শুভদীপ ভট্টাচার্য

পড়ন্ত এক রোদফুরনো বিকেলে ছাদের তারে মেলে দেওয়া একটা হলদে শাড়ি তখনও আলতো দুলছে। ছাদে জমে আছে বহু বছরের পুরনো ধুলো, শুকনো শ্যাওলা। বৃষ্টি নামলে এ ছাদেও সোঁদা গন্ধ ভাসে। পাশে দাঁড়িয়ে বিনুনি ঠিক করে নিচ্ছিল এক অষ্টাদশী। ঘরোয়া মেয়ের পরিপাটি সাজের রহস্য জানে না কেউ। কেউ কোনওদিন জানবেও না। রোদপালানো বিকেলে নীচের গলি থেকে আচমকা ভেসে আসে একটা সাইকেলের বেল…। টিং…টিং। মেয়েটি একছুটে এসে দাঁড়ায় পাঁচিলের গা ঘেঁষে। নীচে একবার নজর গেলেই এক পলকে একটু দেখা…। কোনও কথা নেই মুখে, শুধু চুপচাপ চেয়ে দেখা। তারপরেই গোপন ব্যথা মিলিয়ে যেতে পারত। কিন্তু গেল না। গলি জুড়ে আর দেখতে পাওয়া গেল না স্কুলব্যাগ কাঁধে ছেলেটিকে।

তিন বার হর্ন দিয়ে গলির পাশ দিয়ে ছুটে গেল একটি স্কুলবাস। বাস গিয়ে থামে একটি চারতলা স্কুলবাড়ির সামনে। ছুটির ঘণ্টা যেন ঘরে ফেরার গান। অপেক্ষায় থাকা ছেলেমেয়ে এসে বসে যে যার মতো। সেই ছেলেবেলার মতো জায়গা দখল। গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে আসা মেয়েটি দাঁড়ায় দরজার ধারে। কাচতোলা বদ্ধ বাস। কিন্তু তার মন তখনও স্কুলের খোলা ছাদে। কেউ জানে না সরস্বতী পুজোর দারুণ ধুমের আয়োজনের অংশীদার হতে চাওয়ার অজুহাতে একটি ক্লাস না করেও মেয়েটি আজ অজান্তেই কেমন করে হয়ে উঠছে সাবালিকা। ঠিক যেন…।

বাসের পাশ কাটিয়ে ছুটে চলেছে ছেলের দল। হঠাৎ বৃষ্টি। অসময়ে বৃষ্টি মানেই বুঝি মৌষলকাল? “বুকের মধ্যে বৃষ্টি নামে, নৌকা টলমল।’’ বৃষ্টি থেকে গা বাঁচাতে যে যার মতো খুঁজে নিচ্ছে আশ্রয়। কেউ আবার ছাতা মাথায় গায়ে মাখছে আলতো বৃষ্টিকুচি। কেউ বা আজানুকেশ ভিজিয়ে নিচ্ছে আকাশছেঁচা জলে। ছাতা হাতে কাঁপা পায়ে আশ্রয় ভাগ করে নিতে এগিয়ে যায় একজোড়া ভীরু চোখ। আশ্রয়ের ভাগ দিয়ে সেও যেন আসলে পেতে চাইছে একান্ত বিশ্বস্ত একটি আশ্রয়। মেয়েটির মনে ছলাৎছল, পায়ের তলায় বৃষ্টিজল। পায়ের নীচে থমকে থাকা কাগজের নৌকা চার হাতে আলতো ঠেলে এগিয়ে যায় তারা।

নৌকা মানে জলের উপর ভাসা। টালমাটাল জীবন নিয়ে সখ্য তো নদীর সঙ্গে। নদীর আছে এপার-ওপার। ঠিক যেন সীমান্ত। মাঝখানে ব্যবধান। নাকি ব্যবচ্ছেদ? নদীর আছে অগাধ জল আর সীমান্তের কাঁটাতার। কাঁটাতারের ওপারের রুকসানাও জানে রুখু সীমান্ত পেরোলেই বন্ধুর ঘর। অনিমেষও স্পষ্ট জানে পদ্মা পেরোলেই ওপারে বাসা রুকসানার। ওদের আলাপ জুকারবার্গের যৌথখামারে। ওদেরও আছে ভালোবাসার দিন। কিন্তু সেটা প্রেমদিবস বা সরস্বতী পুজো নয়। অন্য কোনও দিন। কোন দিন? যে দিন রুকসানা খালা, আম্মি, আপার চোখ এড়িয়ে পৌঁছে যেতে পারে সীমান্তে। ওপারে রুকসানা আর এপারে অনিমেষ দুরুদুরু বুকে ভাবে, “শোনো বিএসএফ, শোনো হে জওয়ান কাঁটাতারে গুনগুন।’’ বিএসএফ ও বিজিবি সে দিন সত্যি সত্যিই শুনে নিতে পারে ‘গুনগুন’। তবে এ গুনগুন অন্য গুনগুন। সীমান্তে নিয়ম সে দিন একটু শিথিল হয়। এপার-ওপার সেদিন মুখোমুখি হয় বিএসএফ ও বিজিবি-র সৌজন্যে। এপার থেকে সীমানা ডিঙিয়ে ওপারে পৌঁছে যায় মিষ্টির হাঁড়ি, লাল গোলাপ কিংবা স্মৃতিক্ষত চিরকুট। ওপার থেকে ভেসে আসে ঠোঙা ভরা জিলিপি, চাপা হাসি, মাপা কান্না আর হিসেব না রাখা অজস্র দিনলিপি। সময়সীমা বাঁধা। তাই ফিরতে হয়। দূরে বুঝি বেজে ওঠে কোনও একা একতারা।

