দেবর্ষি ভট্টাচার্য

আমাদের এই মানব জীবনে যা কিছু ঘটে, প্রায় তার সবটুকুই জীবনের অনুগত বলেই আমরা বিবেচনা করে থাকি। অর্থাৎ, জীবন সকলের চেয়ে বড়। আর যা কিছু সবই জীবনের অধীনস্থ। এমনকি জগত জুড়ে নারী-পুরুষের প্রেমের ক্ষেত্রেও আমাদের সেই একই জীবন দর্শন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কিন্তু সারাজীবনে ঘটে যাওয়া কোনও কোনও বিশেষ ঘটনাকে কিছু মানুষ তাঁর জীবনের থেকেও মূল্যবান বলে মনে করে। অর্থাৎ, মানুষের কাছে সবকিছুই জীবনের অনুগত বলে মনে হলেও, কোনও কোনও মানুষের ক্ষেত্রে বিশেষ কোনও ঘটনার তীব্র অনুভূতি কখনও কখনও তাঁর জীবনকেও ছাপিয়ে যায়। যেমন রাজনৈতিক মতাদর্শ পালন, দেশ বা ধর্ম রক্ষার সুতীব্র আবেদনে জীবনকে উৎসর্গ করার উদাহরণ পৃথিবীর ইতিহাসের পাতাগুলোকে ভরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু মাতৃভাষা রক্ষার প্রয়োজনে জীবনকে ছাপিয়ে যাওয়ার উজ্জ্বল উদাহরণে তো একমাত্র আমাদের প্রাণের বাংলা ভাষাই ইতিহাসের পাতাকে আজও জীবন্ত করে রেখেছে। তাই তো মাতৃভাষা রক্ষার জন্য বাঙালি জাতির অদম্য জীবন উৎসর্গের জ্বলজ্বলে ইতিহাসকে আজীবন জীবন্ত রাখার তাগিদে ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটা ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। আজ এই অশান্ত পৃথিবীর বাসিন্দা হয়ে যখন খবর মেলে, শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রভাব বঙ্গদেশের সীমানাকে ছাড়িয়ে বিদেশিদেরও আপ্লুত করেছে, তখন মনটা আনন্দে ভরে ওঠে বইকি!
বাংলা ভাষার এমন গর্বিত অবদানে সুদূর আফ্রিকাও যে ঋদ্ধ, এমন খবরে ফের মনে মনে বলি… “মোদের গরব, মোদের আশা, আ-মরি বাংলা ভাষা”। নিরক্ষরেখার পূর্বে, আফ্রিকা মহাদেশের একেবারে পশ্চিম প্রান্তে, দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের অথৈ জলরাশি বেয়ে এক অনুন্নত অখ্যাত দেশ ‘সেয়রা লিওন’ (Sierra Leone)। সেয়রা লিওনের উত্তর ও উত্তর-পূর্ব সীমান্ত বরাবর আফ্রিকার আর এক দেশ গিনি এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্ত আফ্রিকারই আর এক দেশ লাইবেরিয়া দিয়ে ঘেরা। আর এই সবুজ দেশটার পশ্চিম উপকূলের প্রায় ৮০০ কিলোমিটার জুড়ে অতল জলরাশির অন্তহীন আটলান্টিক মহাসাগর। দেশটার নামকরণের ইতিহাস প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছরের পুরনো। সেই ১৪৬২ সালে পর্তুগিজ অনুসন্ধানকারী, Pedro da Cintra, ভাসতে ভাসতে একদিন আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে এসে আচমকা একটি উচ্চ পর্বতশিখর দেখতে পান, তিনি যার নাম দেন ‘সেয়রা লিওন’ বা ‘লিওন পর্বত’। ঘন জঙ্গলাকীর্ণ আফ্রিকার এই ছোট্ট দেশটির নামকরণ করা হয় সেই সর্বোচ্চ পর্বতশিখরেরই নামে। পরবর্তীকালে ইংরেজ ঔপনিবেশিকদের আগমনের ফলস্বরূপ এই দেশের নাম ‘সেয়রা লিওন’-এ পরিবর্তিত হয়। সেয়রা লিওনের রাজধানীর নাম ‘ফ্রিটাউন’ (Freetown)। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে যখন ক্রীতদাস প্রথা বিলুপ্তির পথে, তখন ইংল্যান্ড ও আমেরিকা থেকে মুক্ত ক্রীতদাসদের এই ‘ফ্রিটাউন’ অঞ্চলে পুনর্বাসিত করা হয়। আর ঠিক সেই কারণেই এই শহরের নাম হয়ে যায় ‘ফ্রিটাউন’।
সেয়রা লিওনের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ৪৭ লক্ষ। বহুভাষী এই দেশের মিশ্রিত কথ্য ভাষা (Lingua Franca) হল ‘ক্রিও’। মিশ্র ভাষা ‘ক্রিও’-র উৎপত্তি স্থানীয় ‘ক্রিওল’ ভাষা থেকে। এই ভাষার ভিত্তি হল চীনবাজারি ইংরাজি (Pidgin English) এবং এই ভাষায় Temne, Mende সহ আরও অন্যান্য স্থানীয় উপভাষার শব্দের মিশ্রণ রয়েছে। সেয়রা লিওনের প্রায় ৯৭ শতাংশ মানুষই এই ক্রিও ভাষায় কথা বলেন। ‘ক্রিও’ কার্যত এই দেশের রাষ্ট্রভাষা। ক্রিও ভাষা ছাড়া এই দেশের মানুষেরা Mende, Temne এবং Limba ভাষাতেও কথা বলে থাকেন।
১৯৬১ সালের ২৭ এপ্রিল সেয়রা লিওন স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ইংরেজ ঔপনিবেশিকতা থেকে স্বাধীনতা লাভ করে এবং ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল আফ্রিকার এই দেশটি স্বাধীন প্রজাতান্ত্রিক সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু ১৯৯১ সাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত সেয়রা লিওন প্রবল রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। যার ফলস্বরূপ, দেশের গণতন্ত্র, আর্থ-সামাজিক কাঠামো, নাগরিক স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা চরমভাবে বিপন্ন হয়ে ওঠে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও গুরুত্ব বিচার করে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে, জাতিসঙ্ঘ (United Nations) মোট ৩১টি দেশের সেনার সমন্বয়ে প্রায় ১৭,০০০ শান্তিসেনা সেয়রা লিওনে মোতায়েন করে, যার মধ্যে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশেরই ৫,৩০০ শান্তিসেনা নিযুক্ত ছিল।
