সোহম চক্রবর্তী

সময় বুঝি এগোয় না আর স্মৃতির ভিড়ে–

বারান্দাতে বরফ হাওয়া, স্লেজের গাড়ি

না-ই বা ছিল, ক্রান্তীয় দেশ, এই শহরে…

বললে তবু সান্তা ঠাকুর সাজতে পারি।

 

রঙিন চোখের রঙবেরঙের ইচ্ছেডানা,

আস্ত একটা আকাশ লিখি নিজের নামে –

স্বপ্নেরা সব ঘুম জোনাকি, হরিণ টানা

স্লেজের গাড়ি স্টেশনে ঝিম একলা থামে।

 

আজকে যদি চাই হাওয়াদের উড়ান যত,

আজকে যদি ঘুমন্ত দিন মুঠোয় রাখি…

আজকে যদি মোজায় মোজায় আগের মতো

ঘুমভাঙানি গান রেখে যায় শীতের পাখি–

 

আসবে তুমি, সান্তা ঠাকুর, মাথার পাশে?

ছোট্টবেলার দিনগুলো চাই এ ক্রিসমাসে…

 

ছোটবেলা এক জলজ্যান্ত সান্তাক্লজ! ক্রিসমাসের রাতে আগে আগে ঘুমিয়ে পড়লেই বাইরের দরজায় ঝোলানো ব্যাগখানা ভর্তি করে চুপিচুপি উপহার রেখে যায় সে। হ্যাঁ, মোজা নয়, ব্যাগ। ওইটুকু মোজায় আর কতটুকুই বা ধরবে– এই একটা ভারী দুশ্চিন্তায় ঝুলিয়ে দেওয়া মস্ত একটা ব্যাগ। সে ব্যাগখানাই ভরপুর উপচে ওঠে পরের সকালে। ভোর ভোর ঘুম ভেঙেই ছুট ছুট ছুট! এইবার পাওয়া গেছে বই, পেন আর ইয়াব্বড়ো চকলেটের বক্স– কিংবা, ভারী রঙচঙে বাহারি একটা জ্যাকেট, কোনওবার। সান্তাবুড়ো কী ভাবে যে এই পৃথিবীর সব্বাইকার ভালবাসার খুঁটিনাটি খবর রাখে আর ক্রিসমাসে ক্রিসমাসে তা-ই দিয়ে যায় ঝোলাভর্তি করে, সেই সময় এটা ছিল একটা বড় আশ্চর্যের কথা। পিঠোপিঠি মাসতুতো বোনকে সে-কথা বলতে সে তো হেসেই কুটোপাটি, “আরে সান্তাক্লজ-টজ কিচ্ছু নেই রে পাগল, ওগুলো তো ছোটমাসি আর মেসো রেখে দেয় তুই ঘুমিয়ে পড়লে।” ভারী বিরক্ত লাগে। নিতান্ত বোকা আর বেরসিক বুঝে কথা বাড়াই না আর। বরং সন্ধেয় ঘুরতে যাই বড়দিনের মেলা। কৃষ্ণনগরের বৃদ্ধ ক্যাথিড্রাল আলোয় আলোয় ঝলমল করে। চোখ ধাঁধানো আলোর সাজে সেজে ওঠে খ্রীস্টমন্দির। মুখর জনস্রোতে লোলচর্ম শীতের হাওয়া বয়ে চলে আনন্দিত। ‘আজি শুভদিনে পিতার ভবনে অমৃতসদনে চলো যাই’। গান বাজে মোড়ের মাইকে। বাদামভাজার পাশের স্টলে মাটির পুতুল। ক্রুশবিদ্ধ যিশুর দু’-পাশে আয়তনয়ন শিব আর চৈতন্যদেব। এই দৃশ্যটা আলাদা ক’রে কিছু ভাবায় কিনা, তখনও বুঝিনি। ক্রিসমাসের সন্ধেবেলা তুলসীতলার শাঁখ বেজে উঠতেই ছোট্ট পুতুল-যিশুর পাশে জ্বেলে দিয়েছি মোমবাতি, প্লেটে রেখেছি কেকের প্রসাদ, দুই হাত জোড় ক’রে প্রণাম করেছি। টিভিতে শুনেছি, ২৫ ডিসেম্বরে ভবতারিণী মায়ের বাড়ি সরোদ বাজাচ্ছেন আমান আলি খান। এটা যে খুব লক্ষ্য করার মতো কিছু, মনে হয়নি তখনও আমার। ক্রিসমাসে ক্রিসমাসে শুধু হইহল্লায়-গানে চুপিচুপি বয়স বেড়েছে…

