সারথি বিশ্বাস

কুড়িতে বুড়ি নয়, একুশে কনে! ‘মেয়েরা কুড়িতেই বুড়ি’ শোনা অভ্যস্ত আমাদের কানে ধাক্কা দিচ্ছে আনমনে। কেন্দ্র সরকার মেয়েদের বিয়ের বয়স ন্যূনতম আঠারো থেকে বাড়িয়ে একুশ করার প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাবটা আইনে পরিণত হলে মেয়েদের পায়ের নীচে জমি আর একটু শক্ত হবে। এমন নয় যে, আইন হলেই তার সুফল সব মেয়ে পাবে। আঠারো বছরে বিয়ের আইনও সব মেয়েকে রক্ষা করতে পারেনি। তবে সমাজের সর্বস্তরে কোনও নিয়ম চালু করতে হলে তা আইন দিয়েই করতে হয় প্রথমে। তাতে লড়াইটা জোরদার হয়, কথা বলার একটা পরিসর থাকে।

একুশ বছরে বিয়ে আমাদের সমাজ-প্রেক্ষিতে অনেকের কাছেই প্রথম ধাক্কায় বেশি মনে হতে পারে। বাস্তবে কিন্তু দেখা যায়, শিক্ষিত-সচেতন পরিবারে একুশ কেন, একত্রিশেও মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আর্থ-সামাজিক ভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারের মেয়েরাই অল্প বয়সে বিয়ের শিকার হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, অনেক মেয়ের জীবনেই বিয়ের বয়স যেখানে আঠারোর গণ্ডীই পেরোচ্ছে না, সেখানে একুশ আসে কী ভাবে? বিয়ে মানেই ‘সব পেয়েছির দেশ’, বিয়ে মানেই বাপ-মায়ের সব দায়িত্ব শেষ, এমনটা মোটেও নয়। বিয়ে মানেই মেয়েরা সম্পূর্ণ নিরাপদ তা-ও নয়। তবুও অনেক পরিবারই নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে অল্প বয়সে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেয়। মেয়েদের নিরাপত্তা, শিক্ষা, পুষ্টি, স্বাস্থ্য, স্বাবলম্বন— সব পংক্তির শেষেই প্রশ্নচিহ্ন ঝুলতে থাকে, ফুলস্টপ বসানোর মতো কোনও জায়গা এখনও তৈরি হয়নি। লড়াইটা এখানেই।

আমার চেনা বছর চারেকের একটি মেয়ে আছে। ইদানীং সে বায়না শুরু করেছে, তার হেডমাস্টার বরই দরকার। মন তার খুব চঞ্চল, ভালো ছেলে দেখলেই বলে, ‘আমি একে বিয়ে করব।’ সাজানো বড় বাড়ি দেখলেই বলে, ‘আমি এই বাড়িতে বিয়ে করব।’ ব্যাপারটা বেশ মজার এবং সরল মনে হচ্ছে তো? কিন্তু ব্যপারটা কি এতটাও মজার আর সরল? দেখুন তো, এর মধ্যে আমাদের সমাজ-মনের কাচা দগদগে ছাপ আছে কিনা! বিয়ে সম্পর্কে একটা আবেগ, শুধুই সুখের আবেশ কি ওই ছোট্ট মেয়েটার মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়নি? বিয়েই তোমার মেয়ে-জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য এবং উপায়, এটা কি তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি এই ছোট্ট বয়সেই? এ ভাবে বড় হতে হতে আর একটু বড় হলেই অনেক মেয়ে পড়াশোনা শিকেয় তুলে, সাজগোজ করে, আড্ডা-ইয়ার্কি মেরে সময় কাটিয়ে আঠারো পার হলেই, অথবা অনেক সময় আঠারোর আগেই টুক করে বিয়ে করে ফেলে সুখী গৃহকোণটি সাজিয়ে সুখী হতে চায়। তারপরে যে সুখী হল হল, আর যার ভাগ্যে সুখের শিকে ছিঁড়ল না, তার আর ফেরার পথ থাকল না।

