দেবজ্যোতি কর্মকার

‘সোয়েটার’ সিনেমার টুকুর কথা নিশ্চয়ই সবার মনে আছে। একটি মেয়ে শুধুমাত্র নিজের কিছু গুণ আছে তা প্রমাণ করার জন্যই হাতে তুলে নিয়েছিল উলবোনা কাঁটা। সোয়েটার তৈরি করা শিখে প্রমাণ করতে হয়েছিল ‘হ্যাঁ, আমিও পারি’। সেই উলবোনার কাঁটার সাথে বাঙালির অদ্ভুত দুটো ট্র‍্যাজেডি আছে। তার প্রথমটা- প্রতি বছর ভাদ্র-আশ্বিন মাস এলেই বোঝা যায়। অদ্ভুত ভাবে সেই ট্র‍্যাজেডি উস্কে বাড়ির বয়স্ক মেয়েদের চোখের কোণ ভারী হয়ে যায়। আবেগে ঝাপসা হয়ে যায়!

ঠিক যে সময়ে মেঘে মেঘে শরতের পেঁজা তুলো ভাসে। অর্থাৎ, বর্ষা বিদায়ের গন্ধমাখা রৌদ্র নিয়ে পুজো আসে। তারই আগে নিয়ম করে পুজোর আগে ভাদ্র-আশ্বিন মাসের রোদে বাড়ির ছাদে পুরনো শাড়ি, জামাকাপড়, সোয়েটার মেলে দেন অনেকেই। শাড়ি, জামাকাপড়ের জন্য আলাদা বাক্স ছাড়াও পুরনো বাক্স ভর্তি থাকে উলের সোয়েটারে। আমাদের প্রত্যেকেরই ছোটবেলায় ব্যবহার করা সেই রঙিন সোয়েটারগুলো এখন বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ভেবে উপেক্ষা করি! প্রতিটি ভাদ্র-আশ্বিনে এ ভাবেই যেন প্রকৃতির ওম মেখে থাকে আমাদের শৈশব! প্রকৃতির এই নিয়মে অদ্ভুত ভাবে বাঁধা পড়েছি আমরা সবাই।

শাড়ি আর জামাকাপড়গুলোও বছরে একটা দিনে যেন রোদের সঙ্গে মাখামাখি করে। বিভিন্ন রঙের শাড়ি আর জামাকাপড়ে গোটা ছাদজুড়ে তখন যেন রঙের উৎসব চলে। পুরনো দিনের সেই বাক্সভর্তি উলের সোয়েটার মেলে দেওয়ার পাশাপাশি আরও একটি বিষয় লক্ষ্য করার মতো। বাক্সের এক কোণে অনাদরে পড়ে থাকে বেশ কয়েকটি উলের সোয়েটার বোনার স্টিক বা উলকাঁটা। বিভিন্ন সাইজের বেশ কয়েকটি স্টিক বাক্সের এক কোণে বছরের পর বছর ধরে একইভাবে পড়ে থাকে। তবে এই  স্টিকগুলোকে রোদে দেন না কেউই। কিন্তু প্রতিবছর স্টিকগুলোকে একবার করে নেড়েচেড়ে দেখেখেন আমাদের মা। ভাদ্র-আশ্বিন মাস এলেই সেই সব স্টিকের সঙ্গে আবার দেখা হয় তাঁর। মনে পড়ে যায় তাঁরই শখের উলবোনার অজস্র স্মৃতিও।

ট্র‍্যাজেডির আরও একটি দিক হল, শীতের দুপুরে পুরনো শৈশবের বিলুপ্তি। আমাদের শৈশবের অজস্র স্মৃতি আছে শীতের মায়াবি দুপুরে। যা আজ অনেকটাই ফিকে। ছোটবেলায় মায়ের উলবোনার পাশাপাশি একটা মজার খেলা ছিল উলের গুটি যখন বলে পরিণত হত। সেই উলের বল নিয়ে খেলেছি আবার খেলতে খেলতেই উল ছাড়িয়ে নিয়েছি, পুনরায় সেটা দিয়ে বল বানিয়েছি। কখনও কখনও বাড়ির পোষা বেড়ালও সেটা নিয়ে মজার খেলায় মেতে উঠত। আবার আমরা খেলতে খেলতেই হঠাৎ মায়ের ডাক পড়ত। মা হাতে বোনা সোয়েটারটি নিয়ে মাপতেন ঝুল, চওড়া ইত্যাদি। মায়ের হাতের সেই সোয়েটার কবে পাব তার জন্য অপেক্ষায় থাকতাম। মনের মধ্যে এক অনন্ত আনন্দের জন্ম হত। এ প্রজন্মের ছেলেরা এমন শৈশব নিশ্চিত ভাবেই পাবে না।

বেশ কিছু সিনেমায় দেখা যায়, মেয়েরা তাঁদের প্রিয় মানুষটির জন্য নিজস্ব কল্পনার রঙে সংবেদনশীল মন দিয়ে উলের সোয়েটার তৈরি করছেন। পুরনো সিনেমার গানে সে সব দৃশ্য দেখা যায়। যদিও এই সময়ের মেয়েদের কাছে সেসব দৃশ্য বড়ই সেকেলে। হয়তো সেই কারণেই এখনকার সিনেমায় এসব দৃশ্য থাকেই না। প্রেমিকার কিংবা মায়ের ভালোবাসার গল্প এখন অনেকটাই পাল্টে গেছে  বলেই হয়তো এমন দৃশ্য ধরা পড়ে না কোনও ক্যামেরায়! আবার এখন প্রয়োজন ফুরিয়েছে সেই উলবোনার কাঁটারও।

কর্মব্যস্ত মহিলারা এখন ছুটছেন অফিসে, স্কুলে এবং অন্যত্রও। একটা সময় ছিল যখন বাড়ির মেয়েদের হাতে অজস্র অবসর ছিল। হ্যাঁ, বাড়ির প্রচুর কাজ সামলেও তাঁরা কিন্তু উলের সোয়েটার তৈরি করতেন। ঠিক কোন রঙে তাঁর স্বামী বা সন্তানদের বেশ মানাবে সেটাও একটা ব্যাপার ছিল। আবার এটাও ঠিক যে, তখন এখনকার মতো এত দোকান থেকে সোয়েটার কেনার চল ছিল না। এই পরিবর্তন অবশ্যই একদিনে আসেনি। বা শুধু শপিং মলে বিক্রি হওয়ার জন্য এবং এখনকার মেয়েদের হাতে সেরকম সময় নেই বলেই উলবোনা বন্ধ হয়ে গেল তা কিন্তু একেবারেই নয়।

কিছুদিন আগের ঘটনা। মেরেকেটে বছর কুড়ি-পঁচিশ হবে হয়তো। হঠাৎ করে গ্রামের দিকে উলবোনার মেশিন এলো। অমনি বেশ কিছু নিটিং সেন্টার গজিয়ে উঠল। একজন মেশিনে উলবোনা শেখানোর জন্য যে ট্রেনিং সেন্টার খুললেন সেখানে নতুন কাজ শেখার আনন্দে, স্বনির্ভর হওয়ার স্বপ্নে অসংখ্য মেয়েরা ভিড় করতে লাগলেন। যে গ্রামগুলোতে শহরের হাওয়া একটু আগে থেকে লাগতে শুরু করেছিল অর্থাৎ একটু এগিয়ে থাকা গ্রামেই প্রথম দিকে এই ট্রেনিং সেন্টার খুলেছিলেন মহিলারা। সেখানে অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা গ্রামের মহিলারা রোজগারের জন্য এই ট্রেনিং সেন্টার থেকে মেশিনে উলবোনা শিখতে লাগলেন। এতে করে সোয়েটার তৈরির সময় অনেকটা কমে গেল। আগে যেখানে বছরে একটি বা দু’টি সোয়েটার তৈরি করা যেত, সেখানে মেশিনে প্রতিদিন কমপক্ষে দুটো করে সোয়েটার তৈরি করার সুবিধা পাওয়া গেল। আবার প্রিয়জনের জন্য শুধু সোয়েটার, টুপি,মাফলার তৈরি করাই নয় এখান থেকে তাঁরা রোজগার করার উৎস খুঁজে পেলেন। ফলে উলের কাঁটায় নিজেদের জীবনকে না জড়িয়ে অনেক মহিলাই উলবোনার মেশিন বাড়িতে আনলেন।

আর যাঁরা ভালোবেসে কাঁটা দিয়ে সোয়েটার তৈরি করছিলেন তাঁরাও যন্ত্রের কাছে মাথা নত করলেন। আসলে মেশিনে উলবোনার সুবিধা অনেক। কাঁটায় যেমন চোখের ক্ষতি হবার সম্ভাবনা প্রচুর। কিন্তু মেশিনে চোখের ক্ষতি অপেক্ষাকৃত কম, আবার বিভিন্ন রঙের ব্যবহার করাতেও সুবিধা অনেক বেশি। ফলে শখ করে উলবোনা আস্তে আস্তে প্রায় উঠেই গেল। উলবোনার মেশিন বাড়িতে বাড়িতে এসে যাওয়ায় উলবোনার কাঁটাও বাক্সবন্দি হয়ে রইল। কুড়ি- পঁচিশ বছর আগের আধা গ্রাম আধা শহরগুলোর চেহারায় অনেক বদল ঘটেছে। উলবোনা মেশিনে সোয়েটার বা শীতবস্ত্র তৈরির সময়ও এখন মানুষের হাতে নেই। পা বাড়ালেই শপিং মলে যে ভাবে রঙিন সোয়েটারগুলো ‘মহা ছাড়ে’র বিজ্ঞাপন দেয় তাতে কে আর অন্য কোথায় যায়? এখনও গ্রামের দিকে কিছু কিছু মেশিনে উলবোনা শেখানোর চল আছে। কিন্তু সেগুলো কতদিন লড়াই করে টিকে থাকবে বলা সত্যিই কঠিন।

সবই সময়ের সঙ্গে পাল্টে যাবে। শুধু বছরের পর বছর ধরে হাতে তৈরি উলের সোয়েটারগুলো পরম আদরে ভাদ্র-আশ্বিনের রোদ মেখে নেবে। পাশাপাশি উলবোনার কাঁটাগুলোও বাক্সের কোণে জড়িয়ে রাখবে অজস্র শীতের স্মৃতি। সেই সব স্মৃতিকণা ধরা থাক এই সময়েও! শীতের প্রাক মুহূর্তে, শীতকে স্বাগত জানাতে কত কিছুই না করি আমরা। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে অনাদরে থাকা উলকাঁটাগুলোর কথা ভুলে যাই প্রত্যেকেই!

(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here