সুদীপ জোয়ারদার

If winter comes, can spring be far behind, কথাটা শুনলে মনে হয়, শীতকে কবিরা বিদায় করতে পারলেই বাঁচেন। তবে যেহেতু কেউ কেউ কবি, সবাই নন, তাই শীত নিয়ে শীত-ভোগা কিছু মানুষ ছাড়া অন্য সাধারণদের মনে কবিদের মত ছি-ঘেন্না তো নেই-ই বরং শীতের প্রতিকূলতার মাঝে দাঁড়িয়েও তাঁরা শীতকে সাজিয়ে তুলতে চান।

সেজন্য মেলায়, উৎসবে, আহারে, বিহারে শীত আম-আমাদের কাছে হয়ে যায় বর্ণময় এবং বিলাস ও উপভোগের এক ঋতু। কোকিলের কুহু ডাকে শীত সমাপ্তির ঘণ্টা বাজে একদিন। তাই শুনে আহ্লাদের সীমা যাঁদেরই ছাড়াক, শীত-বিলাসীদের কিন্তু খুব আনন্দ হয় না। বরং দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর কোকিলের ডাক শুনে সেই যে বলেছিলেন, ওই ডাকই ‘ফুলকপি নিয়ে গেল গালে মেরে চড়’, ফুলকপি এখন সারাবছর পাওয়া যায় বলে সে নিয়ে আক্ষেপ না থাক, অন্য অনেক কিছুর ব্যাপারেই কুহু ডাকের প্রতি শীত-বিলাসীদের কিন্তু এরকমই মনোভাব থেকে যায় ।

এই ‘অন্য অনেক কিছু’র মধ্যে প্রধানটি অবশ্যই পিঠেপুলি। পিঠেপুলি শীত ছাড়া কি খাওয়া যায় না? যায় বইকি। কিন্তু পৌষ-পার্বণ কেন্দ্রিক দিনগুলো পেরিয়ে গেলে পিঠেপুলির সেই আমেজটাই যেন চলে যায়। তাছাড়া মেয়েলি প্রবাদে আছে, সরস্বতী পুজোর পরে গোটা পিঠে খেতে নেই। অতএব শীতের পৌষ পার্বণের দিনটি তো বটেই, তার আশে পাশে জমাটি শীতে পিঠেপুলি তৈরি ও খাওয়াই আম-বাঙালির কাছে সেরা শীত-সুখ।

পিঠের প্রধান উপকরণ খেজুরের গুড়, নারকেল, চালের গুঁড়ো বা সুজি, মুগ বা কলাই ডাল, ঘন দুধ, খোয়া ক্ষীর, এলাচের গুঁড়ো এবং কখনওসখনও এক-আধটু কর্পূর। আজকাল তো সব জিনিসই মহার্ঘ। কিন্তু এককালে শীতে এই জিনিসগুলোর কোনওটাই তেমন কুলীন ছিল না মূল্যের নিরিখে। সেই সঙ্গে ছিল মা-ঠাকুমাদের হাতের গুণ। ফলে পৌষ-পার্বণ রকমারি পিঠেপুলিতে একেবারে জমে যেত তখন।

যে দুই মাস মিলিয়ে শীত, তার মধ্যে পৌষের আদর বাঙালির কাছে সে সময় একটু বেশিই ছিল। কারণ, পৌষ ছিল লক্ষ্মীমাস। আর এ পরিচয় শুধু বইপত্র বা পাঁজিপুথির হিসেবে ছিল না। পৌষ নিয়ে দীনেন্দ্রকুমার রায় লিখেছেন- ‘চারি দিকেই সজীবতার হিল্লোল বর্তমান; যেন দেবী কমলা তাঁহার কমলাসন পরিত্যাগপূর্বক ধান্যের ‘আড়ি’ কক্ষে লইয়া বঙ্গের গৃহে গৃহে অন্ন বিতরণ করিতেছেন।’

