ড. দেবযানী ভৌমিক চক্রবর্তী

প্রথাগত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত এক নারী শুধুমাত্র কলমের জোরে নিজেকে প্রমাণ করেছিলেন। যাঁকে রবি ঠাকুর বলেছিলেন, ‘সম্পূর্ণা’৷ বাবা হরেন্দ্রনাথ গুপ্ত ও মা সরলাসুন্দরী দেবীর নয় সন্তানের মধ্যে তিনি পঞ্চম, কন্যাসন্তান হিসেবে তৃতীয় ৷ পরপর তিন কন্যাসন্তানের পরে ঠাকুমা নিস্তারিণী দেবীর প্রতিক্রিয়া ছিল, আর মেয়ে না, মেয়ের আশা পূর্ণ হয়েছে৷ তাই ঠাকুমাই নাম রাখলেন আশাপূর্ণা৷ ঠাকুমার নির্দেশেই সেই মেয়েকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও দেওয়া হল না৷ কিন্তু মা সরলাসুন্দরীর বই পড়ার প্রবল নেশা মেয়ের মধ্যেও সঞ্চারিত হল৷ বাড়িতেই দাদা ও ভাইদের পড়া শুনে শুনে প্রথম পাঠগ্রহণ৷ বাড়িতে আসত বিভিন্ন পত্রপত্রিকা-সহ অনেক বই৷ কাজেই অল্প বয়সেই প্রভূত বই পড়ে ফেলেন তিনি৷ মা ছিলেন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, জ্ঞানপ্রকাশ লাইব্রেরি ও চৈতন্য লাইব্রেরির আজীবন সদস্য৷ কাজেই বাড়িতে বইয়ের অভাব ছিল না৷

বই পড়ার প্রবল নেশা থেকেই নিজেও লিখতে উৎসাহী হয়েছিলেন৷ তেরো বছর বয়সেই একদিন সাহস করে একটি কবিতা পাঠিয়েই দিলেন শিশুসাথী পত্রিকায়৷ সম্পাদক রাজনারায়ণ চক্রবর্তী তাঁর সেই ‘বাইরের ডাক’ কবিতাটি পড়ে এতটাই মুগ্ধ হলেন যে, শুধু ছাপলেনই না, আরও লিখতে অনুরোধ করলেন৷ এবং গদ্য লেখারও পরামর্শ দিলেন৷ লিখলেন তাঁর প্রথম গল্প ‘পাশাপাশি’৷ পরবর্তীতে আশাপূর্ণা দেবী বহুবার তাঁর লেখক হয়ে ওঠার নেপথ্যে থাকা রাজনারায়ণবাবুর প্রতি ঋণ স্বীকার করেছেন৷ সেদিন তিনি যে উৎসাহটি দিয়েছিলেন তা থেকেই পরবর্তীতে আশাপূর্ণার প্রত্যয়ী কলমে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য জনপ্রিয় রচনা৷ উপন্যাস, ছোটগল্প, স্মৃতিকথা বা প্রবন্ধ ছাড়াও কবিতা তো আছেই৷

মনে মনে চাইতেন জীবনসঙ্গী যেন কোনও গ্রন্থাগারিক হন, তাহলে অনেক বই পড়া যাবে৷ অথবা রেলের চাকুরে হলেও ভাল, কত ঘুরে বেড়ানো যাবে, জানা যাবে মানুষের জীবন তথা পারিপার্শ্বিক সমাজকে৷ কিন্তু মানুষটি ছিলেন ব্যাঙ্ককর্মী৷ তবে আদ্যোপান্ত সংবেদনশীল৷ আশাপূর্ণার যোগ্য জীবনসঙ্গী৷ আর তাঁর সাহচর্যই আশাপূর্ণার মনের আশা পূর্ণ করতে অধিকতর সহযোগী হয়েছিল৷ ১৯২৪ সালে মাত্র ১৫ বছর ৮ মাস বয়সে আশাপূর্ণা দেবীর বিয়ে হয় কৃষ্ণনগরনিবাসী কালিদাশ গুপ্তের সঙ্গে৷ ১৯২৬ থেকে ১৯২৯ সালের মধ্যে কন্যা পুষ্পরেণু ও দুই পুত্র প্রশান্ত ও সুশান্তর জন্ম হয়৷ ১৯৩০-৩১ সালে শাশুড়ির কথায় কালিদাসবাবুর সঙ্গেই তিনিও কাশীতে পূর্ণানন্দের কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেন৷ তারপর থেকে আজীবন তাঁরা নিরামিষ খেয়েছেন৷ পুত্র প্রশান্তের আকস্মিক মৃত্যু তাঁর জীবনে চরম অভিঘাত বয়ে আনে৷ তেইশ-চব্বিশ বছরের যুবক প্রশান্ত তখন আর্ট কলেজের ছাত্র৷ সন্তানকে হারানোর যন্ত্রণায় ভেতরে ভেতরে দীর্ণ হয়েছেন, কিন্তু কী সংযত তাঁর ভাবপ্রকাশ!

