সুদীপ জোয়ারদার

‘মাঝখানের এই গোলমালটা একেবারে মুছিয়া ফেলিবার জন্য মহেন্দ্র প্রস্তাব করিল, “আসছে রবিবারে দমদমের বাগানে চড়িভাতি করিয়া আসা যাক।”

‘চোখের বালি’র এই চড়িভাতির সময়কাল শরৎ। আমাদের কাছে চড়িভাতির আসল সময়কাল কিন্তু শীত। বাইরে পিকনিক অবশ্য গ্রীষ্মকালেই হয়। প্রতি বছর ১৮ জুন ‘আন্তর্জাতিক বনভোজন দিবস’ পালিতও হয় অনেক জায়গায়। বাইরে সে যা হয় হোক, বনভোজন বা চড়িভাতি কিংবা চড়ুইভাতি অথবা ফিস্ট আমাদের কাছে শীতকালের এক মজাদার উৎসব।

‘মানুষ যখন পাকা ক’রে প্রাচীর তোলে নাই/ মাঠে বনে শৈলগুহায় যখন তাহার ঠাঁই,/সেই দিনকার আলগা-বিধির বাইরে-ঘোরা প্রাণ/মাঝে মাঝে রক্তে আজও লাগায় মন্ত্রগান’(‘বনভোজন’/রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)। এবং সেই মন্ত্রগান আবহাওয়া অনুকূল হয়ে এলেই তাকে ঘরছাড়া করতে উঠে পড়ে লাগে। তাই তো, এখানে শীতের পরশ লাগতেই খোলা আকাশের নীচে দুপুর বা রাতে চলে চড়ুইভাতির আয়োজন।

আমাদের গ্রামের দিকে কিন্তু চড়ুইভাতি, বনভোজন বা পিকনিক এইসব ভারী শব্দের প্রচলন ছিল না ছেলেবেলায়। ফিস্ট অবশ্য ছিল, তবে তার রকমসকম মনে হত একটু বেশিই আমিষ-ঘেঁষা। ফলে ফিস্টের সঙ্গে ছেলেবেলায় সখ্য ছিল না বড়। আমাদের ছিল, ‘পৌষল্যা’। যা পৌষের উৎসব হলেও গ্রামীণ বনভোজনের অন্য নাম হয়ে গিয়েছিল কালক্রমে।

‘সেদিন তাহার দিদি চুপিচুপি বলে—‘চড়ুইভাতি করবি অপু?’ অপু-দুর্গার এই চড়ুইভাতির সঙ্গে আমাদের পৌষল্যার খানিকটা মিল থাকলেও তার আয়োজন এত চুপিচুপি ছিল না। যেখানটায় করা হবে, সে জায়গা নির্বাচন করা, পরিষ্কার করা, কচিকাঁচাদের এ বাবদে উৎসাহ, একেবারে সোরগোল পড়ে যেত পাড়ায়।

তারপরে, ‘বারে বারে ঘটি ভরে জল তুলে কেউ আনে,/কেউ চলেছে কাঠের খোঁজে আমবাগানের পানে।/হাঁসের ডিমের সন্ধানে কেউ গেল গাঁয়ের মাঝে,/তিনকন্যা লেগে গেল রান্না করার কাজে।’ রবীন্দ্রনাথের এই ‘বনভোজন’ কবিতার মতোই ছিল অনেকটা। তবে রাতের দিকে হলে চিত্র কিছু ভিন্ন হত। তখন রাতের দিকে পৌষল্যার আয়োজন নেহাত কম হত না। যদিও রাতের পৌষল্যায় সদস্যসংখ্যা দিনের মতো থাকত না। আর এই রাতের পৌষল্যা, বেশিরভাগ বছর চব্বিশে ডিসেম্বর রেজাল্ট বেরোনোর দিনটিতে যদি না-ও হত, বছরের শেষ দিনটিতে তো অবশ্যম্ভাবী।

স্থান হিসাবে আমাদের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল বাড়ির সামনের আইড়ি (অড়হর) খেত। খোলা আকাশের নীচে উনুন জ্বলছে দাউদাউ। উনুনের চারপাশে গুটিসুটি মেরে বসে আছি কয়েকজন। ঝলমলে বৈদ্যুতিক আলো তখন ভবিষ্যতের গর্ভে। আলো বলতে হ্যারিকেন, ডিম লাইট আর লম্ফ। কতটুকু আর আলো হয়! অদূরের গাঢ় অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মনে হত, আমরা যেন ‘এসেছি দৈব পিকনিকে।’ (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)

একটু দূরে যেতে সাহস নেই। অন্ধকার আর শীত একেবারে জাপটে ধরবে। এই ‘দৈব পিকনিকে’ দৈব ঘটনাও দু’একটা ঘটে যেত কখনও সখনও। হয়ত একটা তারা খসে পড়ল হঠাৎ। খোলা আকাশের  নীচে থাকলে খোলা আকাশের এ কাণ্ড কারও না কারও নজরে পড়বেই। কিন্তু তারাখসা দেখা মানে তো নেমে আসতে চলেছে কোনও অমঙ্গল সে-দর্শকের জীবনে। গাঁ-গঞ্জে তখন ছড়িয়ে রয়েছে এমনই কুসংস্কার। পরিত্রাণের উপায় কি নেই? রয়েছে বইকি! সঙ্গে সঙ্গে আউড়াতে হবে সাত ফুল আর সাত ব্রাহ্মণের নাম। সাত ফুল যদি বা খুঁজে পেতে বলা গেল, সাত ব্রাহ্মণ? বালক-বালিকাদের এ সমস্যার কথা অনুমান করে কোনও এক অতীতে দরদি কোনও পূর্বজ সাত ব্রাহ্মণের নাম ছড়ার মতো করে সাজিয়ে ছড়িয়ে রেখেছেন চৌহদ্দিতে— ‘লাটু, পুটু, শ্যামা, বুদু, সুধীর, অরুণ, অশ্বিনী।’ তারা-খসা দেখা বালক বা বালিকা সাত ফুলের নাম বলেই শ্লোকের মতো আওড়ে যেত সাত ব্রাহ্মণের নামগান।

