সাহানা নাগচৌধুরী

আফগানিস্তানের মিডিয়া আবার বিপন্ন। সরকার বিরোধী কোনও কিছু খবর করলেই কোতল হচ্ছেন মিডিয়া জগতের ব্যক্তিরা যাঁদের মধ্যে সাংবাদিকরাই প্রধান। প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে তাঁরা যে ভাবে দিনের পর দিন সংবাদ পরিবেশনের কাজ করে যাচ্ছেন, তাতে বিস্মিত সারা বিশ্বের সংবাদ জগৎ। কী ভাবে তাঁরা নিজেদের কর্তব্যে অবিচল থেকে এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছেন সেটাই দেখার। আফগানিস্তানে সাংবাদিকেরা (নারী-পুরুষ নির্বিচারে) খুন হচ্ছেন। আর এ ব্যাপারে  সম্পূর্ণ নীরব থাকছে রাষ্ট্র। দিনের পর দিন এক দমবন্ধ করা পরিবেশে থাকতে থাকতে দেশের নাগরিকদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। সাধারণ নাগরিকেরা এক ভয়াবহ পরিস্থিতিতে যে ভাবে দিনের পর দিন কাটাচ্ছেন, তাতে সারা বিশ্বকে আফগানিস্তান লজ্জা দিচ্ছে।

গত দু’বছরের মধ্যে এই দেশের নিরীহ নাগরিকেরা যে ভাবে রাষ্ট্র ও তালিবান— এই দুই প্রতিষ্ঠানের দ্বারা অত্যাচারিত ও খুন হয়েছেন, তা ভাবলে শিউরে উঠতে হয়। আফগানিস্তানের এই করুণ অবস্থার কথা দেশের সরকার চায় না বিশ্বের বাজারে প্রকাশিত হোক। সাংবাদিকদের পরিবেশিত খবরের মধ্যে দিয়ে যে ভাবে সেই দেশের ধূসর ছবি সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে তাতে দেশের সরকার খুবই অস্বস্তিতে আছে। তাঁদের সমস্ত রোষ সাংবাদিকদের উপরেই পড়ছে। ফলে সাংবাদিকেরাই যূপকাষ্ঠে বলি হচ্ছেন।

সম্প্রতি কাবুলের এক নামজাদা মহিলা সাংবাদিককে দুষ্কৃতীরা হত্যা করেছে। মালালাই মাইওয়াদ নামে ওই মহিলা সাংবাদিক পেশাগত কারণে যাচ্ছিলেন কাবুলের নানগারহার থেকে জালালবাদে। পথেই হামলাকারীরা তাঁর গাড়ির উপর আঘাত হানে। ঘটনাস্থলেই মারা যান মালালাই, সঙ্গে গাড়ির চালকও।

মালালাইয়ের হত্যার খবরে চমকে গিয়েছে আফগানিস্তানের মিডিয়া জগৎ। মালালাই যথেষ্ট নামজাদা এক সাংবাদিক ছিলেন। শুধু সংবাদপত্রই নয়, তিনি কাবুলের এক টিভি চ্যানেলের বিখ্যাত টক শো পরিচালনা করতেন। আগাগোড়া এই সাংবাদিক সরকার বা তালিবান গ্রুপের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে গিয়েছেন। ফলে তাঁর টক শো ছিল যেমন অত্যন্ত জনপ্রিয়, তেমন তাঁর কলমও ছিল জোরদার। এ ছাড়াও তিনি দেশের নানা ধরনের মানবাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। মালালাই হত্যার খবরে বিশ্বের মিডিয়া জগতে আবার শোরগোল পড়ে গেল। আফগানিস্তান যেরকম রক্তের খেলায় মেতে উঠেছে তাতে আবার ধিক্কৃত হতে থাকল দেশটি।

আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিটিও বড় ঘোরালো। নিজের দেশের সমস্যা তারা কিছুতেই নিজেরা মেটাতে পারছে না। ফলে বিশ্বের বৃহৎ দেশ আমেরিকা দাদাগিরি দেখানোর সুযোগও হাতছাড়া করতে চাইছে না। দীর্ঘদিন ধরে আফগানদের বুকের উপরে বসে থাকা মার্কিন সেনারা দেশের শান্তিরক্ষার ক্ষেত্রে কতখানি নিরাপদ সেটা এখন ভাববার বিষয়। যেমন ভাববার বিষয় সেখানকার তালিবানদের এ ব্যাপারে দীর্ঘ বিরোধিতা। একদিকে, আমেরিকার  সেনা ও অপর দিকে তালিবান সেনাদের অত্যাচারের চাপে পদপিষ্ট দেশটিতে যে দমবন্ধ করা পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে, সেই ব্যাপারেই সেখানকার মিডিয়া সংবাদগুলি প্রকাশ করছে। আর তাতেই তেতে উঠছে সরকার। সাংবাদিকেরা যতবার এ ব্যাপারে নিজেদের মত প্রকাশে সরব হয়েছেন, ততবারই তাঁদের মাথার উপরে নেমে এসেছে খাঁড়া। এ ছাড়া মিডিয়ার কণ্ঠরোধ করার জন্য তো তাদের উপর প্রয়োগ হচ্ছে  নানা ধরণের অত্যাচার।

