অভিজিৎ রায়

দলবদলের পুরনো কয়েনটি ফলাফল ফেরত দিতে শুরু করেছে। পশ্চিমবঙ্গে উন্নয়নের ইতিহাস শুরুর সালটা ১৯৭৭ নাকি ২০১১ এই নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু ব্যাপক হারে দল-বদলানোর খেলার শুরু অবশ্যই ২০১১ সালে। চৌত্রিশ বছর পরে ক্ষমতার হাতবদল ঘটাতে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল-সহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলি থেকে নেতানেত্রীদের দলবদলের সুযোগ করে দিয়ে নিজের দলে ঢুকিয়েছিল বর্তমানে ক্ষমতাসীন দল। আগামী বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে দলবদলের খেলা ফের জমে উঠেছে। একইভাবে কাঠগড়ায় উঠেছে বর্তমানের প্রবল-প্রতাপী বিরোধী দল। অন্যান্য রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনগুলিতে সেই দলের নীতিবোধের যা নমুনা দেখা গিয়েছে, তাতে বর্তমান শাসকদলের  অস্তিত্ব যে এরকম ভয়ঙ্কর বিপদের মধ্যে পড়বে, সে আশা করাই গিয়েছিল।

দড়ি টানাটানির সাম্প্রতিক খেলা আবার রাজনীতির ময়দান ছেড়ে ঘরের আঙিনায় পৌঁছল। বা বলা ভাল, ব্যক্তিগত আব্রু আবার তছনছ হয়ে গেল রাজনীতির হাওয়ায়। বছর দুয়েক যাবৎ প্রাক্তন মহানাগরিকের ঘর ভাঙার ইতিহাসে যারা উৎফুল্ল ছিলেন, তাঁরা বিষ্ণুপুরের সাংসদের কম্পমান ঘরটির সংবাদেও আহ্লাদিত থাকবেন তো? আমরা আমজনতাই বা কোথায় মুখ লুকোব? নাকি এই পেন্ডুলামের মতো আদর্শগত অবস্থানকেই আমরা ইতিমধ্যে মেনে নিয়েছি রাজনীতি বলে? তাই মঞ্চে উঠে নেতা যখন বলেন, “যখন যে দল করি, সেই দল আমি প্রাণ দিয়ে করি’—তখন জনতা সেজে আমরা হাততালি দিই। ভোটও দেব। তারপরে আরও বেশি বেশি আক্ষেপের উত্তাপে সরগরম করব চায়ের মজলিশ।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই খেলা চলে কেন? দলবদলু এই নেতাদের কি নিজস্ব রাজনৈতিক মত আদৌ আছে? জনতার কাছে জবাবদিহি দেওয়ার কি আদৌ কোনও প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন এই নেতারা? অভিযোগের আঙুল যাঁদের দিকে উঠেই আছে, তাঁদেরকে নিজেদের দলে নিতে অন্যেরা আগ্রহী হয় কেন? ঠিক কোন সোনার বাংলা গড়ে তোলা যাবে এই পথে? এর কারণটি খুঁজতে হবে আমাদের দেশের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনে। ভারতীয় গণতন্ত্রে ভোট পরিচালনা করা হয় ভোটপ্রার্থীদের মনে রেখে, অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোকে মনে রেখে নয়। যে কারণে একজন ভোটপ্রার্থী নাম নথিভুক্ত করতে পারেন তাঁর পার্টি অ্যাফিলিয়েশন আসার আগেই। জয়ী প্রার্থীর মানপত্রেও তাঁর রাজনৈতিক দলের কথা লেখা থাকে না। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, তাত্ত্বিকভাবে নির্দল প্রার্থীও একটি রাজনৈতিক দল। অর্থাৎ, ভোট পরিচালকদের কাছে রাজনৈতিক দলগুলোর থেকে প্রার্থীদের প্রাধান্য বেশি থাকে। কিন্তু জনগণ ভোট দেন সাধারণত রাজনৈতিক দলকে মনে রেখে। তাই, ভোট কাকে দেওয়া হবে– পছন্দের ভোটপ্রার্থীকে নাকি পছন্দের রাজনৈতিক দলকে, এই দ্বন্দ্বের নিরসন না হলে একটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ভোটে জেতার পরে তাঁর জনপ্রতিনিধিত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে অনায়াসে দলবদল করতে পারেন। যদিও জনগণ তাঁকে ভোট দিয়েছিল ভোটের সময়ে তিনি যে রাজনৈতিক দলে ছিলেন, সেই দলকে মনে রেখে, বা সেই রাজনৈতিক দলকে চেয়ে। জনপ্রতিনিধির দলবদলে ভোটদাতাদের রাজনৈতিক দল পছন্দের বিষয়টিকে জলাঞ্জলি দেওয়া হয়।

