অনল আবেদিন

‘আটা গুণে রুটি আর মা গুণে বিটি।’ পদ্মার মতো বহতা চরিত্র নিয়ে গাঁ-গঞ্জে এই কথাটি সহস্রাব্দ ধরে চালু আছে। সেই নিরিখে আমাদের আজকের আলোচ্য পদ্মাপারের একটি ছোট্ট জনপদের প্রতিভাসমুদ্র নিয়ে। আরও সংক্ষেপে বললে, সেই নদীপারের বর্তমানের এক প্রতিভা নিয়ে কথা কইব। গল্পকার ও ঔপন্যাসিক নীহারুল ইসলাম এবং তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা ‘খোঁজ’- এর বার্ষিক অনুষ্ঠান নিয়ে বলব। টানা কুড়ি বছরের সেই ইতিহাস সময়ের মাপের থেকেও অনেক বেশি দীর্ঘ। এই কালপর্বে নবারুণ ভট্টাচার্য, তিলোত্তমা মজুমদার, স্বপ্নময় চক্রবর্তী, সন্দীপ দত্ত, জয়া মিত্র, রবিশংকর বল, শাহজাদ ফিরদাউস ও হামিদ কায়সারদের মতো দুই বাংলার অন্তত ১৫ জন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে সম্মাননা জানিয়েছে ‘খোঁজ’। সারস্বত জগতের আরও অন্তত ১৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ‘রফিকুল ইসলাম স্মারক বক্তৃতা’ দিয়েছেন। কোন জীবনীশক্তিতে ‘খোঁজ’ পত্রিকা এই সুবিশাল দেশের একটি প্রত্যন্ত এলাকা থেকে এতজন বিশিষ্টকে আনুষ্ঠানিক ভাবে সম্মানিত করেছে ও ভবিষ্যতেও অনেককে করবে বলে অঙ্গীকারবদ্ধ। প্রতি বছর ২৩ জানুয়ারির মতো ২০২১ সালের ২৩ জানুয়ারির অনুষ্ঠানে ‘রফিকুল ইসলাম স্মৃতি খোঁজ পুরস্কার’-এ সম্মানিত করা হয় কথা-সাহিত্যিক ও সংস্কৃতি-গবেষক মুর্শিদ এ এম এবং অহনা বিশ্বাসকে।

এই রফিকুল ইসলাম আসলে কে? কী তাঁর পরিচয়? বাংলা শিল্প-সাহিত্যের উঠোনে তাঁর অবদানই বা কী? প্রয়াত রফিকুল পেশাগত ভাবে ছিলেন হাইস্কুলের শিক্ষক। তিনি নীহারুলের আব্বা। তিনি পিছিয়ে থাকা মুসলিম সম্প্রদায়ের ১০-১২ জন সদস্যের একটি পরিবারের অভিভাবক ছিলেন। এই পরিচয় এখানে যথেষ্ট নয়। তিনি ভারত নামের বিশালাকার এক রাষ্ট্রের সীমান্তবর্তী এলাকার পদ্মাপারের অধিবাসী ছিলেন। এও বাহ্য। লালগোলায় তাঁর বাড়ি থেকে এক দৌড়ে বাংলাদেশ যাওয়া যায়। রফিকুল ইসলামের বাড়ি থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে, পদ্মাপারের শেষ রেল স্টেশন লালগোলার অনতিদূরে দাঁড়িয়ে পূর্ব পাকিস্তানের দিকে আঙুল তুলে ঋত্বিক ঘটকের ‘কোমল গান্ধার’- এর  নায়িকাকে উদ্বাস্তু নায়ক বলেছেন, “ওই আমাগো দ্যাশ…!” এই আর্তিমাখা মাটির কান্নাও রফিকুল ইসলামের পুরো পরিচয় নয়। তাঁর প্রকৃত পরিচয় জানতে বিদ্যাসাগরের সঙ্গে মহাকবি মাইকেলের আন্তঃসম্পর্কের সূত্র ধরতে হবে। মেঘনাদবধ কাব্যের সুবাদে ধারদেনা করে হলেও বিদ্যাসাগর কালাপানির ওপারে মাইকেল মধুসূদন দত্তকে টাকা পাঠাতেন। মধুকবির ধার করে মদ খাওয়ার টাকা পরিশোধ করতে সেই টাকা যেত।

