সারথি বিশ্বাস

বিশেষ দিনটিতে দু’টাকার গোলাপ চল্লিশ টাকায় কিনতে হয়েছে, তাতে কী? মনখারাপ সে জন্য নয়, আসলে হলুদ চন্দ্রমল্লিকাটা যে পাঞ্জাবির পকেটেই থেকে গেল! ভেবেছিল, কোনও এক নিরিবিলিতে বসে প্রেমিকার (ধরা যাক তার নাম বিন্নি অথবা ধান অথবা খই) খোঁপায় সেটা গুঁজে দেবে তার অপটু হাত।
তো সেই বিন্নি ধানের খইকে নিয়ে পছন্দের জায়গায় পৌঁছে পোস্টার দেখেই পিলে চমকে গেল প্রেমিকের। আগে থেকেই ডাক্তারের নানা সাবধানবাণী তো ছিলই, করোনা কালে স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রেম জমবে কী করে, তা নিয়ে নিজেরও দুশ্চিন্তা কম ছিল না। ডাক্তাররা বলছেন, বুড়িছোঁয়া করেই সরে আসুন। দশ মিনিটের বেশি কাছে থাকবেন না। তাই সই! দশ মিনিট পাশে বসেই আবার ছ’ফুট দূরে। আদর না হয় ইনস্টলমেন্টেই হবে! করোনার কারণে ডাক্তারবাবুদের ঘোর আপত্তি ফ্রেঞ্চ কিসে। বেশ, বাদ থাক এ বার। ঠোঁটে ঠোঁটও না হয় ব্যারিকেডের ওপারে থাক। স্টার্টার কিস, কিংবা এস্কিমো কিস তো চলবে! অথবা, এস্কিমো কেস, মানে স্রেফ নাকে নাক ঘষেই চুমুপর্ব শেষ!
কিন্তু সে ইগলু-আবেগও জোটেনি বিন্নি ধানের খই আর তার প্রেমিকের। ডাক্তার বলেছিল, সাবধানে। আর পোস্টার গজরাচ্ছে, শাসনে। জুটি বেঁধে ঘুরলেই ঝুঁটি কেটে নেবে। এ দিকে বিন্নি ধানের খই ঘাড়ের ওপর আলতো একটা ঝুঁটিও ঝুলিয়েছে আদরের আবদারে। ওদিকে হুমকি পোস্টার, সংস্কৃতি বিরুদ্ধ যে কোনও রকম অভব্য আচরণের জন্য ‘কঠোর ব্যবস্থা’ নেওয়ার সুনিশ্চিত আশ্বাস !
অভব্য আচরণ! ভব্যতার সীমা তাহলে কতদূর? আর, কে ঠিক করছে সেই সীমানা? পাশাপাশি হাঁটা, পাশে খানিক বসা, হাতটা একটু ধরা যাবে না কি? প্রেমিকার চুলে একটা ফুল গুঁজতে কি সেই কাঁটাতার পেরিয়ে যেতে হয়? সব ছোঁয়াছুঁয়িতেই যৌনতা থাকে না, এইসব সংস্কৃতি-সংবিধান রচনাকারীরা বোঝেন তো সে কথা ! অভব্য আচরণের বিরুদ্ধে পোস্টার, বেশ! তা হলে, ইভটিজিং-এর বিরুদ্ধে একটাও পোস্টার নেই কেন? ধর্ষণের বিরুদ্ধেও কোথাও কোনও পোস্টার নেই কেন? যানবাহনে, রাস্তাঘাটে মেয়েদের নোংরা ভাবে স্পর্শ করার বিরুদ্ধে পোস্টার থাকে না কেন?
এতে কি সভ্যতার সীমা লঙ্ঘিত হয় না? ফুটপাত জবরদস্তি দখল হলে পোস্টার পড়ে না! গৃহস্থের আবর্জনা নদীপথে পাহাড় গড়লে কেউ প্রতিবাদ করে না! সামান্য ভুলে বা কখনও বিনা দোষেই কাউকে মেজাজ দেখালে, কারও গায়ে হাত তুললে, গলাধাক্কা দিলে কেউ শাসন করে না! সবার সামনে যেখানে সেখানে হিসি করলে আমাদের সংস্কৃতি গন্ধ হয় না! এগুলো তা হলে অভব্য আচরণ নয়? অভব্য আচরণ শুধু জুটি বেঁধে ঘোরা! অভব্য আচরণ শুধু চুমু খাওয়া! প্রেমই একমাত্র পচা! আমাদের সংস্কৃতি বিরুদ্ধ, তাই নিষিদ্ধ! পাঁচশো বছরের পদাবলী সাহিত্য তা হলে আমাদের নয়? রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’ পড়ব না? গাইব না তাঁর প্রেমের গান? বিদ্বেষ-বিভেদের যে প্রকাশ্য উল্লাস-উদযাপন প্রত্যহ হচ্ছে চারপাশে, সে সব বিষবৃক্ষ তো যত্নে পোঁতা হয় আমাদের সংস্কৃতির মাটিতে, প্রেমের গাছে জল দেওয়া কেবল মানা?
আরে বাবা, কেউ চুমুই তো খাচ্ছে, জোর তো করছে না, চপ্পলও মারছে না! ঘরে-বাইরে মেয়েরা যখন বিচিত্র পন্থায় লাঞ্ছিত হন, তখ‌ন তো একটা পোস্টারও কেউ সাঁটেন না? রাস্তা দিয়ে মেয়েরা হেঁটে গেলে কেউ যখন কুরুচিরকর মন্তব্য করে, আপনাদের ফতোয়া ঝোলে তো সেখানে? অথবা, সুখী দাম্পত্যের নামে যখন কোনও ‘সুপুরুষ’ বউ পেটায়, আপনাদের নীতি-পুলিশরা লাঠি নিয়ে দাঁড়ায় তো তখন?
এই প্রশ্নগুলো পতাকার মতো পতপত করে উড়ছিল বিন্নি ধানের খই-এর প্রেমিকের মনে, কিন্তু ফতোয়ার ফতফতানিতে প্রকাশ করতে পারেনি। তাই তার মনখারাপ। তার নেই বটে, তবে বিন্নি ধানের খই-এর একটা আদুরে ঝুঁটি আছে, সেটা ধরে কেউ নাড়িয়ে দিক, তা সে চায়নি। তাই চন্দ্রমল্লিকাটাও গোঁজা হয়নি। বাঙালির ‘প্রেম-পরব’-এ তাই তার খুব মনখারাপ।

(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here