কথায় আছে, নারীদের দেখার চোখ একটু বেশিই গভীর হয়৷ আশাপূর্ণা দেবীর সেই গভীর অন্তর্দৃষ্টি তথা নিখুঁত পর্যবেক্ষণশক্তিই তাঁকে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক হিসেবে চিহ্নিত করেছে৷ নিজেকে বলতেন “মা সরস্বতীর স্টেনোগ্রাফার”৷ নারীর জীবন যন্ত্রণা তথা মনোবেদনার এক নিখুঁত রূপকার তিনি৷ মনের গহীন প্রদেশের সুলুকসন্ধান তাঁর লেখায় মেলে৷ তাঁর লেখাগুলি সমসময়ের ইতিহাসকে তুলে ধরেছে৷ আবার তিনি যুগসমস্যাকে চিহ্নিত করেছেন যেমন, পাশাপাশি তা থেকে উত্তরণের পথও নির্দেশ করেছেন৷

বাংলা সাহিত্যের এহেন সম্পূর্ণার জন্ম উত্তর কলকাতার পটলডাঙায়, তাঁর মামাবাড়িতে৷ সময়টি ১৯০৯ সালের ৮ জানুয়ারি৷ বিস্ময় জাগে এখানেই যে, এত বছর আগে নারীদের পক্ষে নারীর প্রতি সমাজের বৈষম্যমূলক মনোভাবকে তুলে ধরা খুব সহজ ছিল না। কিন্তু তিনি উগ্র নারীবাদী না হয়েও বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন যথেষ্ট ঋজু ও দৃঢ় ভাবে৷ ১৯৯৫ সালের ১৩ জুলাই তাঁর পার্থিব জীবনের ইতি ঘটলেও তাঁর লেখাগুলির মাধ্যমে তিনি আজও জীবন্ত৷ ঠাকুমা নিস্তারিণী দেবীর জন্যই তাঁর প্রথামাফিক শিক্ষা গ্রহণে বাধা পড়লেও, ঠাকুমার প্রবল ব্যক্তিত্ব তাঁর অন্তরে দাগ কেটেছিল৷ আর এর সঙ্গেই মিশেছিল মায়ের কমনীয়তা তথা বিদ্যোৎসাহিতা৷ ঠাকুমা ও মায়ের মিশেলেই তাঁর অন্দর-নির্মাণ৷

তাঁর ত্রয়ী উপন্যাস প্রথম প্রতিশ্রুতি, সুবর্ণলতা ও বকুলকথা নারীর আত্মচেতনাকেই বিশেষভাবে চিত্রিত করেছে তিনটি প্রজন্মের মাধ্যমে৷ প্রথম প্রতিশ্রুতি-র সত্যবতী নারীর প্রতি সমাজের বৈষম্যমূলক আচরণ বা অসম্মানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়েছেন৷ তাঁর ভঙ্গি নমনীয় হলেও দঢ়৷ তাঁর মেয়ে সুবর্ণলতাও আত্মচেতনাময়ী৷ তিনি অনেক বেশি সরব৷ লেখারও শখ ছিল৷ লেখা প্রকাশিতও হয়েছিল, কিন্তু অভিমানে সেগুলি পুড়িয়ে দিয়েছিলেন৷ অন্তর্দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত তিনি৷ তাঁর ছোট মেয়ে বকুলের মধ্যে এই দুই পূর্ব নারীর তেজ লক্ষণীয়৷ তবে বকুল শান্ত৷ মা ও দিদিমার জীবনের অপূর্ণ সাধ তিনি পূরণ করতে চেয়েছেন৷ মেয়েদের স্বাধিকার নিয়ে তিনি কলম ধরেছেন৷ জনপ্রিয় লেখিকা হয়ে উঠেছেন৷ বকুলকথা যেন সমগ্র নারীসমাজের আত্মকথা তথা আত্মঘোষণা৷ আমাদের স্বীকার করতেই হবে সার্থকস্রষ্টা আশাপূর্ণা দেবী৷ তিনি তাঁর মিত্তিরবাড়ি, অগ্নিপরীক্ষা, শশীবাবুর সংসার, নির্জন পৃথিবী, নেপথ্য নায়িকা ইত্যাদি উপন্যাসে পরিবারে বিভিন্ন রকম মানুষ ও তাঁদের জীবন তথা মানসিকতা ফুটিয়ে তুলেছেন৷ যৌথ পরিবারের ভাঙনকেও তিনি সচেতন মনোবিদের মতোই দেখিয়েছেন৷ তাঁরা একসঙ্গে থাকলেও, সম্পর্কের মধ্যে রয়েছে ভারসাম্যহীনতা তথা অন্তঃসারশূন্যতা৷