অতএব, এটা বলাই যায়, আফগানিস্তানে সাংবাদিকেরা মুক্তচিন্তার প্রকাশ করতে গিয়ে নিজেদের জীবনে ডেকে আনছেন মৃত্যু। তার উপর এখনও পর্যন্ত এ দেশে রয়ে গিয়েছে এক বিশাল কুসংস্কারাচ্ছন্ন এক সমাজ। যার বিরুদ্ধে বারবার গর্জে উঠছে দেশের নারী সমাজ। এ দেশের মহিলা সাংবাদিকতা কতখানি ঝুঁকির, তা অন্য কোনও আধুনিক দেশের মহিলাদের ধারণার বাইরে। সাংবাদিকতার মতো আধুনিক পেশাতে মহিলাদের প্রবেশাধিকার যে কোনও উপায়ে কুসংস্কারাচ্ছন্ন পুরুষসমাজ রুখতে চায়। রোশনাই নামে এক-নিউজ় চ্যানেলের ডিরেক্টর সাদিকা মেরওয়াই একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘‘জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমরা মহিলা সাংবাদিকেরা কাজ করে যাই। আফগানিস্তানের মহিলা সাংবাদিকেরা সারাক্ষণ হুমকির উপর কাজ করে যাচ্ছে। আর এ ক্ষেত্রে শুধুই তালিবানি সমাজ নয়, অন্য ক্ষেত্রে প্রাচীনপন্থী পুরুষেরাও এককাট্টা। আফগানিস্তানের মতো এ রকম মুসলিম দেশের মহিলাদের মিডিয়া জগতে কাজ করতে দিতে এরা কেউই চায় না।”

বোঝাই যায় দীর্ঘদিনের পর্দাপ্রথার বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রের দমননীতির বিরুদ্ধে, নিষ্ঠুর তালিবানি প্রথার বিরুদ্ধে একজন আফগানি মহিলা কতখানি অসহায়। চোখের সামনে এ ভাবে মহিলা সাংবাদিকদের হত্যা হতে দেখেও সরকার নীরব। কিন্ত দেশের মহিলারা মনে করছেন, তাঁদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে। তাই তাঁদের কাছে এখন বড় চ্যালেঞ্জ পর্দাপ্রথার অবসান। তাঁদের অনমনীয় জেদের জোরে আজ ওই দেশের মহিলা সাংবাদিকেরা বিশ্বের অন্য দেশের মহিলা সাংবাদিকদের সঙ্গে পা মিলিয়ে চলতে চাইছেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাঁরা যেভাবে সাহসের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন তাঁদের এই সাহসকে সত্যি সত্যিই কুর্নিশ করতে হয়।

এই প্রসঙ্গে বলা দরকার, শুধু আফগানিস্তানেই নয়, আজ সারা বিশ্বে নিরপেক্ষ ভাবে সংবাদ পরিবেশন করাই সাংবাদিকদের কাছে বড় কঠিন পেশায় পরিণত হচ্ছে। ‘মিডিয়া’র কী কাজ? দিনের আলোর মতো সত্যনিষ্ঠ তথ্যকে জনসমক্ষে আনা। আর এটা যতটা জোরের সঙ্গে, সাহসের সঙ্গে করা যাবে, ততই মিডিয়া জগৎ বা সাংবাদিকেরা সেইসব ব্যক্তি কি প্রতিষ্ঠানের অপছন্দের তালিকায় থাকবে। এই অতিমারির আবহে আফগানিস্তান নিজেদের দেশের নানা অশান্তিতে জড়িয়ে পড়েছে। সেখানে করোনা এখন এমন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে, তা নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার ব্যর্থ। এই খবর প্রকাশ্যে আসুক, এটা সরকার চায় না। সাংবাদিকদের মাধ্যমে এই খবর দেশের বাইরে যাক, এটাও সরকার চায় না। ফলে কোতল করো সাংবাদিকদের।

এ বছর আফগানিস্তানে দশ জন সাংবাদিক এখনও পর্যন্ত শহিদ হয়েছেন। তবে শুধুই আফগানিস্তান নয়, মিডিয়া জগৎকে এখন বিশ্বের তাবড় তাবড় সব দেশের সরকারই চায় তাদের মুঠোর মধ্যে রাখতে। সাংবাদিকরা এই রাস্তায় না হাঁটলেই তাঁদের কপালে জুটছে হয় গ্রেফতার নয় হত্যা। সারা বিশ্বে এমন ঘটনার পারদই ঊর্ধ্বমুখী। আর এ দেশে? দিনদিন এখানকার মিডিয়া জগতে বহু অশুভ কালো ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। এখানেও শুরু হয়ে গিয়েছে তালিবানি প্রথার প্রয়োগ। তালিবানি বড় ছোঁয়াচে প্রথা, তা করোনার থেকেও দ্রুত ছড়ায়। এ দেশেও এ বছর সাংবাদিক হত্যার সংখ্যাটি কম নয়। এখন মিডিয়া জগতের এ ব্যাপারে ভাবনা-চিন্তার সময় এসে গিয়েছে। তাদের কর্তব্য কী? প্রতিবাদ? প্রতিরোধ? নাকি আত্মবিসর্জন?

(ফিচার ও মালালাই মাইওয়াদের ছবি গুগল থেকে নেওয়া)