কৌশিক গুড়িয়া

সেদিন আমরা শান্তিনিকেতন থেকে ফিরছিলাম। অজস্র বাজি ফুটছিল আকাশে। রাতের আকাশ যে এত করুণাময় কবিতার মতো হতে পারে আগে কোনওদিন বুঝিনি। সেদিন ছিল সবেবরাতের এক সর্বজন-মোহময় রাত! সবার যেন এমন বরাত হয়, যেমন আমার পাশের সিটে বসেছিলেন নাসের…। নাসেরদার মধ্যে যে এক সর্বধর্মপ্রেমিক বাস করতেন, সেদিন বুঝেছিলাম। বুঝেছিলাম, ভালো যে বাসে তারই তিরস্কার করা সাজে। সবেবরাতের আচারগত সূক্ষ্মতার বদলে সেদিনকার মাত্রাতিরিক্ত শব্দবাজির কুহেলিকায় আমরা সবাই যেন অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছিলাম। দেখলাম, নাসেরদাও প্রতিবাদ করছেন সে ঘটনার। এবং আমার বিশ্বাস, এমন প্রতিবাদ তিনি অন্য উৎসবের শব্দ-হুঙ্কারকেও জানিয়েছেন কোনও না কোনও দিন। তিনিও ধর্মাচারী ছিলেন অবশ্যই, তবে সে আচরণ ছিল নিতান্ত আত্মিক, ব্যক্তিগত।

আমরা ফিরছিলাম কবিতা পাক্ষিকের দু’দিনের একটি কবিতা কর্মশালা থেকে। বাসের জানলায় আমরা যে আলোক বাজির ঘনঘটা দেখছিলাম তা যেন রিভার্স মোডে আলোর কালি দিয়ে আঁকা কালো ক্যানভাস। এমন ক্যালিগ্রাফিই কি নাসেরদার জলরঙে আঁকা ছোটো পত্রিকার প্রছদ হয়ে ওঠে? উজ্জ্বল, অথচ নিশ্চল কবিতা সব। এমন উপমা কবিতায় যতটা যায়, তার থেকেও বেশি যায় পাশে বসে গল্প করতে থাকা মানুষটিকে বর্ণনা করতে।

হ্যাঁ, নাসের ছিলেন তেমনটাই। উজ্জ্বল অথচ, প্রভা-রহিত। নিরীহ এবং অজাতশত্রু। আত্মমগ্নতার চূড়ায় যাঁকে ফুটপাতের চা-দোকানে বসেও নব্য কোনও সম্পাদকের জন্যে একসাথে ১২টি পর্যন্ত কবিতা লিখে দিতে দেখেছি। এবং সে সব কবিতা অবলীলাময় ভাবেই যেন এক একটি লহমা! এমন প্রায় একশো কুড়িটি কবিতা নিয়ে বই করেছিলাম আমরা। তেমন পকেট বইয়ের নামও নাসের দিয়েছিলেন ‘লহমা’।

এ জেলায় আমার প্রায় ১৪-১৫ বছর হতে চলল, তাঁর সঙ্গে আলাপ অবশ্য তারও আগে। এবং অবশ্যই সে সংযোগের অনুসূত্র হলেন প্রভাত চৌধুরী। প্রভাতদার কবিতা শৈলী নিয়ে পিছনে অনেকে অনেক কথা বলতেই পারেন, যেমন বলতেন নাসেরদার সমস্ত পত্র-পত্রিকায় কবিতা বেরনোর প্রসঙ্গ নিয়েও। কিন্তু প্রভাতদাই সেই বিরলতম একজন যিনি নির্দ্বিধায় বৈঠকখানা রোডের গলি ঘুঁজি ঘুরে কোন প্রেসে কম খরচে ভালো কাজ করা যায় থেকে, বাঁধাইখানা কিংবা কাগজের দোকান চিনিয়েছিলেন আমাকে। বলা বাহুল্য তারুণ্যের সেই সব দিনেও নাসেরদার সঙ্গগুণ ভুলে যাওয়ার নয়। এখনও চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই, শাসন-না-করা ঝাঁকড়া চুলের এক কবি তাঁর ঝোলার মধ্যে অগুনতি অভিমান নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। ‘আসছি গো, আবার দেখা হবে’, এই বলে…