সুদীপ জোয়ারদার

শরীর ভাল নেই বেশ কিছুদিন ধরেই। বাত, অর্শ, ম্যালেরিয়া, অজীর্ণ, কী নেই! একেই কি বলে কালে ধরা? আশঙ্কটা সেদিন মুখ দিয়ে বেরিয়েই এল, ‘এ বার বুঝি তোমাদের কাছ থেকে শেষ বিদায় নিতে হয়, সুরেনমামা!’

এমন কথায় কাছের মানুষের বুক মুচড়ে ওঠাই স্বাভাবিক। এই কি সেই দৃঢ়, শক্ত শরৎচন্দ্র, যাঁকে সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় চিনতেন  ছোটবেলা থেকে!

—‘ভুগে ভুগে খুঁটি আলগা হয়ে গেছে। আমি আর বাঁচব না সুরেন!’ কাতর গলা শরৎচন্দ্রের।

সামতাবেড়ের গ্রামের বাড়িতে পড়ে থাকলে অবস্থা যে দিনকে দিন আরও খারাপ হবে বুঝলেন সুরেন্দ্রনাথ। কিন্তু কলকাতায় গিয়ে চিকিৎসা করাতে ইচ্ছে নেই শরৎচন্দ্রের। তবু শেষ অব্দি নিমরাজি হলেন। পালকি এল। ভিড় করে এলেন গ্রামবাসী।

গ্রামের রাস্তা দিয়ে পালকি চলেছে। বেহারাদের গানের তালে তালে পিছিয়ে যাচ্ছে গ্রাম, প্রান্তর। শুষ্ক, পাণ্ডুর মুখ শরৎচন্দ্রের। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে, চিকিৎসা নয়, যেন চলেছেন অনন্ত যাত্রায়।

পড়াশোনা, লেখালেখি বন্ধ কবে থেকে! ‘বিচিত্রা’য় ‘আগামীকাল’, ‘ভারতবর্ষ’এ ‘শেষের পরিচয়’ কিছুটা প্রকাশিত হয়ে অসম্পূর্ণ হয়ে পড়ে আছে। নেতিয়ে যাওয়া শরীরে লেখার কথা ভাবাটাই অসম্ভব। আর এ জীবনে লিখলেনও তো কম নয়!

নাম হয়েছে, মানুষ তাঁর লেখায় মজেছেন, রবীন্দ্রনাথের উজ্জ্বল জ্যোতির পাশে দাঁড়িয়েও আদায় করে নিয়েছেন আলাদা সম্ভ্রম এ সব যেমন সত্যি, আক্রমণও তো কম হয়নি। তাঁর সাহিত্যে ভাবীকালের জন্য কিছু নেই, তাঁর গল্প উপন্যাস পড়ে ছেলে ছোকরারা অধঃপাতে যাচ্ছে, কত অভিযোগ!

ব্যক্তি আক্রমণও প্রচুর। এই তো কিছুদিন আগের কথা। ’শ্রীহর্ষ’ পত্রিকায় প্রবোধকুমার সান্যাল তাঁর সম্পর্কে লিখলেন, তিনি নাকি ইউরোপীয় ভাবধারা শিখেছেন দিলীপ কুমার রায়ের কাছ থেকে, ব্যাকরণ শিখেছেন কালিদাস রায়ের কাছে, আর রাজনীতি কিরণশঙ্কর রায়ের কাছে!

এ সবে কোনওদিনই কিছু মনে করেননি। সেদিনও নয়। দু’দিনের জীবন, গোলযোগ ভাল লাগে না। কালিদাস রায় এর প্রতিবাদপত্র লিখে একদিন দেখাতে আনলেন। সে লেখা কুটিকুটি করে ছিঁড়ে ফেলেই দিলেন আগুনে।

তাঁর চির আরাধ্য রবীন্দ্রনাথের যখন মন জয় করে নিয়েছেন, তখন এ সব দুর্নামে কী যায় আসে! ‘বাসি ফুলের মালা’ তাঁর লেখা নয় সত্যি, কিন্তু কবির নায়িকা যখন জানায়, ‘তোমার শেষগল্পের বইটি পড়েছি শরৎবাবু… তোমাকে দোহাই দিই, একটা সাধারণ মেয়ের গল্প লেখো তুমি/বড়ো দুঃখ তার’, তখন এ তো তাঁরই স্বীকৃতি। আর কী চাই!

