বিপ্লব বিশ্বাস

এই রাজ্যের অর্থ কমিশন, সাম্প্রতিক পে কমিশন সূত্রে অর্থনীতিবিদ অভিরূপ সরকারের নাম বহুল পরিচিত, কিছুদিন আগে প্রয়াত কবি আলোক সরকারকেও চেনেন সমমনস্ক আত্মজন; কিন্তু প্রথমজনের পিতা ও দ্বিতীয়জনের অগ্রজ সহোদরকে চেনেন না বুদ্ধিজীবী বা সৃজনী সংস্কৃতি জগতের বহু মানুষ। একই দশা এই প্রজন্মের কলমচিদের অনেকেরই।

হ্যাঁ, আমি সেই কবি-মানুষের কথা বলছি যাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ মাত্র দু’টি—’দূরের আকাশ’ আর ‘যাও, উত্তরের হাওয়া’। যাঁরা সৃজনের সংখ্যাবিচারে অর্থাৎ মান নয়, পরিমাণ দিয়ে সৃজকের বিচার করেন তাঁদের কাছে একান্তই অকিঞ্চিৎকর এই প্রায় অনালোকিত, অনালোচিত মানুষটিকে নিয়ে জন্মশতবর্ষে স্মৃতিপথে ফেরারূপ অমলকৃত্য করার দায়ভার নেওয়া। তাই ‘কলকাতার যিশু’ পত্রিকাগোষ্ঠীর মতো হয়তো আর এক দু’টি সংস্থা তাঁকে স্মরণে এনেছে কিন্তু সে ভাবে আলো ফেলেননি আর কেউ। তিনি অরুণ কুমার সরকার (১৯২১ – ১৯৮০) এক অভিমানী, উদারচেতা, রসিক তথা অনুগ্র চিত্তবৃত্তিসম্পন্ন শব্দপ্রেমী, শক্তিধর কর্কটরোগের কাছে হার মেনে যিনি চলে গিয়েছেন এমনই এক জানুয়ারি দিনে (১৩ জানুয়ারি), আজ থেকে একচল্লিশ বছর আগে।

কর্মসূত্রে ছিলেন শুল্ক বিভাগের আধিকারিক যাঁর অম্লান সহযোগিতার কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছেন শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার মহাশয়। তৎকালিক প্রখ্যাত প্রকাশক সংস্থা ডি কে’র সিগনেট প্রেস থেকে বই প্রকাশের আমন্ত্রণ পেয়েও নিজে না পাঠিয়ে আমন্ত্রণ গোপন রেখে বন্ধুবর নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘নীল নির্জন’-এর পাণ্ডুলিপি জমা দিয়েছিলেন এই মানুষটি। একবার বিষ্ণু দে’র সঙ্গে সাক্ষাৎ আলাপ করেও তাঁর মুখ থেকে তেমন বাক-নিঃসরণ না হওয়ায় পরে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন ‘আপনার সম্ভবত ওষ্ঠকাঠিন্য হয়েছিল’। কাব্যক্ষেত্রে তিনি সম্মিলন ঘটিয়েছিলেন প্রেম ও প্রকৃতির, আবার সামাজিক অসাম্যের বিরুদ্ধেও ঝলসে উঠেছিল তাঁর কবি-কলম। তিনি বিশ্বাস করতেন, সব কবিতাই চক্রাকারে পুনর্লিখিত; সেখানে জীবন বারবার জীবনকেই বহন করে চলে। এই মানুষটি হয়তো অন্তর্গত ঢঙে বুঝেছিলেন তাঁর প্রতি উপেক্ষার অপাঙ্গ-দৃষ্টিকে তাই অভিমান-সিক্ত কলমে ‘প্রার্থনা’ জানিয়েছিলেন: ‘যদি মরে যাই, ফুল হয়ে যেন ঝরে যাই / যে ফুলের নেই কোনো ফল / যে ফুলের গন্ধই সম্বল… ‘ ইত্যাদি ইত্যাদি।

