তাঁর সংস্থার নাম ‘ভরসা থাকুক’। শুধু নামে নয়, বিপদ-আপদেও যে ওই সংস্থার উপরে বহু মানুষ ভরসা রাখেন সে প্রমাণও মিলেছে একাধিক বার। গত কয়েক মাসে ওই সংস্থা যা করেছে এবং এখনও করে চলেছে তার খবর নিল সাদাকালো । ‘ভরসা থাকুক’-এর কর্ণধার অর্পণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের  সঙ্গে কথা বললেন সুদীপ জোয়ারদার

সাদাকালো: ‘ভরসা থাকুক’, এমন সুন্দর একটা নামেই মনে একটা ভরসার ভাব জেগে ওঠে। আর এটা তো আপনি সত্যি করে তুলেছেন। শুরুটা কী ভাবে হল?
অর্পণ: সালটা ২০০৭। করিমপুরে তাপসদার চায়ের দোকানে বসে বেশ কয়েকজন আড্ডা দিচ্ছিলাম। তখনই কথায় কথায় এই প্রসঙ্গ ওঠে। সংস্থার নামও ঠিক করে ফেলি তখনই। তার পরেই শুরু হয় পথচলা।
সাদাকালো: কী ধরনের কাজ আপনারা করে থাকেন?
অর্পণ: মহালয়ার দিন বস্ত্র বিতরণ, রক্তদান শিবিরের আয়োজন, প্রতিবন্ধীদের সাইকেল দেওয়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আমরা করি। এ ছাড়া অনাথ আশ্রম, বৃদ্ধাশ্রমের আবাসিকদের নতুন বস্ত্র দেওয়া হয়।
সাদাকালো: এটা কি প্রতিবছর করেন?
অর্পণ: আমরা লোকজনের কাছে চেয়েচিন্তে কাজ করি। রক্তদান শিবির বা বড় অনুষ্ঠান করতে প্রচুর খরচ হয়। তাই সেগুলো নিয়মিত করতে পারি না। তবে প্রতিবছর মহালয়ার দিন অনাথ আশ্রম ও বৃদ্ধাশ্রমে আমরা যাই। সেখানকার আবাসিকদের নতুন পোশাক দেওয়া হয়।
সাদাকালো: অনাথ আশ্রম, বৃদ্ধাশ্রম কি করিমপুরেই?
অর্পণ: করিমপুরে একটা অনাথ আশ্রম আছে। সেখানে প্রায় পঞ্চাশ জন আবাসিক আছেন। দক্ষিণ দিনাজপুরের বুনিয়াদপুরের একটা অনাথ আশ্রমেও আমরা প্রতিবার যাই। আর বৃদ্ধাশ্রম করিমপুরে নেই। তবে বেতাইয়ে রয়েছে। সেখানে যাই।
সাদাকালো: করোনার সময়ে আপনাদের সংস্থা তথা আপনার কর্মকাণ্ড বহু বার খবরের শিরোনামে এসেছে। লকডাউনের সময় আপনাদের কাজ নিয়ে কিছু বলুন।
অর্পণ: দেখুন, এমন একটা সময় যে আসতে পারে আমরা কেউ ভাবতে পারিনি। ফলে লকডাউন শুরু হতেই আমাদের প্রথমে মনে হল, যাঁরা ভবঘুরে, ভিখিরি, মানসিক ভারসাম্যহীন তাঁদের চলবে কী ভাবে। এই ভাবনা থেকে আমরা লকডাউনের পরের দিন থেকেই কাজ শুরু করি। প্রথমে শুকনো খাবার বিলি করা হচ্ছিল। পরে মনে হল, শুকনো খাবার খেয়ে কি কারও খিদে মেটে? এই চিন্তা থেকে রান্না করা খাবার একবেলা খাওয়াতে থাকি। আর একবেলার জন্য চাল, ডাল, আলু দেওয়ার ব্যবস্থা করি।
সাদাকালো: রান্নারও আয়োজন করতে হয়েছে তা হলে?
অর্পণ: রান্না আমরা নিজেরা করিনি। পরিচিতদের বাড়িতে পালা করে রান্না করার অনুরোধ করেছিলাম। তাঁরা সেই অনুরোধ রেখেছেন।
সাদাকালো: ভবঘুরে ছাড়া আর কাদের সাহায্য করেছেন?
অর্পণ: ভবঘুরেদের দিয়ে শুরু। তারপরে দিনমজুর, লরি চালক, টোটোচালক, বাইরে কাজ করতে গিয়ে আটকে পড়া লোকজনের পরিবার— সকলের কাছেই আমরা ত্রাণ নিয়ে পৌঁছে গিয়েছি। ত্রাণ বলতে চাল, ডাল আলু, তেলের পাশাপাশি শিশুদের খাবারও ছিল। এ ছাড়া ছেলেমেয়ে কলকাতায় বা বাইরে থাকেন। বাড়িতে থাকেন বাবা মা। ওষুধের দরকার। রাতে বা জরুরি প্রয়োজনে ওষুধও পৌঁছে দিয়েছে আমাদের ছেলেরা।
সাদাকালো: কোভিডকালে কত পরিবারকে সাহায্য করেছেন?
অর্পণ: প্রায় তিন হাজারের কাছাকাছি।
সাদাকালো: করোনা সংক্রমণ রুখতে কিছু করেননি?
