অনল আবেদিন

মুর্শিদাবাদ জেলার সাংস্কৃতিক মুকুটে একটি কোহিনুরের অভাব ছিল বরাবর। বহরমপুরের বিশিষ্ট চিকিৎসক নির্মল সাহা ও তাঁর দাদা কল্যাণ সাহার যৌথ সহায়তায় পাওয়া গিয়েছে হলঘর। ওই হলঘর ঘিরে ‘প্যাপিলিও পেন্টার্স’- এর এক ঝাঁক স্বপ্নদ্রষ্টার সৃষ্টিশীল উন্মাদনায় মুর্শিদাবাদের সাংস্কৃতিক মুকুটের শূন্যস্থান ভরাট হয়েছে ২০২০ সালের ২৪ ডিসেম্বর। সরকারি অনুকম্পাকে তুড়ি মেরে গত ২৪ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক খ্যাতিসমৃদ্ধ দুই শিল্পী— প্রদীপ মিত্র ও অখিল দাস ‘প্যাপিলিও পেন্টার্স আর্ট গ্যালারি’র উদ্বোধন করে দেখিয়ে দিলেন, বহরমপুরও পারে! সেদিন উদ্বোধনী বক্তব্যে জনপ্রিয় চিকিৎসক নির্মল সাহা তাঁর জীবনবোধ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘‘ভাল থাকা আসল কথা নয়। সুখে থাকাও নয়। আনন্দের সঙ্গে বেঁচে থাকাই জীবন। এটাই দরকার!’’

সত্যিই তো! হাজারো অসাম্য, অপ্রাপ্তি ও অশান্তির মাঝে আনন্দে থাকাটাই জীবন। দ্বারোদঘাটনের দিন থেকে মাত্র ২৯ দিনের মধ্যে বহরমপুরের মতো মফস্বল শহরের আর্ট গ্যালারি তিন তিনটে প্রদর্শনীর আয়োজন করার রেকর্ড অর্জন করেছে। এখানেই থেমে নেই। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত মাসখানেকের মধ্যে ৮টি পর্বে, বা ৮টি দফায় ৫৮ জন শিল্পীর চিত্র, ভাস্কর্য ও আলোকচিত্র মিলিয়ে ২৩২টি শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হবে সদ্যজাত এই গ্যালারিতে। প্যাপিলিও-র বাৎসরিক প্রদর্শনী সেটি। সেই প্রর্দশনীর প্রতিটি পর্বের সময় সীমা ৪ দিন। এগুলোও হিসাবের মধ্যে ধরলে গ্যালারির জন্মের পরে মোট ৮২ দিনে মোট ১১টি প্রদর্শনী। করোনাকালে মফস্বল শহরের বুকে এটা ভাবা যায়! এ জেলা ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদার, মণিমোহন চৌধুরি, ইন্দ্র দুগার ও বাসুদেব রায়দের মতো আরও অনেক বিশ্বখ্যাত শিল্পীদের ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ বলেই এটা সম্ভব হয়েছে।

ইতিমধ্যে হয়ে যাওয়া প্রদর্শনী তিনটির কথা বলার আগে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে দু’-একটি কথা বলা যাক। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আর্ট গ্যালারি প্রতিষ্ঠার ইতিহাস বলতে গিয়ে কমিটির সম্পাদক সুজিত মণ্ডল বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। দু’চোখ বেয়ে অশ্রু নেমে আসে। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক শিল্পী সুগত সেন যথার্থই বলেন, “সুজিতের একা নয়, এ আনন্দাশ্রুতে আমাদের সবার চোখের কোণ চিকচিক করছে।” কয়েক বছর আগে বহরমপুর শহরের গঙ্গাপাড়ে বসে সুজিত মণ্ডল ও কার্তিক পালেরা কলকাতা গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজের ৮ জন প্রাক্তনী সম্মিলিত ভাবে বহরমপুরে শহরে একটি আর্ট গ্যালারি গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্ন সফল করতে আরও ৪০ জন শিল্পী হাত লাগিয়েছেন। আনন্দাশ্রু ঝরে পড়ার এটাই তো আদিকথা।

২০২০ সালের ২৪ ডিসেম্বরের উদ্বোধনের দিন থেকে ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ৯ দিন ধরে চলে জেলার প্রথম আর্ট গ্যালারির প্রথম চিত্রপ্রদর্শনী। চিত্র ও ভাস্কর্য মিলে মোট ৪৮ জন শিল্পীর ৪৮টি শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানস্থলে বসে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দুই চিত্রকর ও ভাস্কর— প্রদীপ মিত্র ও অখিল দাসের সৃষ্ট দু’টি শিল্পও প্রদর্শিত হয়। ওই প্রদর্শনী থেকে বিক্রি হয় তিনটি চিত্রকর্ম। সেই ছবি তিনটি বহরমপুরের তিন চিত্রশিল্পী— পীযূষকান্তি বিশ্বাস, অসিত সাহা ও মিঠু মণ্ডল পাখিরার আঁকা। তিন জনের মধ্যে মিঠু মণ্ডল পাখিরা হাঁড়ি-হেঁশেল ঠেলা মহিলা চিত্রশিল্পী।

