সুপ্রতিম কর্মকার

সাদা কাগজে একটা তারিখ লিখে জলে ভাসিয়ে দিলেন ভোলানাথ। কী লিখলেন? ম্লানমুখে ভোলানাথ উত্তর দেন, ‘‘নদীর মৃত্যুদিন।’’ কথাটা মিথ্যে নয়। নদী মরছে। কোন নদী মরছে? উত্তরের সঙ্কোশ থেকে দক্ষিণে বুড়ি গঙ্গা সব মরছে। এ-ও এক মৃত্যুমিছিল। নদী মৃত্যুর দিকে পা বাড়িয়েই আছে। তারও কারণ আছে।

আমরা এই কারণকে দু’ ভাগে ভাগ করতে পারি। প্রথম ভাগে আমরা রাখতে পারি প্রাকৃতিক কারণকে। এই নিবন্ধে কেবলমাত্র প্রাকৃতিক কারণটাকেই বোঝার চেষ্টা করব। একদম প্রথমেই রখতে পারি, বিশ্ব উষ্ণায়ন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং। সোজা ভাবে এই কথাটাকে বলতে হলে বলা ভাল, এই পৃথিবীটা গরম হচ্ছে। কারণ, বাতাসে যে সব বিষাক্ত গ্যাস রয়েছে তা পৃথিবীতে যতটুকু থাকার কথা ছিল, তার চেয়ে ঢের বেড়ে গিয়েছে তার পরিমাণ। কাজেই যে বাতাসের চাদর পৃথিবী জড়িয়ে থাকে নিজের গায়ে, তার উষ্ণতাও বেড়ে যায়। আর তাতেই গলে পৃথিবীর দুই মেরুর বরফ।

কোটি কোটি বছর ধরে জমে থাকা বরফের জল পেয়ে সাত সমুদ্রের জল আরও বেড়ে যায়। আরও ফুলে ফেঁপে ওঠে। আর তাতেই ডুবে যায় উপকূল। যেমন ধরুন, হাতের কাছে থাকা সুন্দরবনকেই। চোখের সামনে সমুদ্রের জল বেড়ে যাওয়ায় একের পর এক দ্বীপ তলিয়ে যাচ্ছে। ঘোড়ামারা দ্বীপ তার জ্বলন্ত উদাহণ। একটা প্রশ্ন কিন্তু আপনাদের মনে উঁকি মারতেই পারে। এই গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের প্রভাব মুর্শিদাবাদেও কী পড়ছে? উত্তরটা, এককথায়— হ্যাঁ।

পৃথিবী গরম হওয়ার দু’ধরণের প্রভাব আছে। একটা প্রভাব যেটা সারা পৃথিবীময়। আর অন্য প্রভাবটি হল স্থানীয়, কিছুটা অঞ্চল জুড়ে সীমাবদ্ধ। তাই উষ্ণায়নের প্রভাব মুর্শিদাবাদের কান্দিতে যেমন পড়বে, জলপাইগুড়ির ময়নাগুড়িতে তেমন না-ও হতে পারে। কাজেই পৃথিবী গরম হওয়ার প্রভাবটাকে এলাকা ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করলে আমাদের সামনে খুলে যাবে এক অজানা জগৎ।

একটা উদাহণ দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করি। আমরা এই দু’রকমের পিঁপড়েকে সবাই চিনি। ডাসা পিঁপড়ে আর নালসে পিঁপড়ে। এই পিঁপড়েগুলো খুব উপকারী বন্ধু ছিল কৃষকদের। কেঁচোকে আমরা কৃষকের বন্ধু বলি। আমরা ভুলে যায় এই ছোট্ট না-মানুষ বন্ধুদের। মুর্শিদাবাদের একটি ছোট্ট গ্রাম গরিবপুর। সেখানে ভৈরব নদের একটা পাড় খুব উঁচু। স্থানীয় লোকেরা বলে ‘পাউড়ি’। এই পাউড়ির ঝোপেঝাড়ে লুকিয়ে থাকত এই পিপীলিকার রাজা-রা‌নি-দলপতি-সেনারা। পাড় ভাঙা, বৃষ্টি, বন্যার আগাম সতর্কবার্তা এই পিপড়ের দল পৌঁছে দিত চাষিদের কাছে। পিঁপড়ের চালচলনে সে বার্তা স্পষ্ট বুঝতে পারতেন কৃষকরা।

পৃথিবী গরম হল। ধীরে ধীরে বদলে গেল বৃষ্টিপাতের ধরণ। আগে গ্রামের মানুষ নদীর ধারে যে ভাবে চাষ করত, সেই ভাবে আর করতে পারল না। আগে নদীর জল আর বৃষ্টিতে সেচের কাজ হত। কিন্তু পরিবেশ পাল্টানোর সঙ্গে সঙ্গে চাষের ধরন বদলে গেলো। পাউড়িগুলোকে ভেঙে সমতল জমি হল। যাতে চাষের জন্য অনেক বেশি জল খুব সহজেই পাওয়া যায়। কাজেই চাষের ধরণ বদলে গেল। পাউড়ি হারিয়ে গেল। বাড়ি ঘর হারাল পিঁপড়ের দল। মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হল প্রকৃতির।

খালি চোখে দেখে মনে হবে, এটা তো খুব স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু ঘটনার উৎস সন্ধানে গেলে মনে হবে, আসল কারণের শিকড়টা অনেক গভীরে রয়েছে।

(লেখক নদী বিশেষজ্ঞ)

(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)