্ত না জ্যোৎস্না দত্ত, কে বেশি ভাল গান করেন, শেখর গাঙ্গুলি না রাখাল সিংহ কে বেশি ক্রূর হাসি হাসতে পারেন, এ সব নিয়ে তর্ক চলে চায়ের দোকান, মুদির দোকানের বেঞ্চে। শীর্ষেন্দু, সুনীলের  নাম না জানলেও, গাঁ-গঞ্জ তখন ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায়ের নামে গড় করে। আর ছিলেন খোকন বিশ্বাস। নট্ট কোম্পানির এই বিবেক-শিল্পী তখন তাঁর গান নিয়ে আমাদের সকলের কাছেই ছিলেন এক মহা বিস্ময়।

রথের দিন তখন মোটা খবরের কাগজ আসত নানা যাত্রা দলের বিজ্ঞাপন শোভিত বাড়তি পাতা নিয়ে। আর চিৎপুরের বায়নাও শুরু হয়ে যেত সেদিন থেকেই। রথের দিনের কাগজ পড়েই বুঝতাম, এ বার কে কোন দলে গেলেন। ফুটবলে খেলোয়াড়দের ক্লাব বদলের মতো যাত্রা শিল্পীদেরও তখন দলবদল হত। কেউ কেউ অবশ্য রয়ে যেতেন একই দলে বছরের পর বছর।

গ্রামেগঞ্জে কলকাতার দল আনা সহজসাধ্য ছিল না সেসময়। একে তো দলের জন্য বিরাট টাকার সংস্থান, তারপর ছিল সরকারি অনুমতি আদায়ের ঝামেলা। এ সব সামলাতে পারা অর্থবল, লোকবল যাঁদের ছিল, তাঁরাই নিয়ে আসতেন কলকাতার যাত্রা। যাত্রার এত রমরমা স্বাধীনতার পর থেকে শুরু হলেও এর ঐতিহ্য বেশ পুরনো। পুরনো আমলের যাত্রার মধ্যে অনেকের দলই ছিল সমকালে বিখ্যাত। গোবিন্দ অধিকারী, মদন মাস্টার, গোপাল উড়ে, নবীন গুঁই প্রমুখের দল সে আমলে সারা শীতকাল গাঁ-গঞ্জ চষে বেড়াত।

উল্লিখিত যাত্রাওয়ালাদের মধ্যে গোবিন্দ অধিকারীই ছিলেন সবচেয়ে প্রাচীন। তাঁর যাত্রার পালা ছিল কৃষ্ণলীলা বিষয়ক। অন্যদিকে গোপাল উড়ের সমস্ত পালাই হত ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দর কাব্য অবলম্বনে। সে সময় যাত্রাপালা শুরুর আগে সংয়ের প্রচলন ছিল। গোপাল উড়ের যাত্রায় পালা শুরুর আগে একে একে আসত ভিস্তিওয়ালা, মেথর, মেথরানী ইত্যাদির সাজে নানা সং। গোবিন্দ অধিকারীর যাত্রায় এই ধরনের সংয়ের পর গোবিন্দ অধিকারী আধঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট নাকি স্টেজের উপর বসে ইষ্টদেবতার ধ্যান করতেন। তারপর শুরু হত পালা।

অন্যদিকে মদন মাস্টারের পালা ছিল একেবারেই অন্যরকম। যাত্রায় অনেক সংস্কার করেছিলেন তিনি। তাঁর আগে যাত্রাপালায় গান থাকত বেশি, কথোপকথন কম। মদন মাস্টার গানের ভাগ কমিয়ে, কথোপকথনের অংশ বাড়িয়ে দেন। এছাড়া চরিত্র অনুযায়ী গানের ধরনও তিনি পালটে দেন। মদন মাস্টারের দলে পুরুষদের গান হত ধ্রুপদ অঙ্গের, আর স্ত্রীলোক এবং বালক-বালিকাদের গান হত খেয়াল বা টপ্পা অঙ্গের।

নবীন গুঁইয়ের দলের পালা প্রধানত ছিল রাম বনবাসের। তবে তাঁর পালা খুব গোছানো ছিল না। দশরথ মারা যাওয়ার পরেও তাঁকে মঞ্চে দেখা যেত। হয়ত কৌশল্যা দশরথকে হারানোর জন্যই গান গেয়ে গেয়ে বিলাপ করছেন, সে সময় দশরথ হঠাৎ মঞ্চে উঠে কৌশল্যার পাশে দাঁড়িয়ে বেহালা বাজাতে লাগতেন। সেকালে একক গানের সময় গায়কের পাশে দাঁড়িয়ে বেহালাবাদকের বেহালা বাজানোর রীতি ছিল। কিন্তু বেহালাবাদক দশরথের ভূমিকায় অভিনয় করলে, তাঁকে জীবিত না হয়ে আর উপায় কী! এখনকার বিচারে হয়ত এ সব কৌতুকের কিন্তু সে সময় দর্শকদের এ সব নিশ্চয়ই খুব বিসদৃশ লাগত না।