আরও একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য। ভারতের রাজনীতিতে জাতীয় বা প্রাদেশিক— সর্বস্তরেই নেতারা তাঁদের কর্মদক্ষতা দিয়ে তাঁদের পৃথক ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’ অর্থাৎ জনমানসে বিশিষ্ট পরিচিতি অর্জন করেন। জনতার মধ্যে সেই ব্র্যান্ডটির কিছু ‘ফলোয়ার’ বা অনুগামী থাকে। ব্র্যান্ডটির রাজনৈতিক চরিত্র বদলালেও ভ্যালুটি সহজে বদলায় না। সেই কারণে দেখা যায়, কোনও রাজনৈতিক দল লোকসভা বা বিধানসভা ভোটে পর্যুদস্ত হলেও সেই দলের কিছু নেতা অপরাজিত থাকেন। কোনও কোনও কুশলী রাজনীতিবিদ সন্তর্পণে দলের অতিরিক্ত এই ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড ভ্যালু নির্মূল করে দেওয়ার প্রয়াস করে সফল হন। সেক্ষেত্রে একজন নেতা বা নেত্রীর অতিরিক্ত কোনও পৃথক ব্র্যান্ডভ্যালুর অস্তিত্ব সেই রাজনৈতিক দলে আর থাকবে না। সেক্ষেত্রে দল-বদলানোর সুবিধাটি সহজে কারও হস্তগত হয় না। অতীতে এ রকম ঘটেনি, এমন নয়। কিন্তু খুব কম সময়ের জন্য অথবা খুব কম নেতৃত্বের পক্ষেই এমনটি বেশিদিন যাবৎ করা সম্ভব। এই নিয়ন্ত্রণ কমজোরি হয়ে গেলেই আবার দলবদল দ্বিগুণ তীব্র হবে। অর্থাৎ এই খেলাটি ভারতীয় রাজনীতির অঙ্গ হয়ে থাকবে, যতদিন না সংবিধানে কিছু পরিবর্তন ঘটানো যায়।

সব মিলে রাজনীতিও বর্তমানে একটি পণ্য-প্রকৃতিকে আশ্রয় করেছে। মানি মার্কেটিং কোম্পানির পথ ও পদ্ধতিতেই প্রতিটি রাজনৈতিক দল চলছে। মানি মার্কেটিং কোম্পানিগুলো প্রতিনিয়ত এমন সব লোকের খোঁজ করতে থাকে, যাদের স্বপ্ন দেখানো যায় এবং তাদের সঞ্চয় কেড়ে নেওয়া যায়। ব্র্যান্ডভ্যালু সম্পন্ন নেতাদের জনপ্রিয়তার ক্ষীরটি খাওয়াই যাঁদের মূল লক্ষ্য— সেই রকমের এজেন্টরাও প্রায় একইরকম কাজ করে থাকেন। ফলে নেতারা দল বদলান। নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েও অনেক নেতাদের দলবদল করানো হয়। পুঁজিপতিরাও দল-বদলের ভোট প্রভাবিত করেন। কয়েকটি বুথ দখলের কথা বাদ দিলে, ভোট তো সাধারণ ভোটদাতারা নিজের ভোট নিজেরাই দেন। তাহলে পুঁজিপতিরা কী ভাবে ভোটকে প্রভাবিত করতে পারেন? টাকা দিয়ে। সেই টাকা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করার জন্য ও তার প্রচারের জন্য ব্যয় করা হয়। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করলেই হয় না। তা জনসমক্ষে আনার জন্য গণমাধ্যম এবং আজকের নতুন বিশ্বে সামাজিক মাধ্যমগুলোকে ব্যবহার করে বারবার রাজনৈতিক দলের নামটি ভোটদাতাদের কাছে পৌঁছে দিতে হয়। তার ফলে রাজনৈতিক দলের কথা পাড়লেই ভোটদাতাদের মনে সেই বিশেষ রাজনৈতিক দলের কথা আসবে, যার কথা তাঁরা বারবার পেয়েছেন এইসব মাধ্যমগুলোর দৌলতে। এইভাবে ভোটদাতাদের মনে বিশেষ জায়গা করে নিতে বা ভোটদাতাদের মনের প্রান্তরে যুদ্ধে জয়ী হতে পুঁজিপতিদের দেওয়া অর্থ ব্যবহৃত হয়। এবং এইভাবে ভোটদাতাদের ভোটদান প্রভাবিত হতে থাকে। যদিও ভোটদাতারা নিজেদের ভোট নিজেরাই দেন। বাংলার রাজনৈতিক নেতারা এবং আমজনতা হিসেবে আমরাও এখন এই মার্কেটিং ব্যবস্থার দশচক্রে পড়ে ভূত এবং ভূতনাথে গুলিয়ে ফেলেছি।

মূল প্রসঙ্গে ফিরি। দলবদলের রাজনীতির ফলে ভারতীয় গণতন্ত্র বারেবারে বিপন্ন হচ্ছে। একই নেতাকে বারবার দলবদলের সুযোগ দেওয়া ভারতীয় সংবিধানের একটি মারাত্মক দুর্বলতা। নিজেদের দলের স্বার্থেই প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে এ ব্যাপারে উদ্যোগী হতে হবে। আজ যে দল ক্ষমতায় আছে কাল সে দল ক্ষমতায় না-ও থাকতে পারে, সে কথা ভেবেই পুঁজি আর বাহুবলের রাজনীতি থেকে সমস্ত রাজনৈতিক দল যদি সরে না দাঁড়ায়, তা হলে আগামী দিনে রাজনৈতিক নেতাদের ভবিষ্যৎও এক চরম প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়ে যাবে। মাফিয়া অথবা পুঁজিপতিরাই দেশের সংসদভবন ও বিধানসভাগুলি ভরিয়ে তুলবেন অদূর ভবিষ্যতে।

(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)