অশ্বিনী দত্তের রোডের বাড়িতে ইজিচেয়ারে শুয়ে শুয়ে কত কী ভাবেন শরৎচন্দ্র! ভক্তের দল মুহুর্মুহু আসছে খবর নিতে। চিকিৎসক বিধানচন্দ্র রায়, কুমুদশঙ্কর রায় ভার নিয়েছেন চিকিৎসার। এক্স-রে করা হল অন্ত্রের। রিপোর্ট দেখে ডাক্তারদের মুখ ভার। যকৃতে ক্যান্সার তো হয়েইছে, পাকস্থলীতেও তা ছড়িয়েছে।

প্রথমে নিয়ে যাওয়া হল একটা ইউরোপীয় নার্সিংহোমে। কিন্তু জায়গাটা লেখকের পছন্দ হল না। তাঁকে স্থানান্তরিত করা হল পার্ক নার্সিংহোমে। বিধানচন্দ্র বোঝালেন, অপারেশন ছাড়া গতি নেই। ললিত বন্দ্যোপাধ্যায় অপারেশন করলেন। অপারেশন ঠিকঠাকই হল। কিন্তু সে অপারেশন বিগড়ে গেল রোগীরই ভুলে। নির্দেশ ছিল, মুখ দিয়ে কিছু খাওয়া যাবে না। কিন্তু রাতে মুখ দিয়ে পরিচিতজনের সাহায্যে আফিম জল নিতেই বমি শুরু হল। ভোরের দিকে জ্ঞান হারালেন শরৎচন্দ্র। সকাল ১০টা। কথাশিল্পীর জীবনাবসান হল। ১৬ জানুয়ারি, রবিবার সেদিন। আর সালটা ১৯৩৮।

রেডিয়ো মারফত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ল শরৎচন্দ্রের মৃত্যুর খবর। শান্তিনিকেতনে ইউনাইটেড প্রেসের প্রতিনিধি রবীন্দ্রনাথকে শরৎচন্দ্রের মৃত্যুর খবর জানালে কবি শোকাভিভূত হয়ে পড়লেন। হাসপাতালে ভর্তির সময় তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে শরৎচন্দ্রকে চিঠি লিখেছিলেন, ‘তোমার আরোগ্য লাভের প্রত্যাশায় বাংলাদেশ উৎকন্ঠিত হয়ে থাকবে।’ আজ সেই প্রত্যাশার করুণ পরিণতি। ইউনাইটেড প্রেসের প্রতিনিধিকে রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘যিনি বাঙ্গালীর জীবনের আনন্দ ও বেদনাকে একান্ত সহানুভূতির দ্বারা চিত্রিত করেছেন, আধুনিক কালের সেই প্রিয়তম লেখকের মহাপ্রয়াণে দেশবাসীর সঙ্গে আমি গভীর মর্মবেদনা অনুভব করছি।’ পরদিন, রবীন্দ্রনাথের এই বক্তব্য বেরও হল সংবাদপত্রে।

বেশ কিছুদিন আগে শরৎচন্দ্রের সংবর্ধনা উপলক্ষে লেখা এক পত্রে,রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘সাহিত্যের দান যারা গ্রহণ করতে আসে তারা নির্মম। তারা কাল যা পেয়েছে, তার মূল্য প্রভূত হলেও আজকের মুঠোয় কিছু কম পড়লেই ভ্রুকুটি করতে কুন্ঠিত হয় না।’ শরৎচন্দ্র সম্পর্কে সাহিত্যপাঠকের এই মানসিকতা এ কালে প্রকট হলেও, সেকালে তা ছিল না। তাই শরৎচন্দ্রের মৃত্যুর পরে কিছুদিন ধরে চলল সারা দেশ জুড়েই শোকজ্ঞাপন।

‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকা পরপর দু’সংখ্যা শরৎসংখ্যা হিসাবে প্রকাশ করল। সুভাষচন্দ্র বসু জানালেন, ‘শরৎচন্দ্রের সাহিত্যের ও কর্ম্মজীবনের প্রেরণা আমাদের অন্তরে অমর হয়ে থাকুক।’ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বললেন, ‘যতদিন বাঙলা ভাষা বাঁচিয়া থাকিবে, ততদিন বাঙালীর সুখদুঃখের সাথী শরৎচন্দ্রকে কেহ ভুলিবে না।’

আর রবীন্দ্রনাথ লিখলেন সেই অবিস্মরণীয় কয়েকটি লাইন, ‘যাহার অমর স্থান প্রেমের আসনে/ক্ষতি তার ক্ষতি নয় মৃত্যুর শাসনে/দেশের মাটির থেকে নিল যারে হরি/দেশের হৃদয় তারে রাখিয়াছে ধরি।’

(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)