লিপিকা নাথ

সমস্ত কাজ, স্নান, পুজো সেরে যখন ডাইনিং টেবিলে আসে মধুরিমা, তখন সূর্য তার পশ্চিমের ব্যালকনিতে নরম রোদ পোহাচ্ছে। নিজের জন্য খাবার বেড়ে চেয়ার টেনে বসতে গিয়েও চেয়ার সরিয়ে ভাতের প্লেটটা নিয়ে চলে আসে ব্যালকনিতে। কার্পেটের ধার ঘেঁষে রোদে পিঠ পেতে বসে পড়ে মধুরিমা। ভাতের গ্রাস মুখে তুলতে তুলতে কোথায় যেন হারিয়ে যায় সে। যেন টাইম-মেশিনে এক লহমায় পৌঁছে যায় প্রায় তিরিশ বছর আগের সেই দুপুরগুলোতে।

ঠিক এ ভাবেই উষ্ণ কিন্তু নরম উলের গোলার মতো শীত আসত তাদের মফসসলের বাড়ির ছাদে। কোনও এক অলিখিত নিয়মে, তখন শুধু তাদের ছাদেই নয়, প্রতিটি ছাদেই দুপুরবেলায় যেন চড়ুইভাতি চলত। মধুরিমার মনে পড়ে, স্নান সেরে ভিজে চুল আর ঠান্ডা লেপ রোদে সেঁকতে সোজা চলে আসত ছাদে। শীত এলেই সাদা মার্কিন কাপড়ের কভার পরানো লাল লেপের সেই গন্ধ পায় মধুরিমা। যতই বাহারি কম্বল আসুক, এখনও তার কাছে লেপের কোনও বিকল্প নেই। মাদুর পেতে ছাদে বসেই রোদের পিঠে পিঠ দিয়ে একথালা চচ্চড়ি মাখা ভাত খেয়ে সোজা সে ঢুকে পড়ত লেপের মধ্যে। শুধু নাক আর দুটো চোখ বের করে উপুড় হয়ে শুয়ে শেষ হয়ে যেত একের পর এক ফেলুদা, ব্যোমকেশ, শরদিন্দু, বিভূতিভূষণ। পাশের বাড়ির ছাদে তখন খাওয়া দাওয়া সেরে শীলা কাকিমা একমনে বুনে চলেছে সোয়েটার। মধুরিমার মা এসে একবার পাশেই সাদা কাপড়ের উপর শুকোতে দেওয়া বড়ির তদারকি করে বলে যায়, ‘‘বড়িগুলো চোখে চোখে রাখিস কিন্তু।’’ রেডিয়োতে তখন স্থানীয় সংবাদের পরে শুরু হয়েছে অনুরোধের আসর। ভেসে আসছে অতুলপ্রসাদ— ‘ওগো নিঠুর দরদী, একি খেলছো অনুক্ষণ/তোমার কাঁটায় ভরা বন, তোমার প্রেমে ভরা মন…’

কখন যে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হত, মধুরিমার সে খেয়ালই থাকত না। চমক ভাঙত মায়ের পিলে চমকানো চিৎকারে— ‘‘আর কতক্ষণ গল্পের বই মুখে পড়ে থাকবি রে? এ দিকে যে পলাশের আসার সময় হয়ে গেল।’’ পলাশদা, মধুরিমার গানের মাস্টারমশাই। মধুরিমার জীবনে যেন মূর্তিমান ভিলেন। এইসব রবিবারের বিকেলগুলো ছিল খুব মনখারাপের। কারণ, শীতকালে বিকেলের মেয়াদ বড্ড কম। গান শেখা শেষ হতে না হতেই মাঠের ওপাশে ঝুপ করে নেমে আসত সন্ধ্যা। রাস্তার ধারে ল্যাম্প পোস্টগুলোর আলো জ্বলে উঠত। মধুরিমার আর খেলতে যাওয়া হত না। এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে লেপ, বই, শুকোতে দেওয়া বড়ি নিয়ে হুড়মুড়িয়ে নামত মধুরিমা। কত বার লেপ পায়ে জড়িয়ে পড়েও গিয়েছে সে। তবে লেপের উপর পড়ায় লাগত না বিশেষ। তারপরে কোনওরকমে চুল বেঁধে, হাতে-পায়ে বোরোপ্লাস ঘষে হারমোনিয়াম টেনে নিয়ে বসত। চোখ চলে যেত জানলা দিয়ে বাইরে, মাঠের দিকে। বন্ধুদের ডাক উপেক্ষা করে তিরিক্ষে মেজাজ নিয়ে চলতো গলা সাধা। এমনকি পলাশদার উপর রাগ করে বেজার মুখে সে শুরু করত— ‘সখী এরি আলী, পিয়া বিনা…’

গান গাইতে গাইতে মধুরিমা বেশ বুঝতে পারত, বন্ধুরা টহল দিয়ে যাচ্ছে তার আশায়। কখনও কখনও জানলার নীচে থেকে ভেসে আসত মৃদু ডাক। সে ডাক কৃষ্ণের বাঁশি শুনে রাধার আকুলতাকেও হার মানিয়ে কানের ভেতর দিয়ে মরমে ধাক্কা দিত। কপাল খারাপ থাকলে সেদিনই মাঠে স্পেশ্যাল ক্রিকেট ম্যাচ, আর বন্ধুর দাদার নীরব হাতছানি। সুনীল গাভাস্কার স্টাইলে ছক্কা মেরে একটা প্রবল ‘হাউজ দ্যাট’ শুনে ঘরের ভেতর থেকেও মধুরিমা বুঝতে পারত, একজোড়া চোখ বারবার আড়চোখে তাদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে কিসের যেন প্রতীক্ষায়।

সামনে বসা পলাশদা মধুরিমার এই ছটফটানি টেরও পেত না। অথবা পেলেও হয়তো গুরুত্ব দিত না। অদম্য উৎসাহ নিয়ে তখন সে কেদার রাগের আরোহ অবরোহে মগ্ন। হারমোনিয়ামের বেলো বাজাতে গিয়ে হঠাৎ পলাশদার হাত মধুরিমার আঙুল স্পর্শ করে আলতো, অসাবধানেই হয়তো। কিন্তু পলাশদার চোখের দিকে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত থমকে যেত মধুরিমা। মনে হত, কিছু কি বলতে চায় পলাশদা? কিসের যেন আকুলতা! মধুরিমা ভাবত, সে মন দিয়ে গাইছে না বলে হয়তো আক্ষেপ ঝরে পড়ত পলাশদার দৃষ্টিতে।

মধ্য চল্লিশের মধুরিমা দক্ষিণ কলকাতার বারো তলার ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে শীতের দুপুরে মড়া সূর্যের ওম নিতে নিতে ভাবে, আচ্ছা সে দিন হারমোনিয়ামের বেলোর উপর পলাশদার হাত যে তার অনামিকা স্পর্শ করেছিল, সেকি নেহাতই অসাবধানে? নাহলে এত স্পষ্ট করে কী করে আজও মধুরিমার কানে বাজে পলাশদার সেই মনকেমন করা গলা— ‘কে আবার বাজায় বাঁশি, এ ভাঙা কুঞ্জবনে…।’

(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)