আস্তে আস্তে শীতের রোদ্দুর স’রে গিয়ে ঘিরে ধরে বয়সের হিম-হিম ছায়া। ছোটবেলা নামের সান্তাক্লজ বাড়ির ঠিকানা ভুলে যায়। বোকা ও বেরসিক বোনের কথাটাই ধীরে ধীরে সত্যি মনে হতে থাকে। কোনও এক ক্রিসমাস থেকে বাইরের দরজায় আর কখনও ঝোলানো হয় না ব্যাগ, সময়ের গাঢ় ইরেজারে লিস্ট থেকে নাম মুছে দেয় সান্তাবুড়ো। আমার ভালবাসাটির কথা মনে রাখার আর দায় থাকে না কারও। চার্চের ভিড় মাঠে অহরহ রোল রিভার্সাল… যিশুর পাশে শিবের কথা– যিশুর পাশে চৈতন্যদেব, দক্ষিণেশ্বরে আকুল সরোদ আমান আলির– মনে হয় আলাদা করে লিখি… শিশুর আঙুল গলে উড়ে যায় বেলুনের সুতো – মৃদু শীত, কিশোরবেলার। তবু তো ক্রিসমাস আসে, ক্রিসমাস যায়। বয়সের ক্রূর ক্রুশে বিদ্ধ হয় মন। উণ্ডস্ অফ লাভ, উণ্ডস্ অফ হেট্রেড। আমরাও নতশির, দু’-বাহু ছড়াই – প্রশান্ত প্রজ্ঞার পাঠে শান্ত করি অবুঝ অভিমান। মেনে নিতে শিখি…

যেন এক শ্যামল শীতের বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছি আজীবন। পৌষের ফুরফুরে মাঠ আর ক্যাথিড্রালের প্রাজ্ঞ ঘণ্টার মাঝামাঝি পৃথিবীর সমস্ত বয়স বিছিয়ে দেয় সে। নবান্নের ধান ওঠে, গেরস্ত চৌকাঠে জল-পায়ে ছুটে আসেন লক্ষ্মী ঠাকরুণ। লাল-লাল টুপি-পরা ছেলেমেয়ে আকাশের গায়ে আঁকে হরিণের স্লেজ, বিকেলের রোদে যেন মেঘ-রং অপেক্ষা শুকোয়। পৃথিবীর সমস্ত বয়স মাথা নাড়ে উত্তরের আলতো হাওয়ায়। এমন তকতকে দুপুর লুটিয়ে থাকা ছাদে উঠতে উঠতেই যে বড় হয়ে উঠলাম কখন… নীচে পাড়ার মতো সাঁতরে গেল পাড়া, গলির মতো গলি, মুখের মতো মুখ… ঘরের মতো ঘর পাল্টে নিল চেনা অচেনা অসংখ্য মানুষ। যেন এক শূন্য শীতের বুকে পা রেখে দাঁড়িয়েছি আজীবন। হিম নৈঃশব্দ্যের মতো ঝরে গেছে ছোটবেলা, উষ্ণ ওমের যৌবন ধিকিধিকি আগুনে পুড়েছে। আসলে বয়স হলে ধানক্ষেতের সিল্যুয়েট থেকে ফায়ারপ্লেসের বিবর্ণতার দিকে একা একা হেঁটে যায় সমস্ত শীতকাল। তোমার কথা মনে পড়ে। ভেজা দস্তানা গলে বহুদূর উড়ে যায় স্মৃতি। এই নতজানু ঘুম আমিও তো অনেক চেয়েছি, সুপর্ণা। মানুষের পদশব্দে থেকে থেকে চমকে উঠেছি। যেন এক নীরব শীতের বুকে বুক পেতে দিয়েছি আজীবন। তোমাকে লিখতে চেয়ে পৃথিবীর বয়স বেড়েছে। পৌষের ফুরফুরে মাঠ থেকে ক্যাথিড্রালের প্রাজ্ঞ ঘণ্টা দূরে সরে গিয়েছে দিনে দিনে। এই আমি দু’হাত ছড়াই – পৃথিবীর বয়সী হয়ে উঠি। এইবারে আয় আলো, পাখি আয়, দস্যি মেয়ের মতো লুটোপুটি হাওয়া খেলে যা। ছুটে আয় লক্ষ্মী ঠাকরুণ, লাল লাল টুপি পরা ছেলেমেয়ে আয়। আয় সব হারানো মানুষ, গালিচা গুটোনো রোদের বিকেল – ছাদ আয়, মাটি আয়, আয় আয় সমস্ত উঠোন… যেন এক আপন শীতের বুকে দরজা খুলে রেখেছি আজীবন। তোমাকে লিখতে চেয়ে কবে যেন বসন্ত এসেছে…

এই শহরের আলতো ডিসেম্বরে

ওই শহরের কুয়াশানীল হাওয়া

শীতের চিঠি ফিরিয়ে দেয় খালি

ডাকপিওনের স্টেশন ছেড়ে যাওয়া

 

ট্রেনের ঠোঁটে রাখালবেলার বাঁশি

নিরুত্তরে, নীরবতার বুকে…

কার্নিশে চুপ রোদের মতো নিভে

যাওয়ার কথা বলেছে বন্ধুকে।

 

এই শহরের হঠাৎ নিভে যাওয়া

ওই শহরের স্তব্ধ হ্যালোজেনে,

আমার চিঠি ফেরত আসে খালি

ডাকপিওনের বাড়ি ফেরার ট্রেনে…

 

ট্রেনের ঠোঁটে রাখালবেলার বাঁশি

‘সুরের হাওয়া চলে গগন বেয়ে’ –

সব শহরের ডিসেম্বরই বুঝি

আমার প্রেমে দুখজাগানি মেয়ে!

 

(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)