আর শুধু কি অন্ন? গোলা ধানে ভর্তি তো অঘ্রানেই হয়ে গেছে। কিন্তু শীত মানে শুধু তো তাই-ই নয়, ক্ষেতে রয়েছে রকমারি আনাজও। ফলে বড়লোকি না থাক, সচ্ছলতা ছিল অনেকটাই। সুতরাং পিঠেপুলি তৈরির ক্ষেত্র সব দিক দিয়েই প্রস্তুত। অতএব পৌষ সংক্রান্তির দিন, ‘সকল গৃহস্থবধূই …‘মুঠে’ ও ‘সিদ্ধপুলি’ লইয়া ব্যস্ত।’ গ্রাম বাংলায় দীনেন্দ্রকুমারের লেখা অনুযায়ী তখন এই দুটোই প্রধান পিঠে। ‘মুঠে’, ‘সিদ্ধ পুলি’ তৈরির পদ্ধতিও জানিয়েছেন দীনেন্দ্রকুমার। ‘ভিজে চাউলের গুঁড়াগুলি গরম জলে ভিজাইয়া, তাহা গোল করিয়া দলা বাঁধিয়া জলে সিদ্ধ করিলেই ‘মুঠে’ প্রস্তুত হয়।’ আর ‘সিদ্ধপুলি’ ‘চাউল-গুঁড়ার পুলি প্রস্তুত করিয়া তাহার মধ্যে নারিকেলের ছাঁই বা ক্ষীর পুরিয়া’ অবস্থাভেদে জলে বা দুধে সিদ্ধ করে চিনির রসে বা খেজুর গুড়ের রসে ডুবিয়ে তৈরি করা হত।

লীলা মজুমদারের লেখায় বাঙালির অনেক সাবেকি পিঠের সন্ধান মেলে। যার মধ্যে রয়েছে, ‘গোকুল পিঠে’, ‘আস্কে পিঠে’, ‘মালপোয়া’, ‘পাটিসাপ্টা’, ‘মুগসামালি’, ‘নারকেল চিঁড়ে’, ‘ইচা মুড়াই’ ইত্যাদি। ছেলেবেলায় প্রতিবেশী কৃষক পরিবারের ‘আস্কে’ পিঠে নিয়ে হাসাহাসি হত। কিন্তু পরে লীলা মজুমদারের লেখায় জেনেছি, আস্কে হল জাতপিঠে। আস্কে প্রসঙ্গে লীলা মজুমদার লিখেছেন, ‘অনেকেই গরীবের খাওয়া বলে একে তুচ্ছ করেন, কিন্তু আমি বলি এরও তুলনা নেই। ওড়িশায় এর জন্ম। আমার বড়দি সুখলতা রাওয়ের শ্বশুরবাড়ি ছিল সেখানে। তাঁর এক বুড়ি ননদকে করতে দেখেছিলাম…নিজের হাতে করিনি কখনো, কিন্তু করা দেখেছি এবং খেয়ে সুখ পেয়েছি।’

পিঠে হলে তার সঙ্গে পায়েস করারও চল ছিল তখন। শীত মানেই নলেনগুড়। নলেন গুড় দিয়ে গোবিন্দভোগ চালের পায়েসের স্বাদ তো কমবেশি সবারই জানা। লীলা মজুমদার আরও কিছু সহজ এবং চমক দেওয়া পায়েসের কথা বলেছেন। এগুলো হল রসগোল্লার পায়েস, লুচির পায়েস, নিমকির পায়েস, ছানার পায়েস, পেঁয়াজের পায়েস। পেঁয়াজ-পায়েস লীলা মজুমদারকে প্রথম খাইয়েছিলেন এবং তৈরির পদ্ধতি শিখিয়েছিলেন ঠাকুরবাড়ির পূর্ণিমা ঠাকুর।