বোঝানোটা অন্য রকম হলে হয়তো সে মাস্টারের বউ হতে না চেয়ে নিজেই মাস্টার হতে চাইত। পুলিশকে বিয়ে করব না বলে, পুলিশ হতে চাইত। ওই সুন্দর বাড়িটা শ্বশুরবাড়ি হিসেবে না চেয়ে, অমন একটা সুন্দর নিজের বাড়ির স্বপ্ন দেখতে শিখত। এই শিক্ষাটা খুব দরকার। একুশ বছর পর্যন্ত নিজেকে গড়ার সময় পেলে, প্রয়োজন হলে ফেরার রাস্তাটা হয়তো তার অনেক সহজ হবে। অসহায় অবস্থায় গৃহবধূ হত্যা বা আত্মহত্যার ঘটনা কিছুটা কমবে।

বিয়ে বাড়ির জাঁকজমক, বিলাসিতা, বউকে নিয়ে মাতামাতি দেখে অনেক মেয়ের মনেই বিয়ের মানে দাঁড়ায় বসার সিংহাসন, ফুল, উপহার, সাজগোজ, চারিদিকে আলো আর বাজনা! বিয়ে মানে কিন্তু শুধু বিয়ের এই দিনটি নয়, বরং বিয়ের আসল মানে শুরু হয় তার পরের দিন থেকে। মেয়েকে বিয়ের স্বপ্ন দেখানোর সময় গায়ে চিমটি কেটে পরের বাস্তবটাও দেখাবেন প্লিজ়! দেখবেন, বিয়ের জন্য মেয়ে কমপক্ষে একুশ বছর সময় চাইছে, যাতে পরবর্তীতে জোর ধাক্কা এলে ভেঙে না পড়ে নিজেকে সামলাতে পারে নিজেই, শক্ত মাটিতে দাঁড়াতে পারে নিজের পায়েই, সম্মানের সাথে। সচারাচর দেখা যায়, বয়সে, শিক্ষায় এবং অভিজ্ঞতায় অপরিণত মেয়েরাই শ্বশুরবাড়িতে বেশি অত্যাচার ও অবহেলার শিকার হয়। দেহ-মনে পরিণত একটা মেয়ে এ লড়াইয়ে অনেকখানি এগিয়ে যাবে। একুশ বছর তাকে সেই পরিণতির ভিত দেবে। বিয়ে কী, এবং কেন, বিয়ে সম্পর্কে এই স্বচ্ছ ধারণা নিয়েই যেন একটা মেয়ে কনে সাজে। এই স্বচ্ছ ধারণার জন্য আঠারো বছর যথেষ্ট নয়, একুশ বছর কেন, তার জন্য আরও কয়েকটা বছরও দরকার হতে পারে।

হ্যাঁ, তার আগে এই একুশটা বছর গায়ে হাওয়া লাগিয়ে, অনলাইনে সময় কাটিয়ে, অথবা বসে বসে শুধু মাটি আঁচড়ালে চলবে না। পায়ে নেলপালিশ লাগালেই তো আর নিজের পায়ে দাঁড়ানো যাবে না। তার জন্য পড়াশোনা করতে হবে, নিজের যোগ্যতা ও সামর্থ্য অনুসারে কাজের প্রশিক্ষণ নিতে হবে। বিয়ের বয়স একুশ করে বসে থাকলেই হবে না, সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে মেয়েদের কারিগরি শিক্ষায়। প্রত্যেকটা মেয়েই যাতে কিছু রোজগার করতে পারে এই নিশ্চয়তা সরকারকে দিতে হবে।

জীবনকে সুন্দর করে গড়তে একটা সুন্দর পরিকল্পনার দরকার হয়। সুন্দর জীবনের এই স্বপ্নটা দেখার জন্য, পরিকল্পনাটা গড়ার জন্য মেয়েদের আরও একটু সময় প্রয়োজন। একুশ বছর সেটা দিতে পারে। এই সময়ের মধ্যে মেয়েরা নিজেকে তৈরি করার আর একটু সময় পাবে, গুছিয়ে নিতে পারবে, সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে আর এক পা এগোবে। একুশ বলে কথা! একুশ বছর মানে না বাধা।

(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)