মজিবুর রহমান

পশ্চিমবঙ্গে কোভিড-১৯ অতিমারির আবহে সবচেয়ে উপেক্ষার শিকার বোধহয় শিক্ষা। সরকার ইতিবাচক ভূমিকা গ্ৰহণ করলে নয়-দশ মাস ধরে রাজ‍্যে সমস্ত বিদ‍্যালয় বন্ধ থাকত না। এমনিতেই সারা বছর শিক্ষা বহির্ভুত কাজে শিক্ষাঙ্গন সরগরম থাকছে। কিন্তু শ্রেণিকক্ষের পঠন-পাঠনের প্রতি পর্যাপ্ত নজর দেওয়া হচ্ছে না। পাঠ‍্য পুস্তকের পড়াশোনাকে গৌণ করে পাঠ বহির্ভুত বিষয় নিয়ে বিস্তর ব‍্যস্ততা তৈরি করা হচ্ছে। বিদ‍্যাচর্চার বদলে বিদ‍্যালয় সরকারি প্রকল্প রূপায়নের সহায়তা কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। লক্ষ্যের চেয়ে উপলক্ষ বড় হয়ে উঠছে। পড়ুয়াদের জন্য প্রচুর অর্থব্যয় করা হলেও তাদের পড়াশোনার প্রতি আগ্ৰহ সৃষ্টি অথবা শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিতে সেই অর্থব্যয় কতটুকু সহায়ক হচ্ছে তার কোনও মূল‍্যায়ন হচ্ছে না। একটি-দু’টি প্রকল্পের অধীনে সকল শিক্ষার্থীর কাছে সরকারি অনুদান পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু তা না করে প্রকল্পের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। প্রকল্প কেন্দ্রিক প্রচার প্রধান হয়ে উঠছে কিন্তু সেগুলোর প্রয়োজনীয়তা অথবা কার্যকরিতা নিয়ে পর্যালোচনা হচ্ছে না।

পশ্চিমবঙ্গ সরকার গত বছর মার্চ মাসের দ্বিতীয়ার্ধ্ব থেকে বিদ‍্যালয় বন্ধ করে দেয়। ছাত্রছাত্রীদের বাড়িতে পড়াশোনা করার কথা বলার পরিবর্তে শিক্ষামন্ত্রী তড়িঘড়ি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সকল পড়ুয়াকে ‘প্রমোশন’ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন। সবাই পাশ— এই কথাটা বলার জন্য এত তাড়াহুড়ো কেন? শিক্ষাবর্ষের শেষ দিকে এই ‘সুখবর’ জানালেও তো চলত। তা হলে ছেলেমেয়েরা বাড়িতে কিছুটা হলেও অন্তত লেখাপড়া করত। কিন্তু প্রমোশন পেতে ‘প্রবলেম’ নেই জেনে তারা আর পড়াশোনা করার তাগিদ অনুভব করেনি। বিষয়টি নিয়ে সরকারের তরফে আরও একটু চিন্তাভাবনার প্রয়োজন ছিল।

মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ন’বার মিডডে মিলের সামগ্ৰী বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র একবার ছাত্রছাত্রীদের ‘অ্যাক্টিভিটি টাস্ক’ দেওয়া হয়েছে। প্রতি মাসে মিডডে মিলের সামগ্রীর সঙ্গে এই ‘অ্যাক্টিভিটি টাস্ক’ জাতীয় ‘স্টাডি মেটেরিয়াল’ দিলে শিক্ষার্থীরা কিছুটা পড়াশোনার মধ্যে থাকত, বইপত্র শিকেয় তুলে রাখত না। কিন্তু সরকার ব‍্যাপারটি নিয়ে হেলদোল দেখায়নি। এর ফলে পড়ুয়ারা পেটের খাবার পেলেও মস্তিষ্কের খোরাক থেকে বঞ্চিত থেকেছে। সরকারি নির্দেশ অনুসারে বিদ‍্যালয়গুলো রেশন দোকানের মতো জিনিসপত্র বিতরণ করেছে। কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ার ব‍্যাপারে কোনও পদক্ষেপ বা পরিকল্পনা গ্ৰহণ করতে পারেনি। প্রশ্ন জাগে, সরকার কি তবে পড়াশোনা বাদ দিয়ে পড়ুয়াদের সামান্য চাল-ডাল পাওয়াকেই যথেষ্ট মনে করছে? একইভাবে, পঠন-পাঠন বাদ দিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষকদের দিয়ে মাসের পর মাস মিডডে মিলের জিনিসপত্র বিতরণ কতদূর সঙ্গত, সেটাও ভেবে দেখা দরকার।

মিডডে মিলের সামগ্ৰী সংগ্ৰহ করার জন্য ছাত্রছাত্রীদের বিদ‍্যালয়ে প্রবেশাধিকার নেই। তাদের বিদ‍্যালয়ে আসার উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এমনকি পড়ুয়াদের বিদ‍্যালয় প্রাঙ্গণে পা ফেলার ‘অপরাধে’ রাজ‍্যে কয়েকজন প্রধানশিক্ষক শাস্তির সম্মুখীন হয়েছেন। নিঃসন্দেহে, এটা সরকারের তরফে চরম বাড়াবাড়ির একটা দৃষ্টান্ত। পাঁচ জায়গা ঘোরাঘুরি করা অভিভাবকেরা স্কুলে আসবেন মিডডে মিলের জিনিসপত্র নিতে। তাতে করোনা ছড়াবে না। আর ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা বাড়ির বাইরে দু’পা ফেলে তাদের প্রিয় স্কুল আর মাস্টারমশাইদের কাছে এলেই করোনা ছড়িয়ে পড়বে? শিক্ষক-শিক্ষার্থী একে অপরকে সংক্রমিত করে ফেলবে? স্কুল আর শিক্ষক থেকে শিক্ষার্থীদের দূরে রাখার এমন সরকারি পরিকল্পনা সত‍্যিই বিস্ময়কর। সুরক্ষার দোহাই দিয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষালয় থেকে দীর্ঘদিন সরিয়ে রাখার কোনও মানে হয় না। অবিলম্বে বিদ‍্যালয়গুলোতে পঠন-পাঠনের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা উচিৎ।

গত বছর আকস্মিক ও অপ্রত‍্যাশিত ভাবে উচ্চ মাধ‍্যমিক পরীক্ষা বন্ধ করে দেওয়া হয়। তিন দিনের পরীক্ষা বাকি আছে এমন অবস্থায় পরীক্ষা স্থগিত হয়ে যায়। পাঁচ দিনের মধ্যে ওই পরীক্ষাগুলো হত। অর্থাৎ, মাত্র পাঁচ দিন অপেক্ষা করলেই সমস্ত লিখিত পরীক্ষা শেষ হয়ে যেত। বহু পরীক্ষার্থী ৬টির মধ্যে তিনটি বিষয়ের পরীক্ষাই দিতে পারল না। তাদের কেউ কেউ জেলা বা রাজ‍্যে র‍্যাঙ্ক করলো। এই কৃতীদের অনেকেই কিন্তু জানিয়েছে, তারা পরীক্ষা দিয়ে নম্বর পেলেই বেশি খুশি হত। ঢালাও নম্বর দিয়ে পাশ করিয়ে সরকার কি পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করছে? মোটেও নয়। মূল‍্যায়নে ত্রুটি মেধাবী ও পরিশ্রমী পড়ুয়াদের ক্ষতিই করে। যোগ‍্যতার চেয়ে বেশি নম্বর যারা পায় তারাও তার সদ্ব‍্যবহার করতে ব‍্যর্থ হয়। ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষা ও পড়াশোনায় সরকারের এত ঢিলেঢালা মনোভাব কখনও কাম‍্য হতে পারে না।

২০২১ সালের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ‍্যমিক পরীক্ষার সূচি ঘোষণা করা হয়েছে। জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এ বার কোনও টেস্ট হবে না। ২০২০ সালে দশম শ্রেণিতে যারা ভর্তি হয়েছিল তারা সকলেই মাধ‍্যমিক পরীক্ষায় বসতে পারবে। কিন্তু বিদ‍্যালয় বন্ধ থাকায় দশম শ্রেণিতে কোনও পরীক্ষা হয়নি। স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা মাধ‍্যমিকের প্রশ্নপত্র সম্পর্কে দশম শ্রেণির পড়ুয়াদের কোনও ধারণা দেওয়ার সুযোগ পাননি। অন‍্যদিকে, এ বার যারা উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসবে দ্বাদশ শ্রেণিতে তাদের কোনও ক্লাস হয়নি। স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সঙ্গে তাদের কোনও দেখা-সাক্ষাৎ নেই। এমন অবস্থায় মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিকের চূড়ান্ত পরীক্ষায় বসার আগে একবার তাদের প্রস্তুতিটা একটু পরখ করে নেওয়া দরকার। জুন মাসে পরীক্ষা এবং এপ্রিল-মে মাসে বিধানসভা নির্বাচনের আগে মার্চ মাস পর্যন্ত বিদ‍্যালয়ে মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের পঠন পাঠনের ব‍্যবস্থা করা হলে তারা অনেক উপকৃত হতে পারে। সরকারের এখনই এই ব‍্যাপারে উদ্যোগী হওয়া উচিত। রাজ‍্যের হাইস্কুলগুলোর এখন যা পরিকাঠামোগত অবস্থা তাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে দু’চারটি ক্লাস চালাতে কোনও সমস্যা হওয়ার কথা নয়। ছাত্রদরদী শিক্ষক-শিক্ষিকারাও চান, তাঁদের স্নেহের পড়ুয়াদের পরীক্ষার প্রস্তুতিতে কিছুটা সাহায্য করতে। বহু শিক্ষক-শিক্ষার্থী সরকারের সবুজ সঙ্কেতের অপেক্ষায় আছেন।

রাজ‍্য সরকার এ বার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের ট‍্যাব বা স্মার্টফোন কেনার জন্য দশ হাজার টাকা দিচ্ছে। কিন্তু এই উপকরণটি যে পড়ুয়াদের পড়াশোনার ক্ষেত্রে খুব সহায়ক হবে, এ কথা জোর দিয়ে বলা যায় না। নতুন যন্ত্রটি ব‍্যবহারে সড়গড় হতেই অনেকের অনেক সময় চলে যাবে। আবার কিশোর-কিশোরীদের হাতে এর অপব‍্যবহারের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তারা এটাকে পড়াশোনার চেয়েও অন্য অকাজে ব‍্যবহার করতে পারে। মনে রাখা দরকার, ছেলেমেয়েদের কৈশোরোচিত সমস্যার কথা মাথায় রেখে অনেক অভিভাবক সন্তানকে অ্যানড্রয়েড ফোন বা ট‍্যাব কিনে দিতে চান না। তাছাড়া যন্ত্রের সাহায্যে শিক্ষাগ্ৰহণ কখনও শ্রেণিকক্ষের বিকল্প হতে পারে না। সরকার উচ্চ মাধ‍্যমিকের পরীক্ষার্থীদের ট‍্যাব কিনতে টাকা দিচ্ছে ভাল কথা। কিন্তু তাদের পড়াশোনা বা পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য এটাকেই যেন যথেষ্ট মনে করা না হয়।

করোনা আবহে শিক্ষাক্ষেত্রে ইতিমধ্যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। এই আবহকে আর কোনওভাবেই প্রলম্বিত হতে দেওয়া উচিৎ নয়। স্কুল-কলেজ পুরনো ছন্দে ফিরে আসুক। কারণে-অকারণে বিদ‍্যালয় বন্ধের নিদান দেওয়া বন্ধ হোক। সব পেশার মানুষেরা কর্মস্থলে গিয়ে কাজ করতে পারবেন আর শুধুমাত্র শিক্ষাঙ্গনে পঠন-পাঠন বন্ধ থাকবে, এই অদ্ভুত নিয়ম-নির্দেশের অবসান ঘটুক। বিদ‍্যালয়ে বিদ‍্যাচর্চার পরিসর প্রসারিত হোক।

(লেখক কাবিলপুর হাইস্কুলের প্রধানশিক্ষক, মতামত ব্যক্তিগত। ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here