অন্ধকার, তবুও এরই মধ্যে একটু ডাকাবুকো কেউ সামনের কোনও খেজুরগাছ থেকে রসের ঠিলি (কলসি) খুলে নিয়ে এসে হাজির হত। জিরেন কাঠ (বিরতির পরের দিনের) হলে তো বিরাট ব্যাপার। না হলেও ক্ষতি নেই। খাওয়ার আগে শুধু দেখে নেওয়া চুরি ঠেকাতে কোনও অপদ্রব্য ওখানে মেশানো রয়েছে কিনা। শীতের মধ্যে খেজুর রসে শীত আরও বেড়ে যেত। এ সময় কেউ অজিত পান্ডে নকল করে বেসুরো এবং সত্যি সত্যি কম্পিত গলায় গেয়ে উঠত, ‘জারে কাঁইপছে আমার গা।’

তখন আলাদা করে কুটোকাটা জোগাড় করে চলত আগুন জ্বালানোর আয়োজন। এই কুটোকাটা হিমপড়া শীতের রাতে জোগাড় করা সহজ ছিল না মোটেই। অনেক সময় পড়শির খড়ের পাঁজা থেকে কিংবা পোয়ালের (নেতিয়ে যাওয়া খড়) স্তুপ থেকে খড়ের আঁটি বা পোয়ালের রাশি চুপিসারে টেনে এনে চলত আগুনের আয়োজন।

এ দিকে অপটু হাতে চলছে হাতা-খুন্তির কোরাস। ‘অপুর এখনও বিশ্বাস হইতেছিল না যে এখানে সত্যিকারের ভাত-তরকারি রান্না হইবে না খেলাঘরের।’ অপুর মতো অবস্থা তখন আমাদের অনেকেরই। চোখের সামনে চাল ফুটে ভাত হচ্ছে, সেদ্ধ ডিম হলুদে লঙ্কায় মিশে হয়ে যাচ্ছে সত্যিকারের ডিমের ঝোল। শৈশবের প্রথম বনভোজন হলে, এর চাইতে আশ্চর্যের বুঝি আর কিছু ছিল না।

রান্নার পরে খাওয়ার পালা। তবে শুধু নিজেরা খেলেই তো চলবে না। চারটে সারমেয় সন্ধে থেকে বসে আছে অনেক প্রত্যাশা নিয়ে। নিজেদের খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চলে অদূরে সারমেয়দেরও আহার। খাওয়ার পরে বাসন পরিষ্কার করার ঝামেলা শীতের রাতে নেওয়া কঠিন। তার উপর যদি সামনের মাঠে রামযাত্রার আসরে যাবার পরিকল্পনা থাকে। খাওয়ার সময়েই মেয়েদের মধ্যে পরের দিন বাসন পরিষ্কারের সময় নিয়েও কথা হয়ে যেত।

আমাদের পৌষল্যা এ ভাবে ‘দৈব পিকনিক’ হয়ে আবার অপেক্ষা করত পরের বছরের। চারপাশে অবশ্য পৌষ জুড়েই পৌষল্যার আয়োজন। পৌষ সংক্রান্তির দিন এই উদ্দেশে নিম্নজীবী মানুষেরা দল বেঁধে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরতেন রসদ সংগ্রহের জন্য। ‘বল হরি শিব/এক কাঠা চাল, দশটা বড়ি/এই বাড়িতে লিব।’ এতটা প্রত্যাশা পূরণ না হলেও খালি হাতে তাঁরা ফিরতেন না কোনও বাড়ি থেকেই।

‘আজ খুব শীত। কচুপাতা থেকে টুপটুপ করে হিম পড়ে। …চড়ি-ভাতি হবে।’ সহজপাঠের এই চড়ি-ভাতি পৌষের না হওয়ারই বেশি সম্ভাবনা। কারণ, এই চড়ি-ভাতি তে দেখছি, ‘ঝুড়ি নিতে হবে। তাতে কুল ভ’রে নিয়ে বাড়ি যাব।’ কুল পাকতে পাকতে তো আমাদের কুলগাছগুলোতে মাঘের অনেকটাই হয়ে যায়।

তবে ঘটনা হল, পৌষ পেরিয়ে মাঘেও যে গাঁ-গেরামে পৌষল্যা জমত না তা নয়। কিন্তু আমাদের প্রাণের যোগ যে বনভোজনের সঙ্গে তা প্রাণ পেত পৌষের রোদেলা দুপুরে বা হিমেল রাত্রিতেই। আর আমাদের এই পৌষল্যাতেই যেন দিনটা ‘ছুটির নৌকো’ হয়ে, বাঁধন-রশি খুলে ভেসে যেত এক আনন্দের ঘাট থেকে অন্য আনন্দের ঘাটে।

(সহজ পাঠ- এর ছবিটি গুগল থেকে নেওয়া)