প্রেম আর রাজনীতির ময়দান কখনও কখনও একাকার হয়ে যায়। মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে কখনও দেখা মেলে মাধবীলতার। নিবিড় বন্ধুতা কখন যে বাঁক নেয় প্রেমে, সে খবর কে রাখে! মিছিলে অতর্কিত পুলিশের আক্রমণের মুখে শক্ত করে যে ধরে নেয় হাত। লাঠিচার্জ শুরু হলে ছত্রভঙ্গ জনতা শুরু করে মরণবাঁচন দৌড়। পুলিশ আচমকা ছুড়ে দেয় কাঁদানে গ্যাস। চোখ জ্বালা করে ভীষণ। কিন্তু চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে থাকে মাধবীলতা। মাধবীলতারা। এদিক-ওদিক তাকিয়ে চোখে পড়ে টানারিকশা। রিকশাওয়ালার কাছে গেলে কণ্ঠস্বর কাতর হয়ে যায়। হয়ত বেকুব রিকশাওয়ালা এসে পাঁজাকোলা করে তুলে নেয় আহতকে। তারপরে ভালবাসা নিয়ে চেনা আস্তানায় ফেরে মাধবীলতা।

‘‘সারি সারি সব বাড়ি, যেন সার বাঁধা সব সৈন্য’’। বাড়ির চিলছাদে বসে ওরা। সামনে খোলা ল্যাপটপ । স্ক্রিনে “এক ঝাঁক উজ্জ্বল পায়রা।’’ ওরাও ডানা মেলতে চায়। পাশের বাড়ি থেকে সানাই তুলে নেন বিসমিল্লাহ। আকাশের মুখ ভার, একটু পরেই ঝড় উঠবে। মেঘের রং ফ্যাকাসে কালো। পাঁচিলের কার্নিশে বসে কিছু নাছোড়বান্দা পাখি। মেয়েটি আবার চমকে ওঠে বাজের আওয়াজে। তাই সে গা ঘেঁষে বসেছে ছেলেটির পাশে। দু’জনেই ভয় পাচ্ছে। মেয়েটির কপালে ঘাম, ছেলেটিরও হাত ঘামছে। সেই অনুপাতেই ওঠানামা করে ভালবাসার পারদ।

আকাশজুড়ে যেন মুক্ত ডানাদেরই স্বাধীনতা। তার নীচে এককুঠুরি ঘরে ছেলেটির সম্বল রংচটা একটা স্প্যানিশ গিটার। একটা বেয়াড়া কর্ড কেবলই যন্ত্রণা বাড়াচ্ছে। কলেজে পড়তে এসে প্রথম ভাললাগার মানুষটিকে বলতে পারেনি মনের কথা আজও। পণ করেছে, হয় এসপার, নয় ওসপার। হাত নেড়ে ইশারা করেন দেবী সরস্বতী। তাই পুজোয় অন্তত একটা হিল্লে করতে হবে। করতেই হবে। তাই বহু কষ্টে কথা গুছিয়ে সে লিখেছে আস্ত একটা গান।“চিরকালীন ভালোবাসার বাঘ বেরুল বনে…”বন্ধুরা জানিয়েছে, হয় এ বার, নয় নেভার। মিস করলেই ডিসমিস। মেয়েটিও তো তাই অপেক্ষায়। “এ বার সন্ধ্যায় তাকে শুদ্ধ করে নেওয়া কি সম্ভবে?” চোখের সামনে ভেসে ওঠা মুখ বাড়াচ্ছে বাড়তি উদ্বেগ। এ সব ভেবে ভেবে কাহিল ছেলেটি। কথার শক্ত পাথর ভেঙে ভেঙে মুঠো তার শ্রান্ত। বুকে যেন ঝোরার জল। হৃদয়অবাধ্য মেয়ে শুনতে চেয়েছে, “যে কথা বলোনি আগে, এ বছর সেই কথা বলো।”

ভ্যালেন্টাইনে রক্ষা নেই, দোসর সরস্বতী। চোখের সামনে দিয়ে দ্রুত গতিতে এগিয়ে গেল একটি টোটো। চালকের দৃষ্টি লুকিং গ্লাসে। পিছন থেকে ধেয়ে আসা যান দেখছে না সে। তার দৃষ্টি ব্যাকসিটে। এ দিকে, ব্যাকসিট আটকে মুঠোফোনে। গন্তব্যে পৌঁছে ভাড়া দেওয়ার সময় আপত্তি করে চালক, ‘‘ম্যাম থাক না আজ…।”ব্যাকসিট বিস্মিত। তিনচাকার দিব্যি দিয়ে মিথ্যে বলে চালক, “আজ আমার জন্মদিন…।”রোদচশমা খুলে ফেলে মেয়েটিও। ঠোঁটের কোণে বাড়তি প্রশ্রয়, ‘‘তাই! উইশ ইউ আ ভেরি হ্যাপি বার্থ ডে…।’’

সময় লিখে চলে দিবারাত্রির কাব্য…আজীবন…

(ফিচার ছবিটি গুগল থেকে নেওয়া)