দ্বিতীয় প্রদর্শনীটি ছিল একক। শিল্পী সাম্য রাহার তৈরি বৃহৎ আকারের ৬টি ভাস্কর্য ও বেশ কিছু ছবি নিয়ে প্রদর্শনীটি চলে ১৫ জানুয়ারি থকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ৪ দিন। শিল্পীর মা মীরা রাহা তাঁর ছেলের প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন। প্রদর্শনীটির পোশাকি নাম ‘রিফর্ম রিয়ালিটি’। প্রতি বছর কেরলে ‘কোচি বিনালে উৎসব’ নামে একটি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী হয়। সেখানের নানা ভাগের মধ্যে চিত্র ভাস্কর্যও একটি বিভাগ। সৌম্য রাহা বলেন, “সেই উৎসবে যোগ দেওয়ার জন্য পরীক্ষামূলক একটি প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করে উত্তীর্ণ হতে হয়। বহরমপুর প্যাপিলিও পেইন্টার্স আর্ট গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত আমার শিল্পকর্মের প্রদর্শনীটি আসলে কোচি বিনালে উৎসবে যোগ দেওয়ার যোগ্যতা অর্জনের প্রদর্শনী। করোনার কারণে বিনালে কর্তাদের অনলাইনে প্রদর্শনীটি দেখিয়ে আমি উত্তীর্ণ হয়েছি।”

তৃতীয় প্রদর্শনীটি নিজ নামে খ্যাত শিল্পী কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্তের। ‘সাম্প্রতিক’ নামের এই প্রদর্শনীটি তাঁর জীবনের ষষ্ঠ একক হলেও প্যাপিলিও পেন্টার্স আর্ট গ্যালারির নিরিখে এটি তাঁর প্রথম প্রদর্শনী। নেতাজির জন্মদিন ২৩ জানুয়ারি থেকে প্রজাতন্ত্র দিবস ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ৪ দিন চলে। মোট ৩৫টি ছবি ও ৩৫টি কবিতার প্রদর্শনী। ছবির প্রদর্শনী, নাকি কবিতার প্রদর্শনী? এমন প্রশ্ন কেউ তুললে তাঁকে কুর্নিশ করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। অথবা কেউ যদি বলেন, এটা চিত্রকাব্যের যুগলযাপন? প্রশ্ন উত্থাপকের সামনে টুপিটা খোলা ছাড়া তখন অন্য পথ নেই। এই কবিতাগুলো চিত্রময় ও জীবনযন্ত্রণাময়ও বটে। ছবিগুলো সুকান্ত, নজরুল, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও শ্রীজাতের কাব্যমনের চিত্রায়িত ফসল যেন। আবার ছবি ও কবিতা মিলে প্রতুল মুখোপাধ্যায়, সুমন চট্টোপাধ্যায় ও নচিকেতাদের জীবনমুখী গান হয়ে উঠেছে। হিরণ্যসুন্দর ৩৫ জোড়া সৃষ্টির মধ্যে মাত্র দু’টির উদ্ধৃতি দেওয়া যাক। কৃষ্ণজিতের এই প্রদর্শনীর কোনও রং, কোনও অক্ষর ‘শৌখিন মজদুরি’ নয়, বোঝা যাবে সেই উদ্ধৃতি থেকে।

ছবিটির নাম ‘অলৌকিক কাক’। প্রশ্নহীন, কথাহীন, বোধহীন, অনুভবহীন, অন্তহীন, অসীম শূন্যতায় একাকি এক কাক মৃতপ্রায় তরবারির ডগায়। আঁকিয়ে কৃষ্ণজিতের সেই সুন্দর সৃষ্টির পাশে চিরকুটে গাঁথা আছে কবি কৃষ্ণজিতের কবিতা, “যুদ্ধ শেষ। / স্তব্ধ চরাচর।/ না মৃতের জন্য শোক,/ না বিজয়ের আনন্দ।/ শুধু এক পঙ্গু তরবারির ডগায়/ বসে থাকে অলৌকিক কাক!” এ কাক তবু অলৌকিক নয়। রক্তরাঙা আর একটি ছবি— আকাশে এক ফালি বাঁকাচাঁদ। আকাশের নীচে ভারতের পার্লামেন্ট ভবন। ভবনের সামনে রাজপথে বর্বর রাষ্ট্রের হিংস্র পেরেক পোঁতা হয়েছে। তিনটি কালা কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে লাখ লাখ কৃষকের লাঙল সমবেত সেখানে। চিত্রকর কৃষ্ণজিতের এই ‘অভিযান’ শীর্ষক ছবির পাশে সাদা পাতায় কবি কৃষ্ণজিৎ লিখেছেন, “উদ্ধত এক হাড়ের প্রাসাদে/ কৃষিকাজ শেখাতে/ মধ্যরাতে/ লাঙলেরা হেঁটে যায় রাষ্ট্রের বিপরীতে।/ গনগনে আকাশের নীচে আজ/ প্রবল কুরুক্ষেত্র।”