আশাপূর্ণা দেবীর ছোটগল্পগুলি যেন সমাজতাত্ত্বিকের দষ্টিকোণ থেকেই লেখা৷ যেখানে আমরা দেখি সমাজের নিষ্ঠুর বাস্তবচিত্র৷ ‘ছিন্নমস্তা’ গল্পে পুত্রবধূকে জব্দ করতে মা স্বয়ং পুত্রের মৃত্যুকামনা করেছেন৷ সেটা সত্যে পরিণত হলে মায়ের মধ্যে সন্তান হারানোর শোক থাকলেও জয়ের একটা প্রশান্তিও অবচেতনে কাজ করেছে৷ ‘পরাজিত হৃদয়’ গল্পে একমাত্র মেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে জঙ্গলে বেড়াতে গিয়ে গণলাঞ্ছিত হলে, সেই মেয়েকে মা বাবাও মনে মনে মৃত ভেবেই সান্ত্বনা খোঁজেন৷ বা বলা ভাল সমাজনিন্দা থেকে নিজেদের বাঁচাতেই এটি মেনে নেন৷ মেয়ের চিঠি পেয়ে বাবা সোমেশ্বর তাকে উদ্ধারের উদ্দেশে রওনা দিয়েও ট্রেনে সেই চিঠি টুকরো টুকরো করে জানালা দিয়ে উড়িয়ে দেন৷ মেয়েকে সমাজ স্থান দেবে না, কাজেই বাবা ফিরে আসেন৷ সমাজের সঙ্গে এহেন আপস করাটাই মানুষের মনের সমর্থন বেশি পায়৷ সেখানে নিজের সন্তানও গুরুত্বহীন৷ কী কঠিন বাস্তবতা!

অসংখ্য উপন্যাস, ছোটগল্পের পাশাপাশি আশাপূর্ণা দেবীর বেশ কিছু প্রবন্ধের গ্রন্থও রয়েছে৷ সেগুলি আত্মজীবনীমূলক স্মৃতিকথন যেমন— আমার ছেলেবেলা, আমার সাহিত্যচিন্তা, নেশা নয়, পেশা নয়, লেখাই যাঁর জীবন, ক্ষতির হিসাব ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য৷ এই প্রবন্ধসাহিত্যেও যথেষ্ট মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন তিনি৷ আবার সাহিত্যিক সত্তার পাশাপাশি তিনি যে কত বড় সংসারাকাঙ্ক্ষী মা তার প্রমাণও মেলে৷ পুত্রবধূ নূপুর গুপ্ত জানিয়েছেন, আশাপূর্ণা দেবীই তাঁকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ পড়তে সার্বিক সহায়তা করেছিলেন৷ সেই সময় নূপুর দেবীর শিশুকন্যাকে অর্থাৎ আশাপূর্ণা তাঁর নাতনিকে দেখভালের সমস্ত দায়িত্ব নিজেই পালন করেছিলেন, কোনও আয়ার সাহায্য ছাড়াই৷ সাধে কী আর গুরুদেব বলেছিলেন ‘সম্পূর্ণা’!

(লেখক জিয়াগঞ্জ শ্রীপৎ সিং কলেজের সহকারী অধ্যাপক)

(ফিচার ছবিটি গুগল থেকে নেওয়া)