সারথি বিশ্বাস

দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা মুখস্থ করতে গিয়ে মস্তিষ্কে বেশ চাপ পড়েছিল আমার। শুধু শাসন ব্যবস্থা হলে তা-ও সয়, তার ফল ছিয়াত্তরের মন্বন্তর! লর্ড ক্লাইভকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, তিনি বলে তো নন, কারও শাসন ব্যবস্থাই আমার মাথায় ঢোকেনি। এখনও ঢুকছে না। শাসকেরা মুখে বলছেন এক, করছেন আর এক। কানে শুনে শিখব, না চোখে দেখে শিখব, বিভ্রান্ত আমি। তাঁরা বলছেন, স্বাস্থ্যবিধি মানতে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে। অথচ নিজেরাই জন-জমায়েতের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। জনসমুদ্রের হুঙ্কার পাল্টা হুঙ্কারে চমকে চমকে উঠছি আমরা। বিস্ফারিত চোখে দেখছি, তাঁদের ক্ষমতায়নের গ্যারান্টি। মিটিং-মিছিল, উৎসব, বড়দিন, হ্যাপি নিউ ইয়ার, গঙ্গাসাগর মেলা সবই আছে প্রেজেন্ট কন্টিনিউয়াস টেনসে, শিক্ষাটাই কেবল পাস্ট টেনস্।

তাহলে এই যে দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা, তার ফল যে মন্বন্তর ডেকে এনেছে শিক্ষায়, সেই কঙ্কালসার শিক্ষার্থীদের শুশ্রূষার কী হবে? বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীর মতো করোনাও কি শিক্ষকদেরই ভয় পাচ্ছে না? শিক্ষকদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারাও কি দলবেঁধে কেবল ক্লাসরুমেই লুকিয়ে আছে? তাই কি সেখানে আজও তালা?

রাজনৈতিক সমাবেশে দলের শক্তি প্রদর্শন করে যাঁরা বাড়ি ফেরেন, তাঁরা কি কোয়রান্টিনে থাকেন? বাড়ির শিশু শিক্ষার্থীটিকে ছুঁয়ে ফেলেন না তো? স্কুলে শিক্ষার্থীর জমায়েত হলে সংক্রমণ বাড়বে। তাহলে কি রাজনৈতিক জমায়েতের ইমিউনিটি খুব বেশি! ধর্মীয় জমায়েতে করোনা গো-হারা হেরে যাচ্ছে, উৎসবের হুল্লোড়ে করোনা সাইডে দাঁড়াচ্ছে, শুধু স্কুলে গেলেই করোনা নাক-মুখ দিয়ে ঢুকে পড়ছে!

রাজনৈতিক লড়াইয়ে আমরা আছি, ওরা আছে, স্মরণাহত আছে, বহিরাগত আছে, রাজনৈতিক মার্কশিটে শিক্ষার জন্য নম্বর কই? সিনেমা হলকেও হাউসফুল করার তোড়জোড় শুরু হয়েছে, শিক্ষাই কি একমাত্র জিনিস যাকে এতখানিও অবহেলা করা যায়! ধর্ম আমাদের মৌলিক অধিকার, রাজনীতি আমাদের ব্যক্তি-অধিকার, উৎসব আমাদের মনের অধিকার; আমরা কি ভুলে গেলাম শিক্ষারও অধিকার বলে একটা অধিকার আছে! সেই অধিকার রক্ষার জন্য কি কিছুই বিবেচনা করা যায় না! নাকি, শিশুদের ভোটাধিকার নেই বলে তাদের অধিকার নিয়েও মাথা ঘামানোর অবকাশ নেই কারও! হবেও তাই! আমাদের সমস্ত ন্যায়-নীতি, বিচার-বিবেচনা ভোটব্যাঙ্ক দেখেই হয় কিনা!

অনেকে বলবেন আমি অন্ধ, চারিদিকে অনলাইন ক্লাসের হিড়িক চোখে পড়ছে না! পড়েছে বলেই বলছি, অনলাইন ক্লাসের ধুয়ো দেবেন না প্লিজ! গাঁ-গঞ্জের কথা বাদ দিলাম, মফস্বলেরও ক’জন শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাস করার বিলাসিতা দেখাতে পেরেছে? আমার স্কুলটাও একটা স্কুল, সেখানে তিনশো বাচ্চা পড়তে আসত, খেলতে আসত, হাসতে আসত, বাতাসে ভাসতে আসত। স্কুলে কিচ্ছু হয় না বলার সঙ্গতি তাদের নেই। তাদের বেশিরভাগই প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া, শিক্ষালাভ যেটুকু হয় স্কুলেই হয়। একমাত্র সেই পথও বন্ধ দীর্ঘদিন। শৈশবের সাধারণ নিয়মে এরা সবই ভুলে গিয়েছে। স্কুলটা এদের কাছে এখন চাল-আলু-ছোলা-সাবান পাওয়ার রেশন ঘর মাত্র! আরও কিছুদিন পরে হয়তো আর বলবে না, কিন্তু এখনও আমাদের দেখলে কোনও কোনও অভিভাবক বলেন, ‘‘ইস্কুলটা খুলে দেন।’’ মন্বন্তর কেবল মানুষের শরীরেই নয়, মনেও আসে বইকি! দু’একজন ছাত্র মন্বন্তর পীড়িতের মতো শুকনো মুখে এসে দাঁড়ায়, জানতে চায়, শিগ্গির ইস্কুল খুলে যাবে, তাই না? তাদের চোখে আশা চিকচিক করে। কিন্তু আমাদের চাষাবাদ আর আশাবাদ দুটোই পেন্ডুলামের মতো ঝুলে আছে।

মিড-ডে মিলের চাল-আলু বিলির পরের দিন স্কুলে গেলাম। জনা পনেরো ছাত্র বাকি ছিল। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, স্থানীয় একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘দিদিমণি, আজ আবার কী আছে ইস্কুলে?’’ তাই তো!  ইস্কুলে আর কী থাকে! চাল, আলু, ছোলা, সাবান! যে গেটের সামনে ভিড় করে থাকে বাচ্চারা, কে আগে দৌড়ে গিয়ে পছন্দের জায়গা দখল করবে, ঠেলাঠেলিতে গেটটাও খোলা মুশকিল হয়, সেই গেটের সামনে কুকুর ঘুমিয়ে আছে নিশ্চিন্তে। তাদের ঘুম ভাঙিয়ে দেওয়া সেই দুষ্টু শিশুটা আজ কোথায়? সহপাঠীর নামে অভিযোগ করা সেই মুখগুলোই বা কোথায়? অভিযোগ করার সুযোগ না থাকলে অভিযোজন হবে কী ভাবে!

(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত। ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here