শিষ্টজনের কাছে তখন যাত্রা উপভোগের হলেও যাত্রার কুশীলবদের মর্যাদা সিনেমা থিয়েটারের কুশীলবদের মতোই ছিল। ‘যাত্রা করে ফাতরা লোকে’ তখন চালু প্রবচন। তা সে যতই ‘ফাতরা’ লোকের শিল্প হোক যাত্রাতে মজেছিলেন অনেকেই। বঙ্কিমচন্দ্র শুধু অনুরাগী ছিলেন না, যাত্রা নিয়ে প্রবন্ধও ছাপিয়েছিলেন ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায়। বঙ্কিমচন্দ্রের দাদা সঞ্জীবচন্দ্র  অবশ্য যাত্রা নিয়ে বঙ্গদর্শনের পাতায় তাঁর যাত্রামুগ্ধতার সঙ্গে বিদ্যাসুন্দরকে যাত্রায় আনার সমালোচনাও করেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ এই লোকশিল্পের অনুরাগী ছিলেন। যে কারণে তাঁর ঋতু ভিত্তিক নাটকগুলোতে যাত্রার বাহ্যিক একটা প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। যাত্রা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- ‘যাত্রার অভিনয়ে দর্শক ও অভিনেতার মধ্যে একটা গুরুতর ব্যবধান নাই। পরস্পর বিশ্বাস ও আনুকূল্যের উপর নির্ভর করিয়া কাজটা বেশ সহৃদয়তার সহিত সুসম্পন্ন হইয়া থাকে। কাব্যরস, যেটা আসল জিনিস তা আলোর ফোয়ারার মতো পুলকিত দর্শকচিত্তের ওপর ছড়াইয়া পড়ে।’ শুধু রবীন্দ্রনাথ নন, যাত্রায় মজেছিলেন ঠাকুর বাড়ির অনেকেই। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘সরোজিনী’ নামে একটা যাত্রাপালাও লিখেছিলেন। যাত্রার আয়োজন ঠাকুর বাড়িতে মাঝেমাঝে হলেও রবীন্দ্রনাথের শৈশবে ছোটদের তা দেখতে দেওয়া হত না। তবে একবার ছোটদের কপাল খুলেছিল। সেই সুযোগে রবীন্দ্রনাথ সে বার একটা যাত্রাপালা দেখতে পেয়েছিলেন। সে যাত্রাপালার নাম  ছিল— ‘নল দময়ন্তী’।

ছোটদের জন্য এই যাত্রা দেখার কড়াকড়ি ঠাকুরবাড়িতে সম্ভবত পরে আর ছিল না। যে কারণে অবনীন্দ্রনাথকে দেখি জোড়াসাঁকোর ছোটদের দিয়েই তাঁর যাত্রাগুলো করাতে। ঠাকুরবাড়িতে অবনীন্দ্রনাথের লেখা এবং পরিচালনায় প্রথম যে যাত্রা পালা হয়, তার নাম-‘এসপার ওসপার।’ এ পালা রবীন্দ্রনাথও উপভোগ করেন। জোড়াসাঁকোয় আর একবার অবনীন্দ্রনাথ যাত্রার আয়োজন করেছিলেন বেনথল সাহেবকে দেখানোর জন্য। সে পালার নাম ছিল-‘উড়নচন্ডীর মাঠ।’ এইসময় জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ‘দক্ষিণের বারান্দা’য় বসে তুলি তুলে রেখে অবনীন্দ্রনাথ একের পর এক যাত্রা পালা লিখে গেছেন। লেখার পরে ছোটদের সে সব পালা তিনি পড়েও শোনাতেন।

যাত্রা, ঝুমুর এ সব দেখেই বড় হয়েছেন ‘কবি’র কথাকার। ‘আমার কালের কথা’য় তারাশঙ্কর তাঁর শৈশবে গ্রামের ব্যবসায়ী বাড়িতে যাত্রা দেখার অভিজ্ঞতা লিখেছেন। সেখানে সিতিকণ্ঠ, শ্রীকণ্ঠ, নীলকণ্ঠ তিন ভাইয়ের ‘কৃষ্ণযাত্রা’র গল্প পড়ে আজও পাঠকের রোমাঞ্চ লাগে।