জাতিসঙ্ঘ প্রেরিত এই বাংলাদেশি শান্তিসেনারা সেয়রা লিওনে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁরা শুধুমাত্র বেয়নেট আর বুলেটের মাধ্যমে অশান্ত সেয়রা লিওনকে শান্ত করার পথে হাঁটেননি। স্থানীয় মানুষজনের সঙ্গে অমায়িক মেলামেশা এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে বাংলাদেশি শান্তিসেনারা সেয়রা লিওনবাসীদের শান্তির পথ দেখাতে এবং চেনাতে শুরু করেন। আর এই মেলবন্ধনের কাজে তাঁরা সুনিপুণ ভাবে প্রয়োগ করেন বাংলা ভাষা ও বঙ্গ-সংস্কৃতিকে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে স্থানীয় জনসাধারণকে তাঁরা বাংলা ভাষার প্রশিক্ষণও দিতে শুরু করেন। বাংলা ভাষা এবং সংস্কৃতির প্রয়োগ ও প্রদর্শনের মাধ্যমে বাংলাদেশি শান্তিসেনারা সেয়রা লিওনবাসীর সামাজিক এবং ব্যক্তিগত আঙিনায় আন্তরিক ভাবে প্রবেশ করতে সক্ষম হন। ফলস্বরূপ, স্থানীয় মানুষজনের মধ্যে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং স্থানীয় জনসাধারণের একটা অংশ উৎসাহিত হয়ে বাংলা ভাষা শিখে ফেলেন। সেইসঙ্গে বাংলাদেশি শান্তিসেনারা ওই দেশের উন্নয়নমূলক কাজেও নিরলসভাবে নিজেদের নিয়োজিত করেন।
এ ভাবে স্থানীয় মানুষজনের আস্থা ও মন জয় করে বাংলাদেশি শান্তিসেনারা সেয়রা লিওনে শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে অভাবনীয় সাফল্য পান। এমনকি তাঁরা ২০০২ সালে ওই দেশে ৫৪ কিলোমিটার বিস্তৃত রাস্তাও তৈরি করে ফেলেন। সেই রাস্তা উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে সেয়রা লিওনের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি, আহমেদ তেজান কাবাহ, দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ভূমিকা সম্বন্ধে ভূয়সী প্রশংসা করেন। এমনকি শোনা যায় যে ওই অনুষ্ঠানে তিনি নাকি বাংলা ভাষাকে সান্মানিক রাষ্ট্রভাষার (Honorary State Language) মর্যাদা দেওয়ার কথাও ঘোষণা করেন। কিন্তু এই তথ্যের পক্ষে কোনও সরকারি নথি বা আদেশনামা কোথাও পাওয়া যায়নি। এমনকি সেয়রা লিওনের সরকারি ওয়েবসাইটেও এই ঘোষণার সমর্থনে কোনও তথ্য মেলেনি। সেয়রা লিওন সরকার বাংলা ভাষাকে তাদের রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিয়েছে, এই সংক্রান্ত খবর ২০০২ সালে পাকিস্তানের একটি দৈনিক সংবাদপত্রে প্রথম প্রকাশিত হয়। যদিও পরে ওই সংবাদপত্র তাদের ওয়েবসাইট থেকে এই সংবাদটি সম্পূর্ণ ভাবে মুছে দেয়।
বাস্তবিক ভাবে একথা সত্য যে সেয়রা লিওনবাসী বাংলা ভাষায় কথা বলেন না। তবে একথাও সত্যি যে, সেয়রা লিওনবাসী সেই রক্তক্ষয়ী দিনগুলির নিকষ কালো পর্দা সরিয়ে আলোয় ফেরার জন্য বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির কাছে একান্তভাবে কৃতজ্ঞ। আজও সেয়রা লিওনবাসী কৃতজ্ঞতার সঙ্গে সেই কথা মনে রেখেছেন। কারণ, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধরত সেয়রা লিওনবাসীর হৃদয়ের গভীরতম প্রান্তে চিরকালীন জায়গা করে নিয়েছে, যা কালান্তরের গ্রাসেও অবলুপ্ত হয়নি। তাই যখন খবর আসে সুদূর আফ্রিকাতেও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পূর্ণ ভিন্নভাষী ও ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষদের হৃদয়ও জয় করে ফিরেছে, তখন বাঙালী হিসেবে গর্বিত মুকুটে আরও একটি উজ্জ্বল পালক যোগ হয়। আরব সাগরের অথৈ লোনা জল পার হয়ে সুদূর আফ্রিকাতেও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি এমন একটি বিরল ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছে, এই উচ্ছ্বাসে বাঙালির আবেগমথিত রক্তস্রোত থইথই জ্যোৎস্নার আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবেই।

 (লেখক বঙ্গবাসী সান্ধ্য কলেজের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ও বাণিজ্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান) 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here