ঠাকুরবাড়িতে রান্না নিয়ে যেখানে রীতিমতো এক্সপেরিমেন্ট চলত, সেখানে পিঠে-পায়েস নিয়ে চলবে এ আর বিচিত্র কী! জোড়াসাঁকোর বাড়িতে পিঠে পায়েস সারা শীত জুড়ে হলেও পৌষপার্বণ উপলক্ষে সেটা আলাদা জায়গায় পৌঁছে যেত। সরলা দেবী লিখেছেন, ‘পৌষ সংক্রান্তিতে পিঠে গড়া- সেটা একটা বিরাট অনুষ্ঠান।’  জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর লেখা থেকে জানা যায়, পৌষ পার্বণে রাশীকৃত পিঠে গড়তে হত বলে সেদিন বৈচিত্র তত থাকত না। বেশিরভাগ হত রাঙা আলুর পুলি ও সেদ্ধ পিঠে। তবে নানা পিঠে তৈরির ব্যাপারে নানা জনের খ্যাতি ছিল। মৃণালিনী দেবী খুব ভালো চিঁড়ের পুলি করতে পারতেন। সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মা চারুবালা দেবীর তৈরি দুধপুলি ছিল খুব সুস্বাদু।

ঠাকুর বাড়িতে ছেলেরাও এ সব কাজে পিছিয়ে ছিলেন না। তারাও নিত্যনতুন পরীক্ষায় মেতে উঠতেন।  একবার শীতে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর পায়েস রান্না করেছিলেন। কিন্তু সে পায়েস খেতে বসে সবাই চুপ। মহর্ষি সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন, পায়েস কেমন হয়েছে। কেউ আর বলতে পারেন না। শেষে একজন বললেন, ভাল তবে একটু ধোঁয়ার গন্ধ।’ পায়েস একটু ধরে গিয়েছিল, এক্সপেরিমেন্টের ফল। কিন্তু মহর্ষি বললেন, পায়েসে একটু ধোঁয়াটে গন্ধই আমার পছন্দ। ঠাকুরবাড়ির পিঠের তালিকা চিত্রা দেবের লেখায় রয়েছে। নতুন পিঠের মধ্যে সেখানে রয়েছে, আঁদোসা, কচুর পিঠে, লাউয়ের পুলি, খইয়ের পুলি এইসব। রবীন্দ্রনাথ পিঠেপুলি খুব ভালবাসতেন। শান্তিনিকেতনে নেপালচন্দ্র রায়ের স্ত্রী ও পুত্রবধূ নানারকম পিঠেপুলি করে কবিকে পাঠাতেন।

বাঙালির পুরোনো অনেককিছু চলে গেছে। তবু তার মধ্যে পিঠেপুলি কিন্তু রয়েছে। ঈশ্বর গুপ্তের ‘পৌষ পার্বণ’ কবিতায় পল্লীবাংলায় এই পার্বণ ঘিরে যে আনন্দময় ছবি, কালের নিয়মে তা কিছুটা অন্যরকম হলেও, সাদা আলপনায়, পিঠেপুলি সাজিয়ে আজও সেখানে আহ্বান করা হয় পৌষলক্ষ্মীকে। শহরেও কমবেশি সব বাড়িতেই শীতে পিঠেপুলি হয়। সেখানে নতুন গৃহিনীদের এখন আর সে ভাবে মা ঠাকুমাদের কাছে পিঠে তৈরি শেখারও দরকার পড়ে না। মা ঠাকুমাদের জায়গা নিয়েছে ইউটিউব। ইউটিউবে পিঠেপুলি তৈরি নিয়ে অজস্র ভিডিয়ো ছড়ানো আছে। খুলে দেখে নিলেই হল। পিঠেপুলির কদর যথেষ্ট রয়েছে বলে এখন মিষ্টির দোকানেও তা পাওয়া যায়। ‘এসো, পৌষ যেয়ো না/ভাতের হাঁড়িতে থাক পৌষ, যেয়ো না…’ এই পৌষ বন্দনাগীতিতে ‘পিঠেপুলিতে থাক পৌষ, যেয়ো না’ লাইনটা নেই। থাকলে কিন্তু খুব ভুল হত না।

(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here