যাই হোক, তাঁর কাব্যালোচনার অধিকার আমার নেই। শুধু তাঁকে নব প্রজন্মের কাছে প্রাথমিক পরিচিতি দিতেই এই মুখপাতটুকু। আজ আমি আমার বেয়াড়া স্বভাবসিদ্ধতায় এই কবির একটি গল্প নিয়ে আলোচনা করব। গল্পটির নাম ‘উচাটন’ যা ১৩৯৪ বঙ্গাব্দের শারদীয় ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এ গল্প জীবনের পাকদণ্ডী পথ-পরিক্রমায় উত্তেজনা অন্বেষণের, কখনও তা হেতুক, কখনও বা অহেতুক। খুঁজছে কে? সন্তোষ গাঙ্গুলি নামে এক নিম্ন -মধ্যবিত্ত বঙ্গীয় কেরানি যার অফিস-জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িত হাতলভাঙা চেয়ার আর ছারপোকার কামড় ( আজ হয়তো এই কবজকুণ্ডলী অনুষঙ্গ অন্তর্হিতপ্রায়)। আর আছে নিস্তরঙ্গ যোগ-বিয়োগের আঙ্কিক কাজ, আবশ্যিক অথচ একঘেয়ে। কিন্তু অফিসান্তে এই ঘানিটানা মানুষটিই ভোল পালটে চনমনে। সে তখন স্বাধিকারপ্রমত্ত মুক্তমানব যেন। গল্পকারের বয়ানে ‘বিকেলের আকাশের মতো’ মুখচোখের রং পালটে যায় তার, চেহারায় আসে জোস-ডালহৌসির ভিড় ঠেলে ‘উড়ন্ত ঘুড়ির পেছনে ছুটন্ত শিশুর মতো ছিটকে ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে সন্তোষ’- যে কোনও যান ধরে দ্রুততায় চলে আসে কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে। সেখানেই সন্ধ্যা ছটা থেকে নটা, তার রোজ-জীবনের অগ্লান একান্ত-নিজস্ব সময়টুকু কাটাতেই এই অস্থির চলন; কেননা এটুকুই তার ‘বেঁচে থাকার একমাত্র জবাবদিহি’, কার কাছে? সেই জীবনেরই কাছে। এই অস্থিরতার আরও গুরুতর কারণ হল রোজ-যাপনের বিভীষিকাময় বৃত্ততা- রাতের নিঃসঙ্গ বিছানা, অপার শ্রান্তি, আবার সকাল, আবার অফিস…পুনরাবৃত্ত প্রাত্যহিকতা।

তাই যেটুকু চেটেপুটে নেওয়া যায় জীবনের নির্বিঘ্ন রস। তাই দুপুরের কুকুরের মতো হাঁপিয়ে, হেদিয়ে, খানিক দম নিয়ে, ‘বয়’ বলে হাঁকড়িয়ে, টুক করে ল্যাভাটরিতে ঢুকে আয়নায় নিজেকে জরিপ করতে থাকে সন্তোষ। আর সেখানেই দার্শনিক প্রশ্নে জর্জরিত হয় সে। ভাবে, অযুতবার দেখা স্ব-মুখাবয়ব মানুষ কেন ঝট করে স্মরণে আনতে পারে না! প্রসঙ্গত জওহরলাল নেহরুর কথাও মনে আসে তার রোজ যাঁকে নানা ঢঙে, নানা স্থানে নিজের মুখটা দেখতে হয়- তাঁরও কি এমনটা হয়!  অবশ্য সে নেহরু হতে চায় না; স্ব-মুখের সঙ্গে অন্তরঙ্গতা কাম্য নয় তার। এই ভাবনা পারম্পর্যে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে সে, তার সুন্দর দাঁত বিজ্ঞাপিত করে যা দেখে তার এক বন্ধু ত্রিদিব ঘোষ বলেছিল, যে কোনও মেয়েই পটে যেতে পারে এ হাসির বলস্বী বিদ্ধতায়। সেই থেকে মনখারাপি সময়ে সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাসে আবার সেখানে প্রতিবিম্বিত ঠোঁটে চুমু খেতে গিয়ে ধরা পড়ে যায় বৌদির কাছে, অভিহিত হয় ‘আস্ত পাগল’ বিশেষণে।

যাই হোক, অন্যোন্য ঘটনাযুক্ততায় এরপরই তার নজর পড়ে কফি হাউসের পাশের টেবিলে যেখানে এক রহস্যময়ীকে ঘিরে ‘মৌমাছির মতো মশগুল’ তিন যুবক। সবাই সেই মোহময়ীর কাছে পৌঁছতে চাইছে, পারছে না সঙ্গলাভের অস্থৈর্যের কারণে; আর মেয়েটি পুতুল নাচানোর ঢঙে ‘কফির পেয়ালায় চামচ নাচাচ্ছে’ যেন। হঠাৎ সন্তোষ মেয়েটিকে জরিপ করতে শুরু করে। সে এক অদ্ভুত প্রয়াস। তার পোশাক-পরিধেয় থেকে পায়ের জুতো অব্দি। এর মধ্যেই শরীরী জরিপকালে সে ভাবে, মেয়েটির হয়তো ‘বুকশাসনী’ লাগে না কেননা তার ‘বুক চীনে মেয়েদের মতো সমতল’। যাই হোক, শেষত আঙ্কিক হিসেবে সেই মোহজালের মূল্য দাঁড়ায় একশো একাত্তর টাকা। এক ফাঁকে তার সম্পর্কে ‘মেয়েলিমা’ শব্দটি প্রয়োগ করে সন্তোষরূপী লেখক ভাবেন এমত শব্দ-উদ্ভাবন সঠিক হল কি না! বয়সের হিসেবে মেয়েটি ‘পনেরোই হবে বড়জোর’।