এ কাহিনি অনেক বাঙালিই জানেন। নীহারুলের সুরাপানের কাহিনি অবশ্য জানেন না অনেকে। সুরা ও শিল্প নিয়ে রফিকুল ও নীহারুলের অভাবিত আন্তঃসম্পর্কের কথা জানেন না প্রায় সবাই। এই অজানা কথাই শিল্পপ্রাণ ও স্নেহপ্রবণ পিতা রফিকুল ইসলামের প্রকৃত পরিচয়। ছেলে গল্পকার হবেন, কথা সাহিত্যিক হবেন, এই স্বপ্ন পিতা-পুত্র দু’জনেই দেখতেন। অধিকন্তু, বেকার নীহারুল আবার সুরাসক্ত। বাবা প্রমাদ গুণলেন। মধুসূদন দত্তের গোঁড়া হিন্দু, ব্যারিস্টার পিতার পথে না হেঁটে মুসলমান পণ্ডিত পরিবারের শিক্ষক পিতা রফিকুল ইসলাম ছেলের সংসারের যাবতীয় আর্থিক দায় নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার পাশাপাশি সুরাপানের আর্থিক ভারও বহন করেছেন। পিতা সুরা স্পর্শ না করলেও নীহারুলের মদের খরচ মাসের শেষে তাঁর বাবা আমৃত্যু মিটিয়েছেন। এটা স্রেফ ভাবা যায় না। কল্পনা করা যায় না! সেই অভাবিত আবাদেরই ফসল নীহারুলের প্রায় ৪০০ ছোটগল্প, ৪টি নভেলা এবং ৪টি নভেল (উপন্যাস) ও একটি কাব্যগ্রন্থ। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি- সহ বিভিন্ন সারস্বত প্রতিষ্ঠান রফিকুল ইসলামের সাহিত্যিক পুত্রকে পুরস্কৃত করেছে। ‘রফিকুল ইসলাম স্মৃতি খোঁজ পুরস্কার’- এর যথার্থ বুঝি এ বার বোঝা যায়। তবে জনান্তিকে বলে রাখি, মাইকেল ও তাঁর পিতার সঙ্গে নীহারুল ও রফিকুলকে তুলনা করিনি। তুলনা চলেও না। তবু বিষয়টি খোলসা করার জন্য শুধু আন্তঃসম্পর্কের প্রসঙ্গ টেনেছি।

বহরমপুরের অধুনালুপ্ত ‘রৌরব’ পত্রিকা থেকে রফিকুলের শিল্পীসন্তানের উত্থানের শুরু। তারপরে  দুই বাংলার অজস্র পত্রিকায় তাঁর বিচরণ। তাঁর আয়োজিত বাৎসরিক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের উপ-জেলা গোদাগাড়ি লাগোয়া পদ্মাপারের প্রত্যন্ত এলাকা লালগোলায় এসেছেন সাহিত্যিক সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়, সিনেমা পরিচালক এ পার বাংলার সৌমিত্র দস্তিদার ও বাংলাদেশের তানভির মোকাম্মেল-সহ অনেকে। প্রাবন্ধিক মিলন দত্ত, অধ্যক্ষ ও অধ্যাপক অজয় অধিকারী, সোমনাথ চক্রবর্তী, শামিম আহমেদ, নুরুল মুর্তজা, গল্পকার অরুণ সিরাজ এবং বিশিষ্ট বেহালাবাদক শিল্পী সোমনাথ-সহ অনেক বিশিষ্টজন ২০ বছর ধরে ওই সারস্বত অঙ্গন আলোকিত করেছেন। পেশায় নীহারুল এমএসকে-র শিক্ষক। তাঁর স্ত্রী শাহানাজ বেগম নেশায় নাট্যকর্মী ও পেশায় অঙ্গনওয়াড়ির ‘দিদিমণি’। ‘নুন আনতে পান্তা ফুরানোর সংসার’-এর এই কর্তা দেশের সীমান্ত শহরে কী ভাবে টানা দু’দশক ধরে এমন সাহিত্যবাসরের আয়োজন সম্ভব করে তুলেছেন?

এখন থেকে প্রায় শতবর্ষ আগের কথা। অর্থকষ্ট ও জলকষ্টে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাধের বিশ্বভারতী উঠে যেতে বসেছিল। লালগোলার মহরাজা যোগীন্দ্রনারায়ণ রায়ের অর্থানুকুল্যে বিশ্বভারতী রক্ষা পায়। তাঁর দেওয়া পুস্তক, প্রত্নসামগ্রী ও অর্থে সমৃদ্ধ কলকাতার ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ’। বহরমপুরের একদা সংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র ‘গ্রান্ট হল’ও তাঁরই দান। লালগোলার রাজবাড়ির আতিথ্য গ্রহণকালে কলকলি নদীপাড়ে বসে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর সৃষ্টিকর্মের ভাবনায় মশগুল থাকতেন। লালগোলার রাজবাড়ির শৃঙ্খলিত কালীমন্দিরে বসে তাঁর যোগগুরু বরদাচরণ মজুমদারের সামনে শ্যামা-সঙ্গীত গাইতেন কাজি নজরুল ইসলাম। ‘সে আমার রক্তে ধোয়া দিন…!’, ‘কারা মোর ঘর ভেঙেছে স্মরণ আছে…!’ এবং ‘জাড়ে কাঁপছে আমার গা…।’, ‘ওরা আমাদের গান গাইতে দেয় না… ‘- এর মতো অজস্র গণসঙ্গীতে গত শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে শুরু করে আজও বাংলার গণ-আন্দোলন উজ্জীবিত হয়। এই সব অমূল্য সম্পদের স্রষ্টা লালগোলার দুই ভূমিপুত্র— প্রয়াত অলোক সান্যাল ও অজিত পাণ্ডে। সেই উত্তরাধিকার বহণ করছেন নীহারুল ইসলাম। এই মহতি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সিক্ত মাটির গুণেই টানা কুড়ি বছর ধরে পদ্মাপারে সাহিত্যবাসর ও -‘রফিকুল ইসলাম স্মৃতি খোঁজ পুরস্কার’ প্রদান অনুষ্ঠান সম্ভব হয়ে উঠেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here