কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত

নাসের হোসেন আমার কাছে এক আশ্চর্য অস্তিত্ব। শুধু আমার কাছে কেন, হয়তো অনেকের কাছেই। তাঁর পরিচিতির বিস্তৃতি ছিল বিরাট। কলকাতা থেকে মফস্বল-বাংলার জনপদ, সবখানে ছিল তাঁর ভালবাসার শীতলপাটি। শিল্প-সাহিত্য জগতের বহু বিখ্যাত ও অখ্যাত ব্যক্তির সঙ্গে নাসেরদার অন্তরঙ্গতা ছিল। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ যাঁর সঙ্গে সখ্যই সম্ভব শুধু, ঝগড়া নয়। নাসেরদার প্রয়াণের পরে নানা জনের কথায় ও কলমে উঠে আসছে তাঁর শান্তমধুর আচরণ ও পরিশ্রমী জীবনের কথা। কবিতাকে, সাহিত্যকে ভালবেসে কী অসম্ভব শ্রম ও সময় দান করেছেন তিনি। অসম্মতি ব্যাপারটাই যেন তাঁর অভিধান থেকে নির্বাসিত। মাঝেমাঝে আমার তাঁকে অলৌকিক বলে মনে হতো। জীবনের এইরকম যাপন যে বড় দুর্লভ।

নাসেরদার জীবনের প্রধান দু’টি দিক হল কবিতা ও শিল্পকলা। তাঁর কাব্যচিন্তা, তাঁর গ্রন্থরাজি নিয়ে এরই মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও হবে নিশ্চয়ই। কিন্তু তাঁর ছবি নিয়ে চর্চা নেই বললেই চলে। এ কথা ঠিক যে, তিনি ছিলেন কবিতাময় পুরুষ। কিন্তু চিত্রকলার সঙ্গে ছিল তাঁর প্রগাঢ় আলিঙ্গন। আমার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের সেতুটাই ছিল ছবির টানে গড়া। মনে পড়ে না আমার জীবনের এমন কোনও কাজ বা ঘটনা যেখানে তিনি নেই। আমার সমস্ত প্রদর্শনীতে তিনি এসেছেন, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে থেকেছেন, সর্বোপরি আলোচনা করেছেন মুখে ও ছাপার অক্ষরে। মোমের আলোর মতো শান্ত ছিল নাসেরদার অস্তিত্ব। শত জ্ঞানীগুণীর ভিড়েও আপন আলোয় তিনি উজ্জ্বল। কলকাতা তাঁর কর্মক্ষেত্র হলেও বহরমপুর ছিল আবাল্যের সুতোর টানে বাঁধা। আমি এক অর্থে তাঁর সহনাগরিক। কাজেই বহরমপুর, কলকাতা দুই জায়গাতেই আমাদের দেখা হতো ঘনঘন। এমনকি ট্রেনে পাশাপাশি সিটে বসে যাতায়াতও করেছি বহুবার। আমাদের গল্পে, কাজে, অবসরে চিত্রকলাই ছিল প্রধানতম আলোচ্য বিষয়।

ছেলেবেলা থেকেই নাসেরদার ছিল ছবির প্রতি টান। যেহেতু শিল্পীর কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম হয় না, তাই স্কুলে থাকতেই তিনি সরস্বতী ঠাকুর কিংবা দুর্গাপ্রতিমা গড়ার জন্য পেনসিলে খসড়াচিত্র এঁকে দিতেন। আঁকতেন চালচিত্রের নকশাও। আবার ইদ কিংবা বড়দিনে তাঁর তৈরি কাগজের নকশায় সেজে উঠত মসজিদ ও গির্জা। পরিণত বয়সে যে নাসেরের নামাঙ্কনে শোভিত হয়েছে বাংলার বহু লিটল ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ, সেই নাসেরের ক্যালিগ্রাফি-চর্চার সূচনাও কিন্তু শৈশবেই। সাদা কাগজে সংস্কৃত ও আরবি লিখতেন নানারকম শৈলীতে। তারপর স্কুল-কলেজের জীবনেও ছবি ছিল তাঁকে জড়িয়ে। মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে বিড়লা একাডেমিতে তাঁর একক ছবির প্রদর্শনী দেখে মুগ্ধতা প্রকাশ করেন এই উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন। যদিও সেই সব ছবি রচনার দিনে আমি নেহাতই স্কুলবালক। ফলে নিজের চোখে দেখার সুযোগ হয়নি সেই ঐশ্বর্যরাজির।