হঠাৎই ভাবনা-শৃঙ্খলে এই মেয়েটির অনুষঙ্গে তার ‘কচি পাঁঠা’র কথা মনে হয় আর কনডিশন্ড রিফ্লেক্সের ঢঙে চোঁ চোঁ খিদে পেয়ে যায়। সন্তোষ তুরন্ত অর্ডার দেয় মাটন স্যান্ডউইচের, উচ্চণ্ড উচাটন সঙ্গী করে। এরমধ্যেই তার ডানদিকের টেবিল থেকে আছড়ে পড়ে সাম্যবাদী রাজনৈতিক কূটকচাল যার আনুষঙ্গিক শব্দসম্ভার তার কাছে বিজাতীয় তথা বিরক্তিকর ঠেকে। এই দৃশ্য-স্রাব্য অবস্থান সূত্রেই ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত তার প্রত্যক্ষ-জড়িত রাজনৈতিক জীবনে ফিরে যায় সে যখনকার শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে তাক উদ্ধার করেছিল অলকা রায় নামের সম্পর্ক-নৈকট্যযুক্ত এক প্রাণোচ্ছল মেয়ে- যদিও তিক্ত নেতিক্রিয়াই ছিল সেই বিচ্ছেদের মূলে। এবারে যথারীতি চলে আসে অলকাচর্চা-পরিচয়ের প্রাথমিকতা নিয়ে। সে খানিক দীর্ঘ সময়-বিন্যাস যেখানে তিক্ত সম্পর্ক-সমাপ্তি সূত্রে সন্তোষ কৃতজ্ঞতাভাজন হয় অলকার কেননা তাকে অসৎ, প্রতিক্রিয়াশীল, পাতিবুর্জোয়া, সাম্রাজ্যবাদের দালাল হিসেবে দেগে দিয়ে পার্টি থেকে বহিষ্কারের ব্যবস্থা করলেও সে তাকে ‘অন্ধগলির ঘুপসি ঘর থেকে’ উদ্ধার করে ‘বিস্তৃত রাজপথের চোখধাধানো আলোয়’ ঠেলে ফেলে দিয়েছিল যে আলোও তার কাছে সহনীয় নয়।

অপেক্ষার ঘড়ি সাড়ে ছয়ে পৌঁছলেও তার প্রার্থিত শঙ্কর আসতে দেরি করছে এবং গল্পের শেষতক তার কোনও উপস্থিতি নেই। অথচ তাকে নিয়ে আছে অস্থিরতা। এ ভাবেই নানা ভাবনাবৃত্ত সম্পূর্ণ করে বর্তমানে ফিরে সবকিছুই তার বালখিল্য মনে হয় এবং টেবিলে পড়ে থাকা ছাইদানিটা সে এমন ‘জোরে ঠোকে যে চারপাশের লোকজনেরা না তাকিয়ে থাকতে পারে না।’ শেষ হয় উচাটন, শেষ হয় গল্প।

আসলে জীবনপথ পরিক্রমার এই আখ্যানে নিয়ত অন্তর্গত অস্থিরতা পীড়িত করে সন্তোষনাম্নী এক সাধারণ মানুষকে- সাধারণ ছোটো-বড়, দৃশ্য-অদৃশ্য ঘটনার আড়াল-আবডালে যে মানুষটি আক্রান্ত হয় এক অধরা স্থৈর্যহীনতায়। আর নিয়তিতাড়িত এই উচাটন গল্পের হাল ধরে বয়ে নিয়ে যায় সন্তোষকে, জীবনের কোনও স্তরেই যে সন্তুষ্ট হতে পারে না কিছুতেই- কেউই পারে না তা। জীবনের এটাই অপহ্নুত ব্যঞ্জনা, খিন্ন দ্যোতনায় যা দোল খায় জীবন-পথিকের এবড়ো-খেবড়ো পথচলায়। গল্পে পরস্পর চলচ্ছবি মানুষ সন্তোষকে পূর্ণতরভাবে প্রকট করে তোলে পাঠকসমক্ষে। গল্পচলনের কাব্যময়তা কবিসুলভ কলমেরই পরিচায়ক।

তথ্যসূত্র: ১) সুব্রত রুদ্র সম্পাদিত ‘কবির গল্প’।
২) ‘কলকাতার যিশু’ পত্রিকার অরুণ স্মরণ তথা আন্তর্জালিক তথ্য।

(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)