সারথি বিশ্বাস

মৃত্যু শিবিরেও প্রেম হয়, মূর্তিমান মৃত্যুর সঙ্গে জীবনের প্রেম; স্বর্গে নয়, নরকে নয়, সে প্রেমের সাক্ষী এখনও বহন করে চলেছে আমাদের এই মাটির পৃথিবী!

হিটলারের নাৎসি বাহিনীর অধীনস্থ যে এস এস গার্ডের দল প্রতিদিন ইহুদি নিধনের ভয়াবহ বীভৎস খেলার উল্লাসে উন্মত্ত, সেই এস এস গার্ডের এক অফিসার প্রেমে পড়ল শিবিরে মৃত্যুর জন্য প্রতীক্ষারত এক ইহুদি মেয়ের। এস এস গার্ডের  ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ লেখা চিরকুট যতই অবিশ্বাস বয়ে আনুক, ইহুদি মেয়ের বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠেছিল। হয়তো সেটা বাঁচার তাগিদেই। প্রেম কিসে হয়, কেউ কি জানে! ‘প্রেম জানান দিয়ে, বলে-কয়ে আসে না। প্রেম যদি আসে, তা সর্বনাশা ঢেউ হয়ে আসে, সর্বস্ব না ভিজিয়ে কোনও পরিত্রাণ নেই তার’।

হেলেনা সিট্রোনোভা। গ্যাস চেম্বারে যাওয়ার দিনই তার প্রেমে পড়ে ফ্রানৎজ ভুঙ্ক। কায়দা করে হেলেনার মৃত্যু আটকে দেয় সে। তারপর বহুবার মৃত্যুর খাঁড়া নেমে এসেছিল হেলেনার উপর। প্রতিবার বিরাট ঝুঁকি নিয়ে নিজেকে বিপন্ন করে প্রেমিকাকে বাঁচিয়েছিল ফ্রানৎজ। হিটলারের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে ইহুদি মেয়ের সঙ্গে নাৎসি বাহিনীর সৈন‌্যদের কোনওরকম সম্পর্ক শুধু নিষিদ্ধই ছিল না, ছিল নিশ্চিত এবং চরম শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবুও ইহুদি হেলেনার প্রেমে গোপনে ভেসে গেল ফ্রানৎজ। আউসভিৎজ সাক্ষী, প্রেম গোপন হলেই তাতে কালি থাকে না, গোপন প্রেমেও থাকতে পারে রামধনুর সাত রং; নিষিদ্ধ প্রেম মানেই পাপ নয়, বরং তা হতে পারে পবিত্র পদাবলী। আউসভিৎজে যত পাপ হয়েছে, তার মধ্যে এই প্রেমটুকুই একমাত্র পবিত্র। এই প্রেমের খাতিরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হেলেনার বোনকেও কৌশলে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিল ফ্রানৎজ। এবং শেষ পর্যন্ত এই প্রেমই বাঁচিয়েছিল তাদেরকে। হ্যাঁ, দুজনকেই।

ফ্রানৎজের প্রেম হেলেনাকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প থেকে জীবিত ফিরিয়ে এনেছিল। হেলেনার প্রেম ফ্রানৎজকে প্রাণ দান করেছিল। যুদ্ধশেষে সোভিয়েত সেনাবাহিনী যখন আউসভিৎজ দখল করছে, ফ্রানৎজ নিজের মায়ের ঠিকানা তুলে দিয়েছিল হেলেনার হাতে। যাতে সে নিরাপদে থাকতে পারে। ১৯৭২ সালে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতা বিরোধী কার্যকলাপের জন্য বিচার শুরু হলে হেলেনা সুদূর ইজরায়েল থেকে ছুটে আসে ফ্রানৎজের পাশে দাঁড়াতে। দু’জনের দেখা প্রায় ২৭ বছর পরে। হেলেনা সাক্ষ্য দেয় কী ভাবে ফ্রানৎজ তার প্রাণ বাঁচিয়েছিল বহুবার। মুক্তি পায় ফ্রানৎজ।

যে পরিমান ঘৃণা নিয়ে ফ্রানৎজ ইহুদিদের মাথা ন্যাড়া করে, তাদের উলঙ্গ করে, মৃত্যুর আগে তাদের কণ্ঠে গান শুনে, ফুল বিছানো দীর্ঘ রাস্তা হাঁটিয়ে, মাথায় পুষ্পবৃষ্টি করতে করতে গ্যাস চেম্বারে পাঠাতে, তার সবখানি প্রেম হয়ে ঝরে পড়েছে হেলেনার উপর। প্রেম একটি সমন্বিত শব্দ। প্রেম যদি প্রেম হয়, তাতে ধূপ-ধুনোর গন্ধ থাকে, পুজো পুজো ভাব থাকে। এখানে ভালোলাগা, ভালোবাসা, অনুরাগ, আকাঙ্খা, আবেগ একত্রিত হয়ে নতুন জীবন দান করে, এমন হাজারও মরণ থেকে মানুষকে মুক্তি দেয়।

যদি এমন হত, আউসভিৎজের ওই নিষ্ঠুরতা, নৃশংসতা আর নজিরবিহীন বর্বরতার দিনগুলোতে নাৎসি বাহিনীর সবার মনে ইহুদিদের জন্য প্রেমের উন্মেষ যদি হত! এমন হলে, অন্তত ৬০ লাখ ইহুদি নারকীয় হত্যাকাণ্ড থেকে মুক্তি পেত! ‘সমুদ্রমন্থন করলে যদিও বা অমৃত মেলে, প্রেম মেলে না’। তাই এখনও মাঝে মাঝে আউসভিৎজ মাথাচাড়া দেয়। মানুষের মনের সবখানি ঘৃণা-বিদ্বেষ পৃথিবীর সমস্ত আউসভিৎজের মাটিতে প্রেম হয়ে শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে।

(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here