নাসেরদাকে জিজ্ঞেস করলে মুচকি হেসে পাশ কাটিয়ে যেতেন সেই প্রসঙ্গ। কবিতার জন্য সবকিছুকে তুচ্ছ করেছিলেন বলেই কি ছবি আঁকা থেকে সরে এসেছিলেন তিনি? কিন্তু তা-ই বা মানি কী করে? কলকাতার কোনও উল্লেখযোগ্য প্রদর্শনী থেকে তো কখনও দূরে থাকেননি তিনি। কবিতা ক্যাম্পের মতোই সহজ ও সচ্ছন্দ ছিলেন আর্ট-ওয়র্কশপগুলিতেও। উদ্যোগী ছিলেন শিল্পকলা নিয়ে লেখালিখিতেও। ‘কবিতা পাক্ষিক’-এর পাতায় অর্জুন মিশ্র ছদ্মনামে কত অপূর্ব সব ছবি-ভাস্কর্যের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। অনেকেই জানেন না নাসের হোসেন-এর ‘ভারতবর্ষ’ নামের বিখ্যাত কবিতাটিও ‘গান্ধার’ আর্ট গ্যালারিতেই প্রথম লেখা (১৯৯২)। পরবর্তীকালে সেই কবিতা ‘দেশ’-এ ছাপা হয়, ক্রমে সে দিগ্বিজয়ী হয়ে একদিন জায়গা করে নেয় ইউনেস্কো-র সংকলনেও।

স্বনামধন্য চিত্রশিল্পী অসিত পাল প্রতিষ্ঠিত ‘চলমান শিল্প আন্দোলন’-এর রজতজয়ন্তী উপলক্ষে কলকাতা রবীন্দ্রসদন-বাংলা আকাদেমি-গগনেন্দ্র প্রদর্শশালা চত্বরে আয়োজিত উৎসবে নাসেরদাই ছিলেন কো-অর্ডিনেটর। শিল্পী শুভাপ্রসন্নের অধুনা বিখ্যাত ‘আর্টস্ একর’ গড়ে তোলার প্রথম পর্যায়েও নাসেরদার ভূমিকা ছিল সক্রিয়। কবিতার মধ্যে আপাদমস্তক ডুবে থাকলেও তাঁকে আজীবন আলোকিত করে রেখেছিল ছবিই, এ কথা আমি অন্তত জানি। ভাস্কর বিমল কুণ্ডু একবার বলেছিলেন ‘নাসেরই একমাত্র কবি যিনি সমস্ত চিত্রভাস্কর্যের প্রদর্শনী নিয়ম করে দেখে থাকেন।’

এহেন শিল্পপ্রাণ মানুষকে শুধু কবিতার ভুবনে ছেড়ে দিই কী করে? আমি তাঁকে কেবলই ছবি আঁকতে বলতাম। আর তিনি সবিনয়ে মৃদু হেসে বলতেন ‘জানো তো, আমি নিজেকে কখনও কবি ভাবি না, শিল্পীও না। আমি কবিতা লিখি, ছবি আঁকার চেষ্টা করি— এইমাত্র। কিন্তু আমি কবি বা শিল্পী কোনওটাই নই।’ তাঁর এমন আত্মনির্মোহে বারবার চমৎকৃত হয়েছি। তবুও তাঁকে দিয়ে আঁকিয়ে নিতে পেরেছিলাম বেশ কয়েকটি রবীন্দ্র-প্রতিকৃতি। নন্দীগ্রামে গণহত্যার সময় আমাদের ‘উদ্ভাস’-এর আহ্বানে তিনি এঁকেছিলেন শহিদ-জননীর ছবি। সবই অবশ্য রেখাচিত্রে। তাঁর রেখার জোর ছিল তীব্র।

আমার গভীর বিশ্বাস নাসের হোসেনের সত্যিকারের শিরদাঁড়ার অস্তিত্ব কিন্তু তাঁর ছবিতেই প্রকাশিত। অসম্ভব দ্রুততায় তিনি ছবি আঁকতেন, অথচ কী সংযম। কোথাও অতিরিক্ত কিছু নেই। পাবলো পিকাসো ছিলেন তাঁর অন্যতম প্রিয় শিল্পী। পিকাসোর আঁকা ‘গোয়ের্নিকা’ ছবিটির কথা মাঝেমাঝেই বলতেন তিনি। সেই ছবির দৃঢ়তা তিনি আয়ত্ত করতে চেয়েছিলেন। ভীত, সন্ত্রস্ত, বিপন্ন মানুষ ও সভ্যতাকে পাল্টে দেওয়ার স্বপ্ন ছিল তাঁর। কেবলই বলতেন ‘শিল্পে বিষ বলে কিছু হয় না।’ মহান চিত্রশিল্পী দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের জীবন ও কাজ নিয়ে আমার লেখা বই ‘আগুন-তুলি’ নাসেরদা-কে উৎসর্গ করতে পেরে অসম্ভব আনন্দ পেয়েছিলাম। তিনিও পরম সন্তোষে রচনা করেছিলেন তাঁর একমাত্র গদ্যপুস্তিকা ‘বাংলার শিল্পী'(সপ্তম খণ্ড), যার মধ্যে আছে দুই বরণীয় চিত্রশিল্পী গোপাল ঘোষ ও মুকুল দে-র জীবনী। সেই বইয়ের উৎসর্গপত্রে তিনি আমার নামটি লিখে অভিভূত করেছিলেন।

নাসেরদার কাছে পাওয়া স্নেহধারা আমাকে যে কী ভাবে সুরভিত করে রাখে তা শুধু আমিই জানি। তাই বলতে ইচ্ছে করে, তাঁর প্রয়াণ সম্ভব, বিস্মৃতি অচিন্তনীয়।

অঙ্কন: নাসের হোসেন
ফিচার ছবিটি এঁকেছেন সুগত সেন