আব্দুর রউফ আনসারী

লর্ড ক্লাইভ পলাশির যুদ্ধের পরে মুর্শিদাবাদে প্রবেশ করবেন। ক্ষমতা হস্তান্তর করে লুটের ধন-সম্পদ দিয়ে পাওনা-গণ্ডা মেটাবেন। এ দিকে নবাব আত্মগোপন করে সেনাবাহিনী গঠনের আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন। রাজধানীতে প্রবেশ করতে ভয় পাচ্ছেন ক্লাইভও। গুপ্তচর দিয়ে খোঁজ নিচ্ছেন রাজধানীর হাল-হকিকত। গুপ্ত আক্রমণ হতে পারে, জনবিস্ফোরণ হতে পারে। সমস্ত খবর নিয়ে সেনাবাহিনীর সঙ্গে  অতি সাবধানে মুর্শিদাবাদে প্রবেশ করলেন ক্লাইভ।

সেদিন জনবিস্ফোরণ হয়েছিল। বহু গ্রাম থেকে আসা কয়েক হাজার জনতা রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়েছিল। তারা একটা করে ঢিল ছুড়লে এক বৃহৎ সমাধিক্ষেত্র তৈরি হতে পারত। তবে সে দিনের আমজনতা ঢিল ছোড়েনি। স্লোগান দেয়নি। উৎসুক জনতা চোখ ভরে বিলিতি লোক দেখতে এসেছিল।

আমরা আমজনতারা কমবেশি এমনটাই। স্বাধীনতার পতাকা উড়ুক কিংবা পরাধীনতার, আমজনতা একই থাকে। তারা ধ্রুবক। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের ‘মিনিমাম কোয়ালিটি’ অধিগ্রহণের জন্য আজীবন চেষ্টা করে যায়। কাকভোরে উঠে দিনের অন্ন সংগ্রহে বেরিয়ে পড়ে। নানারকম না পাওয়া ও সামান্য পাওয়ার আনন্দ নিয়ে ঘাস-জীবনের দিনগুলো কাটিয়ে দেয়।

আর এই ‘মিনিমাম কোয়ালিটি’ জীবনের স্বপ্ন সামনে ঝুলিয়ে রেখে যুগে যুগে শাসকেরা শাসন ও শোষকরা শোষণ করে যায়। আমজনতা স্বপ্ন ছোঁয়ার নেশায়, অচ্ছে দিনের আশায় ছুটে চলে। ছুটেই চলে। বিন্দু বিন্দু জলের অসীম ক্ষমতা। তার সর্বস্ব শক্তি নিঃশেষ করে সাগর গড়ে তোলে। হয়ে যায় নোনাজল। জনতা তাদের ভোট ও সমস্ত শক্তি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী গঠন করে। তারপরে শক্তি হারিয়ে নোনাজলের অদ্ভুত আচরণে নিষ্পেষিত হতে থাকে। ফের কাটাতে থাকে সেই চেনা ঘাস-জীবন।

সেই ঘাস-জীবন মহামানবের চরণে অতিষ্ঠ হতে হতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আবার চরণধূলি না পেলে ফনফনিয়ে বেড়ে উঠেও শেষতক খাদ্য হয়ে যায়। আবারও পরিবর্তনের স্বপ্ন আসে, আসে অচ্ছে দিনের স্বপ্ন। কিন্তু খাদ্য শৃঙ্খলের পরিবর্তন হয় না। ঘাস > ফড়িং > ব্যাঙ > সাপ> ঈগল এই পিরামিড থাকে। উৎপাদকের দিকে সর্বোচ্চ শ্রেণির খাদকের নজর থাকে না। পরোয়াও করে না। উৎপাদক তাদের উৎপাদন বন্ধ করলে খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়বে। আসবে অতিমারি কিংবা ঘটবে মহাবিদ্রোহ। ঘাস বিদ্রোহ করতে জানে না।

সমাজ শৃঙ্খলের পরিবর্তন সর্বোচ্চ শ্রেণির খাদক হতে দেয় না। উৎপাদকদের ঘাস-জীবনে রেখে দেয়। সমাজ শৃঙ্খলের পিরামিডে দেখি; জনগণ > কর্মী > নেতা > মন্ত্রী > প্রধানমন্ত্রী, আবার  শূদ্র > বৈশ্য > ক্ষত্রিয় > ব্রাহ্মণ। সমাজ-শৃঙ্খলের এমন পিরামিডকেও অক্ষুণ্ণ রাখে সর্বোচ্চ খাদক। উৎপাদককে উৎপাদন করতেই হবে। না হলে ভেঙে পড়বে পিরামিড। খাদ্য শৃঙ্খলের পিরামিডের প্রতিটি স্তরে আলাদা আলাদা প্রজাতি থাকলেও, শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব সকলের উপর বর্তায়। কিন্তু প্রতি স্তরে একই প্রজাতি থাকলে সকলের সমান দায়িত্ব থেকে যায়। স্তর আর থাকে না।

উৎপাদকের চলে টিকে থাকার লড়াই। সর্বোচ্চ খাদক জারি রাখে দমিয়ে রাখার লড়াই। সেই কারণে উৎপাদককে উৎপাদনের কাজেই রেখে দেয়। মানুষ হতে দেয় না। ভক্ত করে রেখে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। এ প্রচেষ্টার ফলে গাছে গাছে ‘আশ্চর্য ফল’ (Strange Fruit) দেখতে পাই। ’41 Shots’ এর আওয়াজ শুনতে পাই। ঈশ্বরের দোহাই দেওয়া শিখিয়ে দেয়। তুলে দেওয়া হয় নিজের উপর থেকে আস্থা। ভুলে যাই, উৎপাদকই পিরামিডের পত্তন ঘটায়। যার মধ্যে লুকিয়ে থাকে এক সূর্য শক্তি। যে জন্ম দিতে পারে এক নতুন পৃথিবীর। একদিন নতুন ভোর হবেই।

(মতামত লেখকের বক্তিগত। ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)