যাত্রাপ্রেম বিভূতিভূষণেরও কিছু কম ছিলেন না। ‘যাত্রা আরম্ভ হয়। জগৎ নাই, কেহ নাই-শুধু অপু আছে, আর নীলমণি হাজরার দল আছে সামনে’, ‘পথের পাঁচালী’র এই বর্ণনাতেই বিভূতিভূষণের যাত্রামুগ্ধতার পরিচয় রয়েছে। এছাড়া তাঁর ‘যদু হাজরা ও শিখিধ্বজ’ গল্পে যাত্রাশিল্পী যদু হাজরার বৃত্তান্তও আমরা অনেকেই পড়েছি। এ গল্পেও রয়েছে তাঁর যাত্রামুগ্ধতার সৌরভ। যদিও সে সৌরভে বিষণ্নতা মিশে গল্পের শেষে ভারী করে দিয়েছে পাঠকের মন। তাঁর এই গল্পে যাত্রাশিল্পী যদু হাজরার দুর্দশাময় অন্তিমের সঙ্গে এখনও কোনওরকমে টিকে থাকা যাত্রাশিল্পীদের নির্মম বাস্তব অনেকটাই মিলে যায়।

যাত্রাশিল্পীদের এই বর্তমান একরকম ভবিতব্যই ছিল। যাত্রাকে বাঁচানোর চেষ্টা তো কম হয়নি! কত পরীক্ষানিরীক্ষা চলেছে পেরিয়ে আসা শতকের পুরো দ্বিতীয়ার্ধ জুড়ে! পালার বিষয়বস্তু থেকে শুরু করে পরিবেশনা, সর্বত্রই। যে ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায় একসময় লিখেছেন, ‘মা মাটি মানুষ’, তিনিই আবার পরবর্তীতে বাজার ধরার জন্য লিখেছেন, ‘থানায় যাচ্ছে ছোটবউ’ এর মত চটকাদার পালা। আর প্রযুক্তিও যাত্রায় এসেছে সেই একই লোকরঞ্জনের সূত্রে। স্টেজে আলোর চমক তৈরি করতে নিয়ে আসা হয়েছে তাপস সেনের মতো বিখ্যাত আলোকশিল্পীকেও। শুধু কি আলো? যাত্রায় এসেছে প্রজেক্টর, উন্নত মাইক্রোফোন,  ঘূর্ণায়মান মঞ্চ-সহ নানা ব্যবস্থা। দর্শক টানতে টলিউড, বলিউডের শিল্পীদের আনা হয়েছে। যাত্রার গানে সুর দিতে মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো শিল্পীরও ডাক পড়েছে।

এ ভাবে যাত্রা নিজেকে ক্রমাগত পালটে গিয়েছে বাজারের চাহিদা শুধু নয়, অনেকসময় বেশি মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যেও। এইসব বদলের কোনটা ভাল ছিল, কোনটা যদু হাজরার মতো খাঁটি যাত্রাপ্রাণ কলাকুশলীদের কোণঠাসা করে দিয়েছিল সে ভিন্ন প্রসঙ্গ। আসল  কথা হল কালের কাছে, যুগের গতিশীলতার কাছে এত আয়োজন শেষ অব্দি মুখ থুবড়ে পড়েছে।

আধুনিক গণমাধ্যমের দাপটে আমাদের পুরোনো অনেক কিছুই আজ বিলুপ্ত। যাত্রার নাম সেই তালিকায় এই শতকের গোড়া থেকেই সংযোজিত। যাত্রা-একাডেমি, যাত্রামেলা কোনও কিছুই অক্সিজেন দিতে পারেনি শেষ দৃশ্যে চলে যাওয়া এই শিল্পকে। বাংলার জল-মাটির নিজস্ব ঐতিহ্যে গড়ে ওঠা, আমাদের বড় আদরের  বিনোদন এই যাত্রাশিল্পের এমন অন্তিম কয়েক দশক আগে কে-ই বা ভাবতে পেরেছিল! পুনরুজ্জীবনের আশাও আর নেই। অতএব, কঠিন হলেও বলতেই হয়, ‘ যাত্রা করো, যাত্রা করো যাত্রীদল’/উঠেছে আদেশ/ ‘বন্দরের কাল হল শেষ।’

(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)