অর্পণ: অবশ্যই। যে সব জায়গায় মানুষ বেশি যান, সেই সব জায়গা বারবার স্যানিটাইজড করা হয়েছে। তাছাড়া সংস্থার পক্ষ থেকে একাধিক বার মাস্ক, স্যানিটাইজ়ার বিলি করা হয়েছে।
সাদাকালো: আপনাদের কর্মকাণ্ড কি শুধু এলাকাতেই সীমাবদ্ধ? নাকি বাইরেও…
অর্পণ: আমফানের সময় দু’দফায় আমরা ত্রাণ নিয়ে গিয়েছি সুন্দরবন এলাকায়। শমসেরগঞ্জে ভাঙনের সময়েও আমরা দুর্গতদের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দিয়েছি।
সাদাকালো: আপনার পেশা কী?
অর্পণ: আমি একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।
সাদাকালো: এ সব করতে গিয়ে নিজের কাজে ক্ষতি হয় না?
অর্পণ: কাজের ফাঁকে ফাঁকেই করতে হয়। আসলে এই কাজটা আমি করতে ভালবাসি। তাই নিজের কাজ করেও হয়ে যায়।
সাদাকালো: বাড়ির সহযোগিতা?
অর্পণ: বাড়ি বলতে আমি, মা, বাবা, দাদা, বৌদি ও ভাইঝি। সকলেই আমাকে পূর্ণ সহযোগিতা করেন।
সাদাকালো: আপনার সংস্থার সদস্য সংখ্যা কেমন?
অর্পণ: অনেকেই আছেন। তবে এ সব কাজে সক্রিয়তা সবাই দেখাবেন, এটাও আশা করা যায় না। কারণ যে রোগটার জন্য এই অবস্থা, সেটাও তো ভয়ানক। তবুও প্রচুর মানুষ আমাকে সঙ্গ দিয়েছেন বলেই কোভিডকালে কাজটা মসৃণ ভাবে করতে পেরেছি।
সাদাকালো: স্থানীয় লোকজনের সাহায্য কেমন পেয়েছেন?
অর্পণ: আমরা সরকারি ভাবে কোনও সাহায্য পাই না। সবটাই চলে সাধারণ মানুষের কাছে চেয়েচিন্তে। তাঁরা যে ভাবে সাড়া দিয়েছেন, পাশে থেকেছেন তাতে আমরা অভিভূত।
সাদাকালো: যাঁরা আপনার এলাকা থেকে দূরে থাকেন, তাঁরা আপনাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন কী ভাবে?
অর্পণ: ফেসবুক পেজে আমার ফোন নম্বর দিয়ে দিয়েছিলাম। তাই কারও যোগাযোগ করতে অসুবিধা হয়নি।
সাদাকালো: আপনার ফেসবুক পেজে তো ত্রাণ ও নানা কাজের অনেক ছবি রয়েছে…
অর্পণ: হ্যাঁ, ছবিগুলো দেওয়াটা উচিত বলেই দিয়েছি। প্রথমত, এটা বোঝাতে যে, দুর্গত মানুষেরা যাতে বুঝতে পারেন, তাঁরা অসহায় নন। আমরা আছি তাঁদের পাশে। দ্বিতীয়ত, আমাদের সমস্ত কাজটাই চলে লোকের কাছে চেয়েচিন্তে। তাই কাজটা ঠিকঠাক করছি কিনা সেটাও তাঁদেরকে জানানো প্রয়োজন। সেই সঙ্গে আরও মানুষকে পাশে পেতেই আমাদের কাজকর্মের ছবি ফেসবুকে দিয়ে থাকি।
সাদাকালো: এই কাজের দৌলতে এলাকায় তা হলে তো আপনার ভাল প্রভাব রয়েছে, তাই না?
অর্পণ: প্রভাব নয়। প্রভাব তো থাকে রাজনীতির কারবারিদের। তবে হ্যাঁ, লোকজন আমাকে ভালবাসেন।
সাদাকালো: রাজনীতি কি পছন্দ নয়?
অর্পণ: আপনাকে একটা ঘটনা বলি। ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সময় করিমপুর থানায় ছিলেন অনিন্দ্য বসু। যিনি কিছুদিন আগে কোভিডে আক্রান্ত হয়ে চলে গেলেন। একটা বিষয় নিয়ে থানায় গন্ডগোল হয়। অনিন্দ্যবাবু সেই সময় আমাকে আলাদা ভাবে ডেকে বলেন,  ‘‘রাজনীতি আপনার রাস্তা নয়। আপনি মানুষের কাজ করুন। তবে অন্য ভাবে।’’ তো, তিনিই আমার পথপ্রদর্শক। তাঁরই কথায় সক্রিয় রাজনীতির পথ ছেড়ে এই সংস্থা গড়ে মানুষের জন্য কাজ করে চলেছি। অনিন্দ্যবাবুর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগও ছিল। অকালে তিনি চলে গেলেন…
সাদাকালো: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা?
অর্পণ: এই মুহূর্তে আমার পণ, করিমপুরে একটা বৃদ্ধাশ্রম তৈরি করা। সে ব্যাপারে সাংসদ মহুয়া মৈত্র ও বিধায়ক বিমলেন্দু সিংহ রায়কে সাহায্যের জন্য অনুরোধও করেছি। জমি পেয়ে গেলে আমার সর্বস্ব দিয়েই বৃদ্ধাশ্রমটা তৈরি করব।
সাদাকালো: খুব ভাল লাগল আপনার সঙ্গে কথা বলে। আপনার পথ আরও অনেকে অনুসরণ করুক, এটাই প্রার্থনা করি।
অর্পণ: ‘সাদাকালো’ পরিবারের জন্যও আমার শুভকামনা রইল।