করোনাকালের দশ মাসে কৃষ্ণজিৎ শতাধিক ছবি এঁকেছেন। সেই ছবিগুলো ‘খাওয়া, না খাওয়ার বেলা’ ও ‘নিরন্ন, কর্মহীন’ নামের দু’টি গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। করোনাকালে ওই দু’টি গ্রন্থ থেকে অনলাইনে শিল্পী দেশ-বিদেশ থেকে বেশ কিছু অর্থ পেয়েছেন। শিল্পী সেই অর্থের পাইপয়সা করোনায় কাজ হারানো বিপন্নদের উনুন জ্বালানোর মহৎ কাজে লাগিয়েছেন। এই প্রদর্শনীর ৩৫টি ছবির অধিকাংশই করোনাকালে আঁকা শতাধিক ছবি থেকে নির্বাচিত। প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেছেন চিত্রপ্রেমিক, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নাসির আহমেদ। প্রদর্শনীর চার দিন ছিল আলাপচারিতার আদলে শিল্প সংস্কৃতি সংক্রান্ত চারটি বিষয়ের উপর চারটি সেমিনার। সেই সেমিনারে কৃষ্ণজিতের সঙ্গে যুগলবন্দির আদলে সঙ্গত দিয়েছেন ইতিহাস গবেষক প্রকাশ দাস বিশ্বাস, সঙ্গীত ও চিত্র সমালোচক তুহিনশুভ্র, চিত্রকর মিজানুর খান ও নাট্যকার অভিজিৎ সরকার। সেই আলোচনার সঙ্গে কেউ ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন, কিন্তু অস্বীকার করতে পারবেন না। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বই প্রকাশ করেন শিল্প সমালোচক অরূপ চন্দ্র।

পরিশেষে বলি, সার্বিক বিচারে কৃষ্ণজিতের এই ষষ্ঠ একক, অথবা প্যাপিলিও আর্ট গ্যালারির প্রেক্ষিতে কৃষ্ণজিতের প্রথম একক প্রদর্শনী এতটাই মনোগ্রাহী যে এ নিয়ে আলোচনার জন্য ভিন্ন সময়, ভিন্ন পরিসর ও ভিন্ন মেজাজ জরুরি। চিত্রচর্চা বাঙালির ঘরে ঘরে বিস্তৃত করার আয়োজনে কৃষ্ণজিৎ দেড় দশক ধরে মগ্ন। কখনও মৃণাল নন্দীর বাড়িতে, কখন আইসিআই অডিটোরিয়ামে, কখনও নিজের বাড়িতে, কখনও প্যাপিলিও আর্ট গ্যালারিতে, কখনও আবার বহরমপুরের বাইরে অন্যত্র এই ভাবনা জারিত করার তাঁর আন্তরিক প্রয়াস সদা সক্রিয়। তাঁর এই মিশন সফল করার জন্য চিত্রচর্চার অন্য দিগন্ত ‘উদ্ভাস’ গড়ে বছরের পর বছর জুড়ে কাঙ্খিত লক্ষ্যে যাওয়ার জন্য উতরোল কৃষ্ণজিৎরা। ২৪ ডিসেম্বরের উদ্বোধনী ভাষণে নির্মল সাহারও প্রশ্ন, “গানের ক্যাসেট ও কাব্যগ্রন্থ-উপন্যাস কেনার মতো করে মানুষ কেন ছবি কিনবে না? চিত্রের বাজার কেন গড়ে উঠবে না?”

বহরমপুরে আর্ট গ্যালারি করার জন্য দেড় দশক ধরে সরকারি কর্তাদের স্মারকলিপি দেওয়া, অবস্থান করা, লিফলেট ছড়ানো- সহ নানা উপায়ে আন্দোলনে করেছেন কৃষ্ণজিৎরা। কৃষ্ণজিতের নেশা ও পেশা চিত্রচর্চা। তাঁর প্রাণের আবেগ ও জীবিকার আবাদ চিত্রচর্চা। তাঁর শয়ন-স্বপনও চিত্রময়। নির্মল সাহা, তথা বহমপুরের আদরের ‘নিমু’ ও ‘নিমুদা’দের পারিবারিক দানের ফলে কৃষ্ণজিৎ-সহ মুর্শিদাবাদ জেলার সাংস্কৃতিক জগতের সবার যুগান্তের স্বপ্ন এখন সাকার ও ‘আনন্দযাপন’ এখন সত্যিই বাস্তব।

(ছবি ঋণ: কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত)