সোহম চক্রবর্তী

আমার ছোটবেলায় স্মার্টফোন ছিল না, ল্যাপটপ ছিল না, কম্পিউটার ছিল না, অতি ধীর ইন্টারনেট ছিল শুধু বেপাড়ার সাইবার ক্যাফেতে। এমনকি বেশ খানিকটা বড় বয়স পর্যন্ত জরুরি ফোন-কলের একমাত্র ভরসা ছিল পড়শির ল্যান্ডফোন।

ব্যক্তিগতভাবে আমার ছোটবেলার দুপুরে, বিকেলে ধু ধু মাঠে ক্রিকেট ছিল না, পাড়া দাপানো ফুটবল ছিল না, অলিগলির সাইকেল ছিল না; টিউশনে ছোটার তাড়াও আলতো শৈশবের গায়ে আছড়ে পড়েনি তখনও। মোটের উপর ছোটবেলা তখনও ছিল শান্ত, কোমল–সময়ের রেডি, স্টেডি, গোল্লাছুট তখনও শুরু হয়নি আজকের মতো করে।

তার উপরে ব্যক্তিগত বেড়ে ওঠার আপন বৈশিষ্ট্যে সেই শুরু থেকেই আমি ছিলাম আজন্ম মুখচোরা, লাজুক, অন্তর্মুখী, ভিড়ের সঙ্গে পা ফেলতে না পারা একা একটা ছেলে। অতি সুরক্ষার ঘেরাটোপে বাঁধা আমার ছোটবেলায় বাইরের পৃথিবীর আলো এসে পড়ত যেটুকু, তার চেয়ে হাজারও গুণে বেশি দীপ্তি আমি এঁকে নিতাম নিজের মনে, কল্পনায়। সেই কোন ছোটবেলা থেকেই একা একা নিজের মধ্যে খেয়ালখুশির একটা আপন দুনিয়া বয়ে চলেছি আমি। অন্তত সেই পৃথিবীতে নিভৃত নির্জন এই ছেলেটাই একাকী অধীশ্বর। আর সেই সুদূর ছোটবেলা থেকেই ওই পৃথিবীর মুখ্য কুশীলবদের সন্ধান দিত বই।

হ্যাঁ, বই। আমার ছোটবেলায় অনেক কিছু না থাকাকে ছাপিয়ে গিয়ে প্রবলভাবে ছিল বই, বইয়ের পাহাড়। ছিল অযুত লক্ষ গল্প আর গান। ভাঙা ভাঙা টেপরেকর্ডারে ছিল জর্জ বিশ্বাসের গলা। ঝমঝম বর্ষার রাতে ছিল দিদার কোলের ওমে মাথা রেখে শোনা ঘুমপাড়ানি অজস্র আখ্যান। এই একা ছেলেটার ভিতর অজান্তেই হু হু ক’রে ঢুকে পড়ত তারা, উড়ে বেড়াত ছটফটিয়ে, আর ভিতর ভিতর কোন গভীর অতলে বোনা হয়ে যেত সেই আপন দুনিয়ার ফুল ফুল নকশিকাঁথাটি।

আমার ছোটবেলা জুড়ে যেমন ঠাকুরমার ঝুলি ছিল, ক্ষীরের পুতুল ছিল, আবোল তাবোল ছিল, রামায়ণ মহাভারত ছিল, সুখলতা রাও-এর গল্প ছিল, তেমনই ছিল রুশ উপকথার ছোট্ট ইভান। আমার ছোটবেলা জুড়ে যেমনটি ঠিক অরুণ বরুণ কিরণমালা ছিল, লালকমল নীলকমল ছিল, সুয়োরাণী দুয়োরাণী ছিল, দিদার গল্পের রাক্ষস খোক্কস ছিল, উপেন্দ্রকিশোরের টুনটুনি ছিল, হাঁদা ভোঁদা ছিল, নন্টে ফন্টে ছিল, বাঁটুল দি গ্রেট ছিল, ঠিক তেমনি করেই ছিল চাচা চৌধুরী, অ্যাস্টেরিক্স আর টিনটিন।

প্রতি একমাস কি দু’মাস অন্তর বায়না করে করে ঠিক আদায় করে নিতাম টিনটিনের একটা একটা বই। তখন প্রাইমারি স্কুল– সকালবেলায়। সাড়ে ৮টা- ৯টার টিফিনবেলায় সারা মাঠ ধুলো করে বন্ধুদের খেলা। এমনকি খেলা ফাঁকা করিডোরে, রাস্তার পাশে, চাতালে, কদমতলায়। বেঞ্চের ভাঙা পায়া– ব্যাট। জলের প্লাস্টিক বোতল– ফুটবল। দু’ একটা দিন প্লাস্টিকের বল, কারও কারও বাড়ি থেকে লুকিয়ে নিয়ে আসা। আজন্ম দলছুট আমি– খেলায় না নেওয়া ছেলে। কারও বেছে নেওয়ার মুখোমুখি যতবার আমাকে এনে ফেলেছে জীবন – ততবারই বাদ পড়ে গেছি টসে, ব্যতিক্রমহীন। কাজেই পঁয়তাল্লিশ মিনিটের টিফিন পিরিয়ডে আমার গন্তব্য ছিল খাঁ খাঁ ছাদের কমনরুম, আর সঙ্গী ছিল টিনটিনের বই।

রয়েসয়ে আস্তে আস্তে পড়তাম, জিইয়ে রাখতাম কৌতূহল – যাতে আবার পরের দিনও ফিরে আসা যায় এক কোণের এই টেবিলে। একবার শেষ হ’য়ে গেলে দু’ দিন পরে আবারও পড়তাম ফিরে, শুরু থেকে। কবেকার সেই স্কুলের ছাদে রাখা ছিল আমার একখণ্ড মার্লিনস্পাইক। বলে রাখি, আমি আজন্মের গর্বিত বাংলা মাধ্যম। তাই আমার টিনটিন যতটা না ছিল হার্জ বা তাঁর ইংরাজি অনুবাদকের, তার চেয়ে অনেক বেশি করে ছিল নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর। স্নোয়িকে আমি চিনতাম না কোনওদিনই, যেমনটি চিনতাম কুট্টুসকে। নীরেন্দ্রনাথ টিনটিনের যে শুধু অনুবাদ করেছেন তা-ই নয়, তার মধ্যেকার সহজাত বিদেশি ইমেজটিকে সম্পূর্ণ ভেঙেচুরে তাকে রি-কনস্ট্রাক্ট করেছেন আপামর বাঙালি বালকের একান্ত আপন এক বিস্ময়তরুণ রূপে, তাঁর স্বভাবসিদ্ধ অপূর্ব সহজ বাকদক্ষতায়। ক্রুদ্ধ হ্যাডক, কালাভোলা ক্যালকুলাস কিংবা নির্বোধ জনসন রনসনের সংলাপে বাংলা শব্দ নিয়ে তিনি যে কল্পনাতীত খেলা দেখিয়েছেন, তা আদ্যন্ত বাঙালি হিউমরের এক নতুন রাস্তা খুলে দিয়েছে বললেও অত্যুক্তি হবে না।

কুট্টুসের স্বগতোক্তি কিংবা টিনটিনের বুদ্ধিদীপ্ত সাহসী কথোপকথন – সমস্তটা মিলিয়ে তিনি টিনটিনের পুরো আবহটাকেই পুনর্নিমাণ করেছেন স্বাভাবিক এক বাঙালিয়ানার ফ্রেমে। ফলত খুব সহজেই বাঙালি শিশুর কল্পনায় সে হয়ে উঠতে পেরেছে এক জাদুকরী আইডলের মতো। আশ্চর্য সহজ সারল্যে টিনটিন বাঙালি শিশুর নির্মীয়মাণ কল্পজগতকে ভ্রমণ করিয়েছে ইতিহাস ভূগোলের ব্যাপ্ত পরিসরে, পৃথিবীর সীমা ছেড়ে নিয়ে গেছে দূর মহাকাশে।

টিনটিনের বইগুলির পাতায় আসলে লেগে আছে আমাদের সহজ সবুজ ছোটবেলার ঘ্রাণ। একটুকুও বয়স বাড়েনি তার। যদিও বড় হয়ে আমরা খুঁজতেই পারি টিনটিনে প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক স্টেটমেন্ট, গা-গরম করতেই পারি ঠিক-ভুল, ভাল-মন্দের অযথা জটিলতায় – তবে সে সবকিছুর বাইরে দাঁড়িয়ে টিনটিন সকালের নরম রোদে বিছিয়ে দেয় এই দলছুট, একলা ছেলেটার বিগত ছোটবেলা। একলা একা টিফিনবেলার মতো আমার এই সারাটি জীবনে একবেঞ্চের বন্ধু হয়ে বসে থাকে সে, পাশে।

বছর বছর পেরিয়ে যায় জন্মদিন তার – মার্লিনস্পাইক হলে জমে ওঠে পার্টি, নেস্টরের হাত থেকে শ্যাম্পেনের বোতল তুলে নেন ক্যাপ্টেন হ্যাডক, বাজখাঁই বেসুরো গলায় গান ধরেন বিয়াঙ্কা কাস্তাফিওর; ক্যালকুলাসের পেন্ডুলাম দোলে বয়সের প্রাজ্ঞ হাওয়ায় – ফিকে হয়ে আসে স্কুল, ছাদের কমনরুমে, একা একা পড়ে থাকা কোণের টেবিলে জমে সময়ের ধুলো – তবু টিনটিন শুধু বারবার ছুড়ে ছুড়ে ফ্যালে বয়সের মেসারিং টেপ; একা ছেলেটার ছোটবেলা হয়ে হাত নাড়ে দূর রানওয়ে থেকে।

পিছন ফিরতে দেখি, কবে কোন ঘণ্টিতে ফুরিয়ে গিয়েছে আমার একাকী টিফিন, কবে যেন উড়ে গেছে কাগুজে প্লেনের ছোটবেলা – ‘ফ্লাইট ৭১৪’ – দলছুট ছেলেটাও কবে একা একা বড় হয়ে গেছে…

(টিনটিনের সব ছবি গুগল থেকে নেওয়া)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here