অনল আবেদিন

বছর দুয়েক আগের কথা। সেদিন সরস্বতী পুজো। বহরমপুর রবীন্দ্রসদনের মুক্তমঞ্চের প্রাঙ্গণ জুড়ে বাঁধা হয়েছে বিশাল ম্যারাপ। এ ভাবেই তৈরি করা হয়েছে ছবি প্রদর্শনীর জন্য অস্থায়ী প্রদর্শনশালা। সেই জোড়া প্রদর্শনশালার দ্বিতীয়টিতে চলছে ‘রূপচিন্তন’- এর ছবির প্রদর্শনী। প্রথমটিতে চলছে ‘প্যাপিলিও পেন্টার্স’ আয়োজিত বহরমপুরের প্রথম আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী। সেই অস্থায়ী প্রদর্শনকক্ষে ঢুকেই বাঁ হাতে ছিল সুজিত মণ্ডলের আঁকা, প্রায় বিমূর্ত আঙ্গিকের একটি ব্যঙ্গাত্মক বিশাল ছবি। এই ব্যঙ্গচিত্র সরকার, প্রশাসন ও রাজনৈতিক কর্তা-ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত ছিল। মগ্ন হয়ে ছবিটি দেখে মাটিতে বসে প্রতিক্রিয়া লিখছেন মুর্শিদাবাদ জেলার প্রখ্যাত চিকিৎসক নির্মল সাহা। কেন তিনি এমন তন্ময় হয়ে সেই ছবিটির প্রতি দৃষ্টি ও মনন নিবদ্ধ রেখেছিলেন?

কালোরঙের ক্যানভাসের উপর সাদা রঙে লেখা ‘বহরমপুর আর্ট গ্যালারির শিলান্যাস। প্রকল্প ব্যয়— ০০.০০.০০’। তারিখ- ০০. ০০.০০০০। শিলান্যাস করলেন সুজিত মণ্ডল। তার মানে, কোনও কালেই এ শহর কোনও আর্ট গ্যালারি পাবে না। এই নির্মম বাস্তবকে সদ্য সুন্দর অবাস্তবে পরিণত করলেন প্রখ্যাত চিকিৎসক নির্মল সাহা ও তাঁর দাদা কল্যাণ সাহা। সেই গল্পে পরে আসব। তার আগে ব্যঙ্গচিত্রটির নেপথ্যের কাহিনি নিয়ে দু’-চার কথা হোক।

সেই নবাবি আমল থেকে এ জেলা চিত্রচর্চায় ঐতিহাসিক স্থান অধিকার করে আছে৷ সেই কারণে একটি বিশেষ চিত্রশৈলির নামই হয়ে গিয়েছে ‘মুর্শিদাবাদ কলাম’। তারও আগে থেকে এ জেলায় চিত্রচর্চার সুসময় ছিল। তার প্রমাণ মেলে চৈতন্য মহাপ্রভুর অনুষঙ্গে। তিনি বহরমপুরের সৈয়দাবাদে এসেছিলেন একবার। তেল রঙে আঁকা ‘সপার্ষদ মহাপ্রভু’র একটি ছবি সৈয়দাবাদে ‘মহারাজা নন্দকুমারের বাড়ি’তে কয়েক বছর আগেও টাঙানো ছিল’। তবে কবে, কোথায় এই ছবিটি আঁকা হয়েছিল, তা নিয়ে অবশ্য নানা মত রয়েছে। পরাধীন ভারতে জন্ম নেওয়া আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন তিন চিত্রশিল্পী— ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদার, ইন্দ্র দুগার ও বাসুদেব রায় এ জেলারই ভূমিপুত্র। স্মরণাতীত কাল থেকে মুর্শিদাবাদের মুকুট এ রকমই নক্ষত্রখচিত। ক্ষিতীন্দ্রনাথের জন্ম (১৮৮১-১৯৭৫) সুতি থানার জগতাই গ্রামে। ত্রিপুরার আগরতলায় বাসুদেব রায় (১৯০৭-১৯৯৬) জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর কর্মজীবন ও শেষজীবন কেটেছে বহরমপুরে। ইন্দ দুগার (১৯১৮-১৯৮২) জন্মেছিলেন জিয়াগঞ্জ শহরে। প্রিয় ছাত্র ক্ষিতীন্দ্রনাথ সম্পর্কে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অলোকসামান্য মন্তব্য, ‘‘আমার দু’টি হাতের একটি নন্দলাল, অপরটি ক্ষিতীন্দ্রনাথ। আমাদের মধ্যে তিন জন তিন বিষয়ে সিদ্ধিলাভ করেছি। নন্দলাল শিবসিদ্ধ, আমি মোগল বিষয়ে সিদ্ধ আর ক্ষিতীন চৈতন্য সিদ্ধ।’’ নিজের প্রিয় ছাত্রের কাছে অবন ঠাকুরের ‘পরাজয়’- এর অকপট স্বীকারোক্তি, ‘‘সূক্ষ রেখারচনা ও সুমধুর বর্ণবিন্যাসে ক্ষিতীন আমাকে পরাস্ত করেছে।’’

শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার একদা পীঠস্থান বহরমপুরেই সারা ভারতের মধ্যে প্রথম অবৈতনিক নাট্য আকাদেমি ও অবৈতনিক সঙ্গীত আকাদেমি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কাশিমবাজারের মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী। তিনি ১৮৯৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘কাশিমবাজার স্কুল অব ড্রামা’ নামের নাট্য আকাদেমি। তার অধ্যক্ষ ছিলেন নট সম্রাট গিরিশচন্দ্র ঘোষের সুযোগ্য শিষ্য গোবর্ধন বন্দ্যোপাধ্যায়। মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী ১৯০৫ সালে ‘বহরমপুর সঙ্গীত সমাজ বিদ্যালয়’ নামে সঙ্গীত আকাদেমিও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অধ্যক্ষ ছিলেন সঙ্গীতাচার্য রাধিকাপ্রসাদ গোস্বামী। গিরিজাশঙ্কর চক্রবর্তীর মতো ভারতখ্যাত এক ঝাঁক সঙ্গীত-নক্ষত্র সেখান থেকে জন্ম নেয়। এমন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এ জেলায় কোনও আর্ট গ্যালারি নেই!

এটাই ভাবিয়ে তুলেছিল নির্মল সাহাকে। স্বাধীন দেশে রাজা-মহারাজার জায়গা নিয়েছে সরকার, প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা। বহরমপুরে চিত্রচর্চার নতুন দিগন্তের অন্যতম সংস্থা ‘উদ্ভাস’। উদ্ভাসের কর্ণধার কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত বলেন, “এ শহরে একটি আর্ট গ্যালারি করার জন্য দু’- দশকেরও বেশি সময় ধরে সরকার, আমলা ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে দরবার করে, ধর্ণা দিয়ে, স্মারকলিপি দিয়েও কোনও সুরাহা হয়নি।” তবে বছর পাঁচেক আগে নাকের বদলে নরুণের মতো একটি লালিপপ শিল্পীদের সামনে ঝুলিয়ে দেয় বহরমপুর পুরসভা। আর্ট গ্যালারি হিসাবে রবীন্দ্রসদনের সামনে সুইমিংপুল লাগোয়া রাস্তার উপরে প্রায় আড়াইশো বর্গফুট জায়গায় পায়রার খোপের মতো একটি নির্মাণ শুরু করে পুরসভা। পাঁচ বছরেও সেই নির্মাণটুকু সম্পন্ন হয়নি। সেখানে এখন বহু পথচারীকে জলবিয়োগ করতে দেখা যায়। এই নিদারুণ চালচিত্র থেকে জন্ম নেয় সুজিত মণ্ডলের ব্যঙ্গচিত্র। সেই চিত্র নির্মল সাহার শিল্পরসিক মনকে গভীর ভাবে নাড়া দেয়।

কখনও বর্ষীয়ান শিল্পী সলিল দাস, কখনও চন্দন বিশ্বাস, কখনও সুগত সেন, কখনও আবার কৃষ্ণজিতদের মতো শিল্পীদের সঙ্গে বহরমপুরের আর্ট গ্যালারি নিয়ে আলোচনা করেন নির্মল সাহা ওরফে বহরমপুরের ‘নিমুদা’। অবশেষে নির্মল সাহারা দুই ভাই বহরমপুর শহরের প্রায় কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত তাঁদের পৈত্রিক বাড়ির একতলায় প্রায় ৫০০ বর্গফুট আয়তনের ঘর আর্ট গ্যালারি করার জন্য ‘প্যাপিলিও পেন্টার্স’কে দেন। সেই হলঘরকে আধুনিক আর্ট গ্যালারির আদল দিয়েছে ‘প্যাপিলও পেন্টার্স’-এর ৬২ জন সদস্য। ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদারের নামাঙ্কিত ওই আর্ট গ্যালারির উদ্বোধন হবে আগামী ২৪ ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার, দুপুর ৩টেয়। ৪৫ জন শিল্পীর আঁকা ৪৫টি ছবির প্রদর্শনী দিয়ে উদ্বোধন করবেন প্রখ্যাত দুই শিল্পী— প্রদীপ মৈত্র ও অখিল দাস। আট দিনের এই প্রদর্শনী চলবে আগামী ১ জানুয়ারি পর্যন্ত।

প্যাপিলও আর্ট গ্যালারি পরিচালন কমিটির সভাপতি কার্তিক পাল বলেন, “এখানে দেশ, বিদেশের ও জেলার সমকালের শিল্পীদের ছবি থাকবে। শিল্প সংক্রান্ত সেমিনারও করা যাবে। এই আর্ট গ্যালারিতে আর্টের কর্মশালাও অনুষ্ঠিত হবে।” মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দীর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের গুণে গুণান্বিত ‘নিমুদা’দের হাত ধরে এ জেলার চিত্রচর্চার আকাশ থেকে যুগ যুগান্তের আঁধার দূর হতে চলেছে। বেজে উঠতে চলেছে রঙের বেণু।

(ফিচার ছবি প্যাপিলিও পেন্টার্স-এর সৌজন